২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:৩৭

মশা নিয়ন্ত্রণে জোর নেই ডিএনসিসির!

 

ডেস্ক নিউজ : রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ মোকাবেলায় মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পিছিয়ে আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসির নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়নেও গড়িমসির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ডিএনসিসি এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি হিসাবেই গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য মতে, গত আগস্ট মাসে ঢাকায় এক হাজার ৬৬৬ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। আর চলতি মাসের প্রথম ৯ দিনেই আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৭৬৬। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও মশার প্রজনন মৌসুমে মশা নিয়ন্ত্রণে ‘বিশেষ কর্মসূচি’ বন্ধ রেখেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংস করতে গত ২৫ জুন ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডে একযোগে ১৫ দিনব্যাপী ‘বিশেষ কর্মসূচি’ শুরু করেন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। একই কর্মসূচি পরে ২৮ জুলাই থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত আবার চালিয়ে যায় ডিএসসিসি। দুই দফায় ওই কর্মসূচির আওতায় ৩৩ হাজার ৫০৮টি বাড়িতে গিয়ে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংস করার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া এডিস মশা ধ্বংস করতে তৃতীয় ধাপে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘বিশেষ ক্র্যাশ কর্মসূচি’ চালু করেছে ডিএসসিসি।

শাহজাহানপুর এলাকার বুশরা টেলিকমের স্বত্বাধিকারী মো. মোফাজ্জল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচি চালায়। আমার এলাকায়ও নিয়মিত কর্মসূচি চালানো হয়।’

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশা নিধনে বিশেষ ক্র্যাশ প্রগ্রাম আমরা হাতে নিয়েছি। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা সম্পর্কে সচেতন করতে আমরা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছি। কারণ এডিস মশা বাসাবাড়িতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মে।’

ডিএসসিসি এত কার্যক্রম চালালেও ডিএনসিসি গত ৪ আগস্ট মশা নিয়ন্ত্রণের ‘বিশেষ কর্মসূচি’ হাতে নেয়। সেই কর্মসূচিও বন্ধ হয়ে যায় গত ১৭ আগস্ট। গত অর্থবছরে কেনা ওষুধ দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে ডিএনসিসি। চলতি অর্থবছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো ওষুধ কেনা হয়নি এখনো। তবে দরপত্র ডাকার পর একটি চীনা কম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গত অর্থবছরে কেনা ওষুধ দিয়ে মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। কারণ মশা নিধনের ওষুধ ছিটাতে হলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় তা আগে প্রয়োগ করা যায়নি।  

ডেঙ্গুর প্রকোপ চলাকালে টানা ২৩ দিন মশা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ কর্মসূচি বন্ধ রাখার পর গত ৯ সেপ্টেম্বর আবার সেটি চালু করেছে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে তা সীমাবদ্ধ শুধু সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের মধ্যেই। গত রবিবার ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কুড়াতলি ও মিরপুরে কয়েকটি বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়েছেন।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি গত শনিবার থেকে। রবিবারেও প্রচারণামূলক কর্মসূচি চালিয়েছি।’

ডিএনসিসির আওতাধীন মিরপুর, বাড্ডা, উত্তরা, বারিধারা ও গুলশান এলাকা ঘুরে বাসিন্দাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয় না ওই সব এলাকায়। অথচ সপ্তাহে পাঁচ দিন সকালে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে লার্ভিসাইট এবং বয়স্ক মশা মারতে বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইট জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করার কথা। এসব কাজ নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের।

উত্তর বাড্ডা এলাকার মিজান স্টোরের মালিক মিজানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণকর্মীরা খুব একটা আসেন না উত্তর বাড্ডা এলাকায়। কালেভদ্রে এলেও ফগার মেশিনে দায়সাড়াভাবে ওষুধ ছিটিয়ে চলে যান। তাতে তেমন কোনো কাজ হয় বলে মনে হয় না।’ একই রকম অভিযোগ করেন উত্তরার বাউনিয়ার বাসিন্দা আবুল কাশেম, মিরপুরের মারিয়া সালাম এবং রামপুরা এলাকার ব্যবসায়ী হারুন মিয়া। নিয়মিত মশা নিধনের জন্য ডিএনসিসির কর্মী থাকার বিষয়টিও অজানা তাঁদের। 

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান বলেন, ‘মশক কর্মীরা কাজ করার পরও জনগণের অসচেতনতা এবং অসহযোগিতার কারণে তা পুরোপুরি কাজে আসছে না। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে ড্রেনের ওপরে দোকানসহ নানা স্থাপনার কারণে মশার ওষুধ ছিটানো সম্ভব হয় না।’ তাঁর দাবি, নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, যা তদারকির দায়িত্ব ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের। তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলর, সাংবাদিক বা অন্য কোনো নাগরিকের মাধ্যমে আমরা মশা নিধনে গাফিলতির কোনো তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্র থেকে কালের কণ্ঠকে বলেন, ২৮-৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মশা বংশ বৃদ্ধি করে। আর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসের তাপমাত্রা মশার বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক। এ সময়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মশা নিধন জরুরি। তাঁর মতে, মশা নিধন কর্মসূচি ঢাকার দু্ই সিটি করপোরেশনে একযোগে শুরু করা উচিত। কেননা ডেঙ্গুর জীবাণু মানুষ বহন করে থাকে। অর্থাৎ মানুষের মাধ্যমে তা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ভালো সুফল পেতে ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতেও মশা নিধন কর্মসূচি চালানো জরুরি। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহী মশা ধ্বংস করতে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ব্যাপক প্রচার চালানো উচিত। 

কিউএনবি/রেশমা/১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সকাল ১১:৫০