১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ভোর ৫:৫৫

২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, হোতারা নিরাপদ দূরত্বে!

 

ডেস্ক নিউজ : নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের ভর্তুকির খাদ্যশস্য খোলাবাজারে বিক্রির (ওএমএস) কার্যক্রমে দুর্নীতি করেও রেহাই পেয়ে ফের একই অপকর্ম করছেন খাদ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের (সিএসডি) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এক বছর আগে ৩০ টন জিআর চালের ওজন জালিয়াতির ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। র‌্যাব সিএসডির প্রধান নিরাপত্তাকর্মী মো. হারেজ এবং গেট শাখার ইনচার্জ ইউনুছ আলী মণ্ডলকে প্রধান অভিযুক্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের তদন্তে দুজনকে বাদ দিয়ে অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। শনিবার রাতে র‌্যাবের অভিযানে খাদ্যগুদামের ২১৫ টন চাল ও আটা কালোবাজারির যে ঘটনা ধরা পড়েছে, তাতেও হারেজ ও ইউনুছের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। এবারও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এই দুজনের বিরুদ্ধে দুদকে প্রতিবেদন দিচ্ছে র‌্যাব। গতকাল মঙ্গলবার রাতে সিএসডি গুদামের কর্মী, আড়তদার, ডিলারসহ কালোবাজারি চক্রের ২৩ জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। তবে এই মামলায় আসামি করা হয়নি সিএসডি থেকে প্রত্যাহার করা হুমায়ুন কবিরকে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিএসডি গুদামের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির, ইনচার্জ মনিয়ার হোসেন, সিবিএ নেতা আলমগীর সৈকত ও ডিলার সোহাগ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করতেন। ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়ে ওএমএস পণ্য বাইরে পাচার করা হতো। চালের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতেন আলমগীর। আর আটার সিন্ডিকেটের হোতা ডিলার সোহাগ। এক বছর আগে ওজন জালিয়াতির ঘটনায় ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবিরকে সতর্ক করা হলেও তিনি ছিলেন বহাল তবিয়তে। তিনি খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সংগঠনের সভাপতি। অভিযোগ আছে, তাঁর কারণেই সহযোগী ইউনুছ ও হারেজ আগের তদন্ত থেকে রেহাই পান। গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন প্রভাবশালী কবির। অভিযোগের কারণে সিএসডি থেকে প্রত্যাহার করা হলেও তিনিই আবার র‌্যাবকে সহায়তা করছেন!

জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন কর্মকর্তা সারওয়ার আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আজ (গতকাল) দুদকে রিপোর্টটি দিতে পারিনি। আগামীকাল (আজ) সকালে দেব। আমরা তদন্তে যাদের ব্যাপারে তথ্য পেয়েছি তাদের সবার নামই থাকবে।’

জানা গেছে, র‌্যাবের মামলায় ১১ আড়তদার, সিএসডির ছয়জন কর্মী, চারজন সিবিএ নেতা (শ্রমিক) এবং দুই ডিলারকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন, গোলাম কিবরিয়া, ইকবাল হোসেন, সালাউদ্দিন, মিসকাতুর রহমান, গোলাম মোস্তফা, তৈয়বুর রহমান, হাজি হান্নান, শাহ আলম ও কবির হোসেন, সিবিএ নেতা আলমগীর সৈকত, শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুদু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর, স্টক ইনচার্জ সুখরঞ্জন হালদার, ইনচার্জ ইউনুছ আলী মণ্ডল, চেকপোস্টোর ইনচার্জ সুমন, ডিও শাখার ইনচার্জ কাজী মাহমুদুল হাসান, প্রধান দারোয়ান হারেজ, দারোয়ান বাবুল, ডিলার নজরুল ইসলাম ও জাকির হোসেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারায় মামলাটি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাজধানীতে প্রতিদিন ১৪১ ট্রাক ওএমএসের চাল ও আটা একই সংখ্যক পয়েন্টে বিক্রি করার কথা। তবে তথ্য পাওয়া যায়, বাস্তবে ২৮ থেকে ৩০টির বেশি ট্রাক থাকছে না। এ হিসাবে প্রতিদিন ৩৩৩ টন চাল ও আটা কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছিল। রাতের আঁধারে সাত-আট টন করে চাল ও আটা খাদ্যগুদাম থেকে বের করে আড়তে বিক্রি করছিল সিন্ডিকেট। এ অপকর্মের জন্য হুমায়ুন কবিরসহ কয়েকজন প্রতি টনে পেতেন এক হাজার টাকা করে। আর শ্রমিক সিন্ডিকেট নেয় ৫০০ করে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযানের সময় তথ্য উঠে এসেছে, চাল কালোবাজারে বিক্রির মূল হোতা আলমগীর। সিএসডির শ্রমিক থেকে সিবিএ নেতা হওয়া আলমগীর এখন কোটিপতি। আর আটা বাজারে বিক্রির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে নারায়ণগঞ্জের ডিলার সোহাগ।

একটি সূত্র দাবি করছে, ‘সবাই বলছে—কালোবাজারের জন্য ব্যবস্থাপককে প্রতি টনে এক হাজার টাকা করে দিতে হয়। এর পরও কবিরকে রেহাই দিতে চলছে অপতৎপরতা। র‌্যাবের অভিযানের পর তিন দিন ধরে নানা দেনদরবার চলছে। এ কারণে মামলায় দেরি করা হয়। কবির আগেও এভাবে রেহাই পেয়েছেন।’ তবে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু সোমবার বলেন, ‘বিভাগীয় মামলায় বিধি অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি চাকরিজীবীদের বিধির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

গত শনিবার রাতে সিএসডি থেকে পাচার হওয়ার সময় আট ট্রাক এবং মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ১১টি আড়ত থেকে ২১৫ টন চাল ও আটা জব্দ করে র‌্যাব। সিএসডির ব্যবস্থাপক কবির ও গুদাম ইনচার্জ মনিয়ার হোসেনকে আটক করা হলেও এক দিন পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় খাদ্য অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, কালোবাজারি চক্র দুই মাসে প্রায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে ওই চাল ও আটায় দেওয়া ভর্তুকি হিসাব করলে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ২৪ কোটি টাকা।

কিউএনবি/রেশমা/১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সকাল ৮:১২