২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৪৭

পদ্মার ভাঙ্গনের তীব্রতা বাড়ছে নদী গর্ভে চলে গেছে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবন ও ব্রীজ-কালভার্ট

 

খোরশেদ আলম বাবুল,শরীয়তপুর প্রতিনিধি : প্রমত্তা পদ্মার তীব্র ভাঙ্গনে বিপর্র্যস্ত হয়ে পড়েছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা। মঙ্গলবার নদীতে তীব্র ¯্রােতের কারণে জেলার নড়িয়া উপজেলার মূলফৎগঞ্জ এলাকায় পদ্মার ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়েছে। এখানে অবস্থিত ৫০ শয্যা বিশিষ্ট নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনের একাংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মসজিদ, দেয়ালসহ অন্যান্য আরো ৩টি ছোট ছোট ভবন এবং বেসরকারি ব্যক্তি মালিকানাধীন লাইফ কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার সোমবার নদীতে বিলীন হয়েছে। যে কোন মুহুর্তে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনসহ ১২ টি ভবন নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ খলিলুর রহমান মঙ্গলবার সকালে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিদর্শনে এসে ভাঙ্গনের তীব্রতা দেখে দৈনিক বর্তমানকে বলেন, হাসপাতালের ভবনগুলো নদীর ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে থাকায় ইতোমধ্যেই আমরা নতুন ও পুরাতন ভবনের স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম স্থগিত করেছি এবং এখানকার মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছি।

জরুরি বিভাগের ও বর্হিবিভাগের স্থগিত করা স্বাস্থ্য সেবার কার্যক্রম হাসপাতালের কম্পাউন্ডের ভিতরে ডাক্তারদের আবাসিক কোয়ার্টারে সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা নিরাপদ ভেবে সেখানে চালু রাখা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এছাড়াও হাসপাতালের সমস্ত ভবনের প্রাক্কলণ নিলাম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা।

এদিকে মঙ্গলবার পদ্মা নদীর ভাঙ্গন কবলিত নড়িয়া উপজেলার মূলফৎগঞ্জে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বহু লোকের দীর্ঘ দিনের সাজানো-গুছানো সংসার, কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, মসজিদ, ব্রীজ-কালভার্ট মুহর্তের মধ্যে পদ্মার গর্ভে চলে যাচ্ছে।পদ্মা পাড়ে চলছে ভাঙ্গনে সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের শোকের মাতম।কিছুদিন আগেও যারা নিজ নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্বচ্ছলতার সাথে দিন কাটাতো, তারা আজ ভূমিহীন হয়ে পথের ফকির হয়ে গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় ২শ’ বছরের পুরানো মুলফতগঞ্জ বাজারে অবস্থিত ২ হাজারের বেশী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্ধেকটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাকীরা তাদের সাজানো-গোছানো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই ভেঙ্গে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে পুরনো এ বাজারের আরো সহ¯্রাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বসতঘর।

যে কোন মুহুর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে নড়িয়া উপজলার ঐতিহ্যবাহী মূলফতগঞ্জ মাদ্রাসা।এদিকে ভাঙ্গন রোধে সরকারের ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে পদ্মার পাড়ে যে জিও ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে তা কোন কাজেই আসেনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ঠেকানো যায়নি ভাঙ্গন।ভয়াবহ ভাঙ্গন রোধে সরকার পদ্মা নদীর দক্ষিণ (ডান) তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প গ্রহণ করে।

এরপর গত ২ জানুয়ারি তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করে এবং প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বর্ষার আগেই বাঁধ নির্মাণ করার নির্দেশনা দিয়েচিলেন। কিন্তু পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও শরীয়তপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে আজ আমাদের সর্বস্ব হারাতে হয়েছে।

সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তি ও ভাঙ্গন কবলিত এলাকাকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।এদিকে সরকারি হিসেব অনুযায়ী এ বছর নড়িয়া উপজেলার পদ্মার পারে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের বাড়ি-ঘর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।ভাঙ্গন কবলিতরা একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটছে।

পদ্মার তীরবর্তী এলাকার লোকজনের চোখে কোন ঘুম নেই।তারা দিন রাত তাদের সর্বশেষ সম্বল ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট সরিয়ে নিতে প্রাণপন চেষ্টা করলেও চোখের সামনেই মুহুর্তে বিলীন হচ্ছে সব কিছু।এলাকাবাসীর দাবি, ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এখনো নড়িয়া বাজার, ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ মাদ্রাসা কমপ্লেক্স রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

ভাঙ্গন কবলিতরা জানান, এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই রাক্ষুসী পদ্মা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দক্ষিণে ৫ কিলোমিটার পযর্ন্ত চলে এসেছে। ভাঙ্গন শুরু হয়েছে ৩শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ বাজারের উত্তর পাশ। ইতোমধ্যে এই বাজারে অবস্থিত নুর হোসেন দেওয়ান ও ইমাম হোসেন দেওয়ানদের তিন তলা ৪টি ভবনসহ ৫ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একেকটি ভবন ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ভবনগুলো চোখের সামনেই বিলীন হলেও কারো পক্ষেই করার কিছু ছিল না।

ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, এলাকার সর্বস্বহারা মানুষগুলো দিন রাত করে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজলেও তেমন কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তারা বর্ষার আগেই চেয়েছিল সরকারি কোন সাহায্য নয় পদ্মার দক্ষিণ তীরে নড়িয়া উপজেলা শহর এবং পুরনো এ মূলফৎগঞ্জ বাজারটি রক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক। এদিকে তাৎক্ষণিক ভাঙ্গন ঠেকাতে সরকার ৫কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। ঠিকাদারের মাধ্যমে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্ত প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় ভাঙ্গন রোধে কোন কাজেই আসেনি বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ভাঙ্গন আতংকে এসব এলাকা থেকে বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে নেয়ায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে বাজার, হাসপাতালসহ আশ পাশের এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ। কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান, হাসেম দেওয়ান বলেন, এলাকায় মহা দূযোর্গ চলছে।আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না।আমরা এখন ভূমিহীনদের কাতারে চলে এসেছি। এতে আমাদের দুঃখ নেই।এখনো যদি সরকার দ্রুত গতিতে পদ্মার দক্ষিণ তীর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে তাহলে আরো হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, ইতোপূর্বে প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।খুব শিঘ্রই ৩শ’ ৫০জন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২ বান্ডিল করে টিন ও নগদ ৬ হাজার করে টাকা বিতরণ করা হবে।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সন্ধ্যা ৭:১৬