২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:২৭

হুমায়ূন-এর প্রথম প্রহর

 

সাহিত্য ডেস্ক : সময়টা সঠিক মনে নেই। ১৯৮৩ সালের গোড়ার দিকের কথা। অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁর ‘পাখির বিদায়’ গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছিলেন ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ। বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন নিয়ে ধারাবাহিক নাটক ‘মণিহার’। নাটকটি চিত্রায়নের জন্য ‘দখিন হাওয়া’ নামের বাড়িতে যাওয়া। বাড়িটি অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ সাহেবের। ধানমন্ডিতে অবস্থিত। নামটি এখনও আছে, চেহারা বদলেছে। বাড়িটি এখন এপার্টমেন্টে রূপান্তরিত।

‘পাখীর বিদায়’ গল্পটি অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ উত্তম পুরুষে বর্ণনা করেছেন। পাখি তাঁর বাসার কাজের মেয়ে। বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পের নাম ‘পাখির বিদায়’। নাটকটির প্রধান পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান খান। যিনি ১৯৬৫ সালে ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় ‘পাঠক মুজিব’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আর পাখি চরিত্রে অভিনয় করেন ফাল্গুনী হামিদ। অনবদ্য এই ছোটগল্পটি করাচীর প্রবাসী পাঠচক্র নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাহিত্য সংকলনে প্রথম ছাপা হয়। বহিঃদৃশ্য চিত্রায়নের জন্য গল্পের ‘দখিন হাওয়া’ নামের বাড়িটিই নির্ধারণ করা হয়। তখন দখিন হাওয়ার সামনে, দক্ষিণ দিকে, সুন্দর একটি বাগান ছিলো। সেই বাগানে পাখির বিদায় চিত্রায়ন শুরু। ক্যামেরায় পাখি ও ইবরাহীম খাঁর অংশগ্রহণে একটি দৃশ্য ধারণের জন্য নাটকের সহকারী পরিচালক মঞ্জুরুর রহমান কাউন্ট ডাউন শুরু করেন। কাউন্ট ডাউন হলো ১০ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকের সংখ্যাগুলোকে বলা, অর্থাৎ ১০.৯.৮.৭.৬.৫.৪.৩.২.১.০ অ্যাকশন। অ্যাকশন বলার সঙ্গে ক্যামেরায় ছবি ধারণ শুরু। মনিটরে ক্যামেরার ছবিতে ইবরাহীম খাঁ ও পাখি ছাড়া আরও একটি চিত্র দেখা গেলো, সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক হিসেবে আমি বললাম, কাট। চিত্রগ্রহণ বন্ধ। ক্যামেরার সামনে নাটকের চরিত্র ছাড়াও লাল টি-শার্ট পরিহিত একজন যুবকের ছবি দেখা যায়। কোলে তাঁর একট কন্যাশিশু। মঞ্জুরুর রহমান ক্যামেরা শট থেকে ঐ যুবককে সরে যেতে বললেন। দু’ চারটি শট গ্রহণ করা হলো। ইতোমধ্যে শুটিং স্থলে প্রচুর দর্শকের আগমন। মঞ্জুরুর রহমান এত দর্শক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। দর্শকদের উৎসাহ অপরিসীম। ক্যামেরা এঙ্গেল পরিবর্তনের সংগে সংগে দর্শকদের অন্যত্র সরিয়ে দিতে হয়। সে এক মহা ঝামেলা! এক পর্যায়ে চিত্র ধারণের কাজ মোটামুটি নির্বিঘেœ শেষ হলো। এবার চা-বিরতি।

দখিন হাওয়ায় থাকেন ইবরাহীম খাঁ সাহেবের ছেলে। তিনি চিত্রধারণ দলকে চা-পানে আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানালে সাদরে গ্রহণ করা হয়। অদুরেই তাঁর অফিস কক্ষ। অফিস কক্ষে অপেক্ষা করছে বহিঃদৃশ্য ধারণ দল। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বাড়ির কর্তা। এর মধ্যে সেই লাল টি-শার্ট পরিহিত যুবককে পরিচয় করিয়ে দিলেন যে, তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ জামাতা হুমায়ূন আহমেদ। ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করে সদ্য ফিরে এসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক। চকিতে তাকাতেই হয় তাঁর দিকে। কারণ এ নামের সঙ্গে পরিচয় আগে থেকেই। মাথা ভরা কোকড়ানো চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। চোখে মুখে গভীর প্রত্যয়। আত্মবিশ্বাসী। কিঞ্চিৎ অহংকারী। মৃদুভাষী। প্রথম দর্শনে আকর্ষণ করার মতো বহুবিধ বৈশিষ্ঠ্যের অধিকারী এই যুবক।

ইতোমধ্যে তাঁর অন্তত দুটি উপন্যাস বাজারে নাম করেছে। ‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’। দুটি উপন্যাসেরই নাট্যরূপ দিয়েছে অন্যেরা। উপন্যাস অবলম্বনে বিটিভির জন্য নাটক নির্মাণ করেছেন স্বনামধন্য দুই নাট্যব্যক্তিত্ব, আতিকুল হক চৌধুরী (শঙ্খনীল কারাগার) এবং মোস্তফা কামাল সৈয়দ (নন্দিত নরকে)।

তাঁর উপন্যাস থেকে নাটক দুটি নির্মাণে যথা নিয়ম পালন করা হয়নি। অনুমতি ছাড়াই নাট্যরূপ দেয়া ও নাটক নির্মাণ করায় বিষয়টিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেননি তিনি। খুব কড়া ভাষায় পত্র লেখেন এবং আর্থিক বিষয়টি তাঁর মার সঙ্গে মিটিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নির্মাতাদের তাগিদ দেন। সে ভাবেই বিষয়টির সমাধান হয়। অতএব তাঁকে ঘিরে বিটিভিতে বেশ আলোচনা হয়।গভীর আগ্রহ নিয়ে তাঁকে প্রস্তাব দেয়া হলো বিটিভির জন্য নাটক নির্মাণের। স্বভাবসুলভ সরাসরি জবাব দিলেন, তিনি গল্প ও উপন্যাস লেখেন, নাটক তার ক্ষেত্র নয়। তিনি আগ্রহীও নন। গল্পে উপন্যাসে যাঁর এমন হাত, নাটক লেখা তাঁর জন্য কঠিন নয়। আবারও অনুরোধ। তিনি রাজি হলেন না। আশেপাশে কয়েকজন রমণী মূর্তির আবির্ভাব। তাঁদের মধ্যে একজন উচ্চারণ করলেন, ‘দুলাভাই লেখেন না টেলিভিশনের জন্য।’ দুলাভাই সম্বোধনে বোঝা গেল তিনি হুমায়ূন আহমেদের শ্যালিকা। প্রথম পরিচয় এভাবেই হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে।

তিনি রাজি হননি, তাই বলে এভাবে তো আর তাঁকে ছেড়ে দেয়া যায় না! তাঁর বাড়ির ঠিকানা নেয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিফোন নাম্বার নেয়া হলো। টেলিফোন করা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাওয়া গেলা না তাঁকে। যিনি টেলিফোন ধরলেন, পরে ফোন দিতে বললেন তিনি। এরপর কয়েকবার ফোন করার পর পাওয়া গেলো। তিনি জানালেন, টেলিভিশনের নাটকের জন্য তিনি উৎসাহ বোধ করছেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত তাঁর বাসায় যাওয়ার।

তিনি থাকতেন শ্যামলীতে। বাংলাদেশের প্রধান কবি, শামসুর রাহমানের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হয় হুমায়ূন আহমেদের বাসস্থলে। একটি পাকা, অপ্রশস্ত রাস্তা। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত। গাছের গোড়ায় পানি। পানিতে ছোট ছোট মাছ দৌঁড়ে বেড়ায়। বাতাসে ধানগাছগুলো আন্দোলিত। দেখলে চোখ জুড়ায়। এরই একদিকে হুমায়ূন আহমেদের বাসস্থান। দোতলায় একটি ফ্ল্যাট। প্রথমে গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল না। কেউ একজন জানালেন-আসতে দেরি নেই, অপেক্ষা করেন। অপেক্ষার পালা। খুব বেশি দেরি হলো না। সস্ত্রীক হুমায়ূন এলেন। হুমায়ূন আহমেদের কোলে সেই ছোট্ট ফুটফুটে কন্যা, নাম নোভা। গুলতেকিন আহমেদ হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী। নামটি দাদা অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁর দেয়া। ফারসি নাম। গুল অর্থ ফুল। সেখান থেকেই গুলতেকিন- ফুলের বাগান! চমৎকার মহিলা। সুন্দরী, নম্রভাষী, সৎস্বভাবের হৃদয়বতী বাঙ্গালী রমণী। সাদরে অনুরোধ জানালেন বসার জন্য এবং স্বামীকে অনুরোধ করলেন টেলিভিশনের জন্য যেন তিনি নাটক লেখেন। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো বাধ্য হয়েই বললেন, চেষ্টা করবো। কয়েক বারের অনুরোধের পরে তিনি চেষ্টা করবেন জেনে প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেলো, অনুরোধের ঢেকি তিনি গিলেছেন। এখন অপেক্ষা। আবার টেলিফোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। যথারীতি পাওয়া গেল না তাঁকে। যখন পাওয়া গেলো তিনি জানালেন লিখেছেন। কখন আসতে পারেন টেলিভিশনে! ঠিক হলো পরের দিন পাণ্ডুলিপি নিয়ে টেলিভিশনে আসবেন।

নাটকের নাম ‘প্রথম প্রহর’। সীমিত কয়েকটি চরিত্র। ছোট ছোট দৃশ্য। কথার পিঠে কথা। সাবলীল সংলাপ। তরতর করে এগিয়ে যাওয়া। সংলাপগুলো এমন, মনে হলো চরিত্রগুলো কথাবার্তা শুরু করলে, আপনা আপনি এগিয়ে যাবে। সংলাপ মুখস্ত করার প্রয়োজন নেই। অনায়াসে ঠোঁটে এসে যায়। এমনই সহজ, সরল, সংলাপ। বিস্ময়াবিষ্ট একটি শব্দ বেরিয়ে এলো মুখে ‘অসাধারণ’। নাটকটি একটি মেসবাড়ীকেন্দ্রিক। নাটকের একটি অন্যতম চরিত্র মহিম। একজন হস্তরেখাবিদ। চরিত্রটি খুবই আকর্ষণীয়। অনবদ্য চরিত্র, সত্যিকার অর্থেই অনুকরণীয়। যে  ক’টি চরিত্র নাটকে আনা হয়েছে, প্রত্যেকটি চরিত্রকেই নাট্যকার সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। যেটি সচরাচর নাটকে দেখা যায় না। নায়ক-নায়িকা থাকেন নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যসব চরিত্র তাদেরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। আলোড়িত হয়। নাটককে এগিয়ে নেয়। এটাই এ যাবতকালে দেখা নাটকের চিত্র। হুমায়ূনের লেখা নাটকটি একেবারেই ব্যতিক্রম। নাটকের কপি তৈরি হলো। কাস্টিং শেষ। মহড়া দু’ একদিনের মধ্যে। তখন একটি নাটকের জন্য কমপক্ষে চার দিনের মহড়া ছিল অবধারিত।

এরই মধ্যে টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি নাটক প্রচার হলো। খুলনার একটি দলের প্রদর্শিত মঞ্চ নাটক। প্রচার হলো টেলিভিশনে। যে রাতে নাটকটি প্রচার হলো, পরের দিন সকালে বেশ হৈ চৈ। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী টেলিভিশনে এসে সংশ্লিষ্টদের উপর প্রচণ্ড হম্বিতম্বি। নাটকের সমস্ত চরিত্রই ধুতিপরা, অমুসলিম। এটি একটি অগ্রহণীয় কর্ম। বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ সময় যিনি নাটকের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁকে প্রথম প্রহরের গল্প ও চরিত্র সম্পর্কে জানানো হলো। তিনি মহিম চরিত্রটি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আপত্তি জানালেন। কারণ জানাতে চাইলে উল্লিখিত রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে বিপত্তির কথাটি বললেন। এ নাটকে মহিমকে যদি ধুতি পরানো না হয়, তাহলে নির্বিঘেœ পাশ করানো যায়। কি করা যেতে পারে! মহিমের তিন পকেটওয়ালা শার্টের সঙ্গে পাজামা, তাহলেই সমস্যার সমাধান। মেনে নিতে সমস্যা। কেন এমন করতে হবে! যেহেতু নাটকের সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে, এতো কষ্ট করে নাটক সংগ্রহ করা হয়েছে! এই সামান্য কারণে নাটক হবে না! একথা মানা যায় না। বিষয়টি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আলাপ হলো। চুপ করে শুনলেন তিনি। খানিক পরে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘পাণ্ডুলিপিটি দিন।’ পাণ্ডুলিপিটি গোল করে হাতে নিলেন এবং কামরা পরিত্যাগ করার সময় বললেন-দেখি। নাটক হবে না-এ বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত হয়ে মাথায় হাত। অসম্ভব রকম মন খারাপ। এত পরিশ্রম! সবই পণ্ডশ্রম! ধৈর্য পরীক্ষা।

পরের দিন সম্পূর্ণ নতুন একটি নাটক নিয়ে উপস্থিত। সেটি সম্পর্কে পরে বলা যাবে। এরও দু’একদিন পরে সম্পূর্ণ নতুন অন্য একটি নাটক নিয়ে এলেন তিনি। একই নাম ‘প্রথম প্রহর’। কাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাটকটি খুব সম্ভব তিনি ‘অন্যদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে লিখে থাকবেন। তৃতীয় নাটকটি, যেটির কথা বলা হচ্ছে ‘প্রথম প্রহর’ নাম হলেও ঘটনা ভিন্ন। তাঁর প্রকাশিত ‘প্রথম প্রহর’ উপন্যাস এবং টেলিভিশনের ‘প্রথম প্রহর’ নাটক একেবারেই ভিন্ন কাহিনীসমৃদ্ধ। ‘প্রথম প্রহর’ উপন্যাসটি টেলিভিশন থেকে প্রচারের পরে লেখা বলে প্রতীয়মান হয়। ‘প্রথম প্রহর’ লেখা ১৯৮৩ সালে জুলাই/আগস্ট মাসে। আর ‘প্রথম প্রহর’ উপন্যাসটি লেখা সম্ভবত ১৯৯০ এর দিকে। এই উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদ নওয়াজীশ আলী খানকে উৎসর্গ করেন। টেলিভিশনের জন্য হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রথম নাটক কোনদিনই প্রচার হয়নি।

টেলিভিশনের নাটক প্রচারের প্রায় তিন মাস আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ত্রৈমাসিক পত্রিকা টিভি গাইডে ‘প্রথম প্রহর’ গল্পের সারাংশ প্রকাশিত হয়। যেহেতু নামটি বইয়ে প্রকাশিত, নাম পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাহলে ঘটনাটা কি আসলে! সাধারণত টিভি গাইডে যে গল্পের সারাংশ দেয়া হয়, তা যে কোন কাহিনীর গল্পাংশ হতে পারে। এমন করে সাজানো থাকে, যে কোন নাটকের ক্ষেত্রেই ঐ বক্তব্য প্রয়োগে অসুবিধা হয় না। অতএব একটা নামের তিনটা নাটক/তিনটা কাহিনী, কিন্তু গল্পের সারাংশ এক, শিরোনাম এক। দুটি টিভি নাটকের কথা বলা হলো। তিন নাম্বারটি আসলো কোত্থেকে? আছে। তিন নাম্বারও আছে। ঘটনাটা এই, প্রথম নাটকটি হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে গিয়েছিলেন। যেটি মহিমের চরিত্র নিয়ে সমস্যা। তারপর দুই নাম্বার নাটকটি তিনি জমা দিয়েছেন যেটি, পাঠ করেও মনে হয়েছে ‘অসাধারণ’।  টেলিভিশনের তৎকালীন সুযোগ-সুবিধায় ঐ নাটকটি নির্মাণ করা সম্ভব ছিলো না। কাহিনীটি ছিলো ‘বনফায়ার’ ঘিরে। নাটকের চরিত্রগুলো একটি ঘন জঙ্গলে ‘বনফায়ার’ করে উৎসবে নিমগ্ন। হঠাৎ পাশের একটি জলাশয়ে এক তরুণীর ভাসমান লাশ দেখতে পায় সদস্যদের একজন। তারপর শুরু হয় এই লাশ কার, কি করে এলো, ইত্যাদি। এটিও টিভি নাটকে রূপান্তর করা সম্ভব হলো না। তিনি লিখলেন তৃতীয় নাটক। নাম তার ‘প্রথম প্রহর’। কাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন। চরিত্র ভিন্ন। এবং সেই সময়কার টেলিভিশনের সুযোগ সুবিধা দ্বারা সহজেই নির্মাণ সম্ভব। এই নাটকটি কোনো উপন্যাস থেকে নেয়া কিনা তা জানা যায়নি। নাটকের বিষয় ছিলো সততা। ‘প্রথম প্রহর’ ধারণ হয় ১৯৮৩ সালের ১১ই আগস্ট। যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা- মাসুদ আলী খান, সাজ্জাদ হোসেন, রানী সরকার, লাকী ইনাম, শাহরিন খালেস লিটা (এক সময় ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ফজলে লোহানীর সঙ্গে সহ উপস্থাপন করতেন। তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন)। আশরাফ উদ্দিন এবং নওয়াজীশ আলী খানের সব নাটকে যিনি অভিনয় করেছেন সেই অসাধারণ নাট্যশিল্পী আবুল হায়াত। নাটকটি এ সপ্তাহের নাটক চাঙ্কে প্রচার হয়। সম্প্রচার শেষে কয়েকটি টেলিফোন আসে। এর মধ্যে একটি টেলিফোন করেন এক সময়কার অন্যতম মননশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের কৃতি টেলিভিশন প্রযোজক বেলাল বেগ। তিনি জানান যে, বাংলাদেশে টেলিভিশন নাটকে একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো, এই নতুন নাট্যকারের আগমনে। সত্যিকার টেলিভিশন নাটক এমন হওয়ারই কথা। বক্তৃতা নয়, ক্লাসরুম নয়, বড় বড় কথার কপচানী নয়। সহজ, সরল, মধ্যবিত্তের করচা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। টেলিভিশনে এভাবেই যাত্রা শুরু হলো হুমায়ূন আহমেদ এবং তার অকল্পীয় জনপ্রিয় নাটকের। সেই যাত্রা অব্যাহত আছে এবং উন্নত থেকে উন্নতর হচ্ছে।

টেলিভিশনে প্রচার হওয়া তাঁর দ্বিতীয় নাটক কোনটি মনে করা যাচ্ছে না। তবে বেশ কিছু নাটকের নাম মনে পড়ে। এর মধ্যে অসময়, অযাত্রা, বিবাহ, এসো নীপবনে, ঐজাবোর্ড, মাটির ও পিঞ্জিরার মাঝে, মরণরে তুহুমম, নিমফুল ইত্যাদি। এসব নাটকের নির্মাতা নওয়াজীশ আলী খান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু টেলিফিল্ম যেমন, কবি, গাছ মানুষ, ও জননী। জননী নাটকটি জাতিসংঘের একটি প্রতিযোগিতায় ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ লাভ করে। জানা যায় পৃথিবীর বহু দেশের টেলিভিশনে এই নাটকটি নারীর ক্ষমতায়নের মডেল হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি চমৎকার পাবলিক সার্ভিস এ্যানাউন্সমেন্ট (পি.এস.এ) অভুতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। যেমন ঘুটা-ঘুটা, চোখ এবং আমরারে রক্ত দিবো কেডা। হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও নওয়াজীশ আলী খান প্রযোজিত শেষ নাটকের নাম ‘ছায়াবৃত্ত’। নাটকটি ঈদ উল আযহার বিশেষ নাটক। প্রযোজনা শেষ করতে পারেননি নওয়াজীশ আলী খান। হাসপাতালে যেতে হয় অসুস্থ হয়ে। নাটক শেষ করেন রিয়াজউদ্দীন বাদশা। টেলিভিশনে স্বার্থক সিরিজ, সিরিয়াল রচনার প্রবর্তকও নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদ। বহুব্রীহি, এই সব দিনরাত্রি, অয়োময়, কেউ কোথাও নেই। বিভিন্ন পরিচালক নির্মাণ করলেও প্রধান শক্তি নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ। এর মধ্যে বহুব্রীহি ও অয়ময়-এর প্রযোজক নওয়াজীশ আলী খান। এই সব দিন রাত্রি, মুস্তাফিজুর রহমান এবং কেউ কোথাও নেই-এর নির্মাতা বরকতউল্লাহ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আর কোন টেলিভিশন এই মানের নাটক সম্প্রচারের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের নাটক পরিচালনা করেছেন বেশ কয়েকজন সার্থক নাট্য নির্মাতা। তাঁরা প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুন। আতিকুল হক চৌধুরী, রিয়াজউদ্দীন শেখ বাদশা প্রমূখ।

হুমায়ূন আহমেদ তার কোন একটি লেখাতে উল্লেখ করেছেন যে, তার নাটক পাঠান্তে নওয়াজীশ আলী খান সবসময়ই ‘অসাধারণ’ বলে মন্তব্য করতো। কথাটি ঠিক। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর লেখা নাটক যেগুলো পাঠ করার সৌভাগ্য হয়েছে, সত্যিকার অর্থে তার সবই ছিলো অসাধারণ। টেলিভিশন নাটকে এখন পর্যন্ত তাঁর সমকক্ষ কোন টিভি নাট্যকারের আবির্ভাব হয়নি। তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া তো দূরের কথা! তাঁর টিভি নাটকের বৈশিষ্ট্য হলো, সহজ, সরল, স্বাভাবিক সংলাপ, যা অনায়াসে যে কোন অভিনয় শিল্পী উপস্থাপন করতে পারেন। কাহিনীর সারল্য ও হৃদয়স্পর্শী করার ক্ষমতা। সৎগুণাবলিসম্পন্ন চরিত্রের সমাগম। প্রতিটি চরিত্রই নাটকে যেন অপরিহার্য। নায়ক যতটা প্রয়োজনীয়, কাজের মেয়ে/বৃদ্ধা মহিলাটি একইভাবে প্রাধান্যপ্রাপ্ত। এ দেশের নাটকে নায়ক-নায়িকারা সর্বসৎগুণসম্পন্ন। আর একটি দল ভিলেন হিসেবে সমস্ত কিছুই নেতিবাচক চরিত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এই গতানুগতিক ধারার অপনোদন করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর প্রায় সব চরিত্রই ইতিবাচক, সৎগুণাবলীসম্পন্ন ও মানবিক গুণে সমৃদ্ধ। এ যেন তাঁরই নিজের চরিত্রের প্রতিফলন।

প্রায়শই একটা কথা শুনতে হয়। কথাটি এই- নওয়াজীশ আলী খান হুমায়ূন আহমেদকে নাট্যকার বানিয়েছেন। অত্যন্ত বিনম্র বিশ্বাস ও দৃঢ়তার সংগে জানাতে চাই যে, হুমায়ূনদের মতো অসাধারণ ও শক্তিমান সৃষ্টিশীলদের কেউ তৈরি করতে পারে না- বানাতে পারে না। তাঁরা হন। স্রষ্টা তাঁদের তৈরি করেন। অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী এই আলোকচ্ছ্বটা এই প্রদীপ দেশের যে কোন স্থানেই থাকুন না কেন, তার দীপ্তি চোখে পড়বেই। সে আলো সর্বত্র ছড়িয়ে যাবেই। সে ঔজ্জ্বল্য সব কিছুকে আলোকিত করবেই। জনগণ ভালোবাসবে। দেশ সম্মান দেবে। যার প্রতিফলন ঘটছে হুমায়ূন আহমেদের জীবনে।

কিউএনবি/রেশমা/১০ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/দুপুর ১:১৫