২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১:৩৬

রামপুরা খাল নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল আনিসুল হকের

 

ডেস্ক নিউজ : রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ থেকে ত্রিমোহনী নড়াই খালকে (রামপুরা) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। পুরো প্রকল্পটি অনেকটা হাতিরঝিলের আদলেই করার পরিকল্পনা ছিল তার। জীবদ্দশায় তিনি এই খালটি নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনাও করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাবনাও জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে তার মৃত্যুতে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। কয়েকজন নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রয়াত মেয়রের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, এই খালকে কেন্দ্র করে নেওয়া পরিকল্পনায় চারটি বিষয় প্রধান্য দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো হলো—খালের প্রবাহ সচল রাখা, দূষণমুক্ত রাখা, নৌযান চলাচল উপযোগী করা এবং আফতাবনগর ও বনশ্রীর মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করা। কিছু ছবি সংগ্রহ করে খালের ওপর আফতাবনগর ও বনশ্রীর সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করতে কয়েকটি ব্রিজ তৈরির প্রাথমিক নকশাও করা হয়েছিল।

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ওই খালটি নিয়ে আনিসুল হকের মহাপরিকল্পনা ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, খালটিকে হাতিরঝিলের সঙ্গে যুক্ত করে একটা আধুনিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধারে পরিণত করতে। তার এই পরিকল্পনার সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম। অনেক দূর অগ্রসরও হই। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে বিষয়টি ভেস্তে যায়।’

আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি আনিসুল হক প্রধানমন্ত্রীকেও জানিয়েছিলেন। প্রধনমন্ত্রী তখন ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ঢাকা ওয়াসার ‘দাসের কান্দি’ স্যুয়ারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন। তবে দ্রুত প্রাথমিক কাজগুলো প্রস্তুত করার তাগিদ দিয়েছেন। জরিপ করে ডিপিপি তৈরির আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর পরে চলে যান না ফেরার দেশে।

আনিসুল হকের মৃত্যুর পর তার সেই প্রকল্পটি নিয়ে আর কেউ কাজ করছে না। প্রয়াত মেয়রের সেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে আফতাবনগর ও বনশ্রী এলাকার বাসিন্দারা হাতিরঝিলের মতো একটি দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প পেতেন। তার স্বপ্ন ছিল প্রাকৃতিক জলাধার, পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র, ক্যাম্পিং, সাঁতার, হাঁটার পথ তৈরি ও পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে নাগরিকদের মেলবন্ধন ঘটানো।

প্রকল্পটির বাইরে আরও চারটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন আনিসুল হক। এর মধ্যে রয়েছে—কল্যাণপুর ওয়াটার পন্ড প্রকল্প, বোটানিক্যাল গার্ডেনের উত্তরে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের দক্ষিণে ‘জল নিসর্গ’ প্রকল্প ও গোড়ান-চাটবাড়ি এলাকায় আরেকটি জলাধার নির্মাণ প্রকল্প। এগুলো ছিল তার ‘ওয়াটার বেস’ প্রকল্প। সেগুলো আর হয়নি। এই কাজগুলো নিয়ে কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এগুলো নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।’ ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, রাপা প্লাজা, ধানমন্ডি-৮/এ স্টাফ কোয়ার্টার মোড়, কাঁঠালবাগান, গ্যাস্ট্রোলিভার গলি, কলাবাগান ডলফিন গলি, গ্রিনরোড—এসব এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে নড়াই খাল দিয়ে বালু নদীতে যায়। অন্যদিকে মাদারটেক ও মেরাদিয়ার পানিও নড়াই খাল দিয়ে বালু নদীতে যায়। আনিসুল হকের পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত হলে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা দূরসহ পানি নিষ্কাশনে গতি আসবে।

স্থানীয়রা জানান, আশির দশকের শুরুর দিকেও এই খাল হয়ে বর্তমান হাতিরঝিল দিয়ে কাওরানবাজার পর্যন্ত নৌপথ চালু ছিল। তখন এ খাল দিয়ে হাতিরঝিল হয়ে নৌপথে শাক-সবজিসহ অন্যান্য মালামাল কাওরানবাজারে যেতো। কাওরানবাজারে বিজিএমইএ ভবনের পাশে মাছের পাইকারি বাজারটিতে একসময় শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর মাছের ল্যান্ডিং পোর্ট ছিল। বর্তমানে হাতিরঝিল প্রকল্পের পানি পাম্পের মাধ্যমে এ খালের পানি নিষ্কাশন করা হয়। তাছাড়া ঝিলের অতিরিক্ত পানিও রামপুরা ব্রিজ হয়ে এই খালে পড়ে। সে সময়ের ছোট নদীর আকৃতির খালটি দিন দিন ভরাট হচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নব্বই দশকের দিকে বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে একটি জরিপ করে মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর একটি প্রস্তাবনাও বাস্তবায়ন হয়নি। ওই প্রস্তাবনায় বলা হয়, ঢাকা শহর থেকে পানি নির্গমনের যে পাঁচটি আউটলেট রয়েছে সেগুলোর মুখে বড় বড় জলাধার প্রয়োজন। শহরের পানিগুলো খাল বা ড্রেন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওই জলাধারগুলোতে আবদ্ধ হবে। সেখান থেকে দুই পদ্ধতিতে পানি অপসারণ করা যেতে পারে নদীতে। প্রথমত, নদীতে পানি কম হলে তখন স্বাভাবিক গতিতে পানি চলে যাবে। আর নদীতে পানি বেশি বা জোয়ার থাকলে পাম্পিং পদ্ধতিতে পানি অপসারণ করা হবে। তবে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

 

কিউএনবি/রেশমা/১০ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/দুপুর ১২:৫১