২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:০২

চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা, কার লাভ কার ক্ষতি

 

ডেস্ক নিউজ : চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিরা এবার ঋণ পুনর্গঠনে বিশেষ সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। যারা জামানত ছাড়া এলটিআর (লোন এগেইনেস্ট ট্রাস্ট রিসিট) বা স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্বাস রাখেননি সেইসব ব্যবসায়ীরা টাকা ফেরত না দিয়েও খেলাপির তকমা মুছতে পারবেন। এজন্য একটি নীতিমালাও তৈরি করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখতকে। ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখছে এই কমিটি।

এ প্রসঙ্গে ড. জায়েদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণত ঋণ পুনর্গঠন করতে হলে ওই ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমরা এখন যে নীতিমালা করতে যাচ্ছি, এটা একেবারেই নতুন বিষয়। এটা মূলত এলটিআর বা জামানত ছাড়া ঋণ। যা বিশ্বাসের ওপর নেওয়া। এগুলো আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই ধরনের ঋণ ফেরত আনার ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন করে পর্যাপ্ত জামানাত দিলে এমন গ্রাহকদের ফের ঋণ দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকও উপকৃত হবে।’

তার মতে, অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি হলমার্কের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘হলমার্কের এমডি ও চেয়ারম্যানকে জেলে রেখে কোনও টাকা ফেরত পাওয়া যায়নি। উপরন্ত হলমার্কের জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কিছু চুরিও হয়ে গেছে। তাদেরকে জেলে না  রেখে যদি নজরদারিতে রেখে সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে ব্যাংক ধীরে ধীরে টাকা ফেরত পেতো।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘খেলাপি গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ব্যাংকের উপকার হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল, তারা আবারও খেলাপি হয়েছে। ইচ্ছেকৃতভাবে অসৎ ব্যবসায়ীদেরকে টাকা দেওয়া বন্ধ না হলে ব্যাংকের কেবল ক্ষতিই হবে।’তিনি বলেন, ‘দেখা যাবে, বিশেষ সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিরা আরও টাকা নেবে। ব্যাংক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

অবশ্য ব্যাংকাররা বলছেন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের চাপের মুখে এমনিতেই পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংক। এমনকি একই গ্রাহকের কোনও কোনও ঋণ ১০ বারও পুনঃতফসিল করতে হয়েছে। এরপরও এসব গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংকের টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি কৌশল। তার মধ্যে একটি পুনঃতফসিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের হার অনেক কম। আমরা হিসাব করে দেখেছি, পুনঃতফসিল করা ঋণের মধ্য থেকে শতকরা ৫০ ভাগ ভালোভাবে আদায় হয়। বাকিরা  ইচ্ছেকৃত সময় ক্ষেপণ করে। তারা কখনও ঋণ ফেরত দেন না। বিশ্বাস ভঙ্গ করা ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তার সদস্য করা হয়েছে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী  ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে।’

ড. জায়েদ জানান, এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডিরা এই বিষয়ে একটি বৈঠক করেছেন। এমডিরা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করবেন। সে প্রতিবেদন নিয়ে কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। অচিরেই ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানরা এ বিষয়ে আরেকটি বৈঠকে বসবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরেই বিশেষ সুবিধা পাবেন চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিরা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নতুন করে প্রয়োজনীয় জামানত নিয়ে ওইসব ব্যবসায়ীকে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিতে চাই। যাতে তারা ব্যাংকের টাকাটা ফেরত দিতে পারেন। এটা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত প্রয়াস। আমরা চাচ্ছি, যেসব ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী টাকা ফেরত দিতে পারছেন না, তাদেরকে আমরা ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে সেখান থেকে ঋণের টাকা ফেরত আনতে চাই।’

এর আগে ২০১৫ সালে বিশেষ সুবিধা দিয়ে দেশের ১১টি বড় শিল্প গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের অনুমোদন দেয়। পুনর্গঠিত ঋণের মধ্যে ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এসএ গ্রুপ। গ্রুপটির এসএ অয়েল রিফাইনারি ও সামান্নাজের পক্ষে ৯২৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করে ছয়টি ব্যাংক। বিপুল অংকের ঋণের সিংহভাগই বর্তমানে খেলাপি। এ অবস্থায় আবারও ঋণ পুনর্গঠন চাইছে গ্রুপটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এলটিআর খাতে ব্যাংকগুলোর ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ আটকে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে টাকা দিয়ে ফেঁসে গেছে ব্যাংকগুলো।

এদিকে খেলাপি ঋণবিষয়ক টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এছাড়া অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। আর আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।

প্রসঙ্গত, এলটিআরের ক্ষেত্রে ব্যাংকের আওতায় মালামাল থাকে না। তবে লিম বা লোন এগেইনেস্ট ইমপোর্টেড মার্চেন্ডাইজের ক্ষেত্রে ব্যাংকের গুদামে মালামাল থাকে। এ দুই ধরনের ঋণ সুবিধারই বিপুল অপব্যবহার হয়েছে প্রায় দেড় দশক ধরে। নিত্যপণ্য ছাড়াও শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রেও এলটিআর বা লিম-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি হয়েছে, পরবর্তী সময়ে যা মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান নিয়মে এলটিআরের বিপরীতে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য ঋণ বিতরণ করতে পারে। ৯০ দিনের মধ্যে আদায় না হলে ঋণটি খেলাপি হওয়ার কথা। তবে অধিকাংশ ব্যাংক যথাসময়ে অর্থ আদায় না হওয়ার পরও খেলাপি দেখায় না। প্রথম পর্যায়ে ফোর্সড লোন বা বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করা হয়।

আমদানি করা পণ্য ছাড় ও পরিবহনে আমদানিকারকদের সহায়তা করতে ব্যাংক তাদের ‘নির্ভরযোগ্য’ গ্রাহকদের এলটিআর ঋণ দিয়ে থাকে। নিয়ম হচ্ছে, আমদানিকারক বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওই পণ্য বিক্রি করে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করবে। এই ঋণের বিপরীতে জামানত থাকে না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট এলটিআর বা টিআরের (ট্রাস্ট রিসিপ্ট) পরিমাণ ৫২ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অঙ্কের এলটিআরের অর্ধেকেরও বেশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধিত হচ্ছে না। ফলে এগুলো মেয়াদি ঋণে রূপান্তরিত হচ্ছে। মোট এলটিআরের প্রায় ৫২ শতাংশ মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়েছে।

এলটিআর নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়,  ‘চট্টগ্রাম শহরের কতিপয় বড় গ্রুপের অনুকূলে প্রদত্ত এলটিআরের পরিমাণ, এলটিআর সমন্বয়ের প্রবণতা, ব্যাংকিং লেনদেনের চিত্রসহ এলটিআরের বিপরীতে বকেয়া পরিশোধের সক্ষমতার বিষয়টি উদ্বেগজনক।  একই গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থানীয় এলসি খুলে পরবর্তী সময়ে এলটিআর-সুবিধা নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ না দিয়ে শুধু কাগুজে প্রমাণাদি দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, কিছু শাখায় এলটিআরের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি করে খেলাপি হতে দেওয়া হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক পণ্য আমদানিকারী প্রতিষ্ঠান ইলিয়াস অ্যান্ড ব্রাদার্স, ইমাম গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ, এইচআর গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, জেসমিন ভেজিটেবল অয়েল, মেরিন ভেজিটেবল অয়েল, এস এ অয়েলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা কেন্দ্রিক সিটি গ্রুপ, মদিনা গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ, মারহাবা স্পিনিংসহ আরও কিছু খ্যাতিমান গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক এলটিআর নিয়েছে। এসব এলটিআরের বেশিরভাগই খেলাপি হয়েছে।

জানা গেছে, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কোনও ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিতে হলে আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। আপাতত চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা পারেন। পরে অন্যরাও এই সুবিধার আওতায় আসবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য এই নীতিমালা তৈরি হলেও বেসরকারি ব্যাংকও ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নির্ধারিত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ রয়েছে। নিয়ম মেনে কোনও ঋণ তফসিল করা হলে ব্যাংকের কিছু নগদ আদায় বাড়ে। ঋণ পুনর্গঠনের জন্য একটি সাধারণ নিয়ম আছে, ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত থাকলে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ (মোট ঋণের ১০ শতাংশ) ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার শর্তে ব্যাংক ইচ্ছে করলে কোনও গ্রাহককে সর্বোচ্চ তিনবার ঋণ পুনর্গঠন করতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয় না। তবে কোনও ঋণ তিনবারের বেশি পুনর্গঠন করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগে। এছাড়া শর্ত পূরণে কোনও ঘাটতি থাকলে সেক্ষেত্রে ঋণ পুনর্গঠন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের শর্ত শিথিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে ব্যাংকার গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই সুবিধা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অল্প পরিমাণ এককালীন নগদ জমা (ডাউন পেমেন্ট) দিয়ে খেলাপি ঋণ নবায়নের সুযোগ পান। পরে ৫০০ কোটির বেশি ঋণ রয়েছে এমন বড় শিল্প গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকেও খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনে বিশেষ ছাড় দিতে চাপ সৃষ্টি করা হলে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা দিয়ে একটি বিশেষ নীতিমালা তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ওই নীতিমালা অনুযায়ী, মেয়াদি ঋণ ১২ বছর মেয়াদে এবং তলবি ও চলমান ঋণ ৬ বছর মেয়াদে পুনর্গঠন এবং পুনর্গঠিত ঋণের সুদ হার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঘোষিত সুদহারের চেয়ে হ্রাসকৃত হারে নির্ধারণ করা হয়।

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সন্ধ্যা ৭:৫২