১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৫০

দুই বছরের ক্ষমতা চায় যুক্তফ্রন্ট

 

ডেস্ক নিউজ : বিএনপির সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারলে পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে প্রথম দুই বছর ক্ষমতার অংশীদারি চায় যুক্তফ্রন্ট। এরপর তারা বিএনপির হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চায়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ‘মালয়েশিয়া মডেল’-এর আদলে ক্ষমতা ভাগাভাগির ওই প্রস্তাব বিএনপিকে দিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। ফলে যুক্তফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেও এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, মান্নার ওই প্রস্তাব সম্পর্কে তাঁরা জানেন। তবে এটি আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর্যায়ে যায়নি এখনো। বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের দু-একজন নেতার জানার মধ্যে এখনো সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও বৃহত্তর ঐক্য নিয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা হলো—আগ্রহী অন্য দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য বা সমঝোতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারলে প্রধানমন্ত্রীর পদে তারা ‘ছাড়’ দিতে রাজি আছে। কিন্তু মেয়াদ ভাগাভাগি করে সরকার পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা নতুন।

গত মে মাসে মালয়েশিয়ায় নির্বাচনের পর মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচিত হয়। জানা যায়, কী প্রক্রিয়া বা কৌশলে ওই সমঝোতা হয়েছে তার বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত বার্তাবাহকের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।   

অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় সব বৈঠকে অংশ নিয়েও শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্টে যোগ দেয়নি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। ‘ঐক্য প্রক্রিয়া’র ব্যানারে দলটি আলাদা অবস্থানে আছে। তবে সম্প্রতি এক বৈঠকে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম একসঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বিএনপির সঙ্গেও একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।  

যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দুই বছর বা মেয়াদের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘সমঝোতা হলে অনেক কিছুই হতে পারে। তারা (বিএনপি) যদি ভাগ করে নেয়, মেয়াদের এ অর্ধেক আমরা, বাকি অর্ধেক তারা। যেমন মালয়েশিয়া মডেল, মাহাথির ও ইব্রাহিম করেছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতার অর্ধেক মেয়াদে থাকার প্রস্তাবটি মান্নার দেওয়া। এটি নিয়ে যুক্তফ্রন্টের ভেতরে আলোচনা হয়েছে।

প্রস্তাব দেওয়ার কথা স্বীকার করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই প্রথম দুই বছর আমরা চেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ভালো প্রস্তাব বলেই দিয়েছি। আশা করি আস্তে আস্তে এই প্রস্তাব যুক্তফ্রন্ট মানবে এবং একসময় বৃহত্তর ঐক্যও মানবে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য সরাসরি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামসহ উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কোন কোন ইস্যুতে ঐকমত্য হবে সে বিষয়গুলো পর্যালোচনা চলছে। কিন্তু চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো এখনো সামনে আসেনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় অনেক ইস্যু ও প্রশ্ন সামনে চলে আসে; যা নিষ্পত্তি হয় শেষ সময়ে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার অবশ্য মনে করেন, নির্বাচনে জয়লাভ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করবে এটিই স্বাভাবিক। তবে সমঝোতা হলে কে আগে আর কে পরের দুই বছর সরকার চালাবে এটি সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, ‘প্রধান সমস্যা হলো—শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব থেকে বের করে ভালো নির্বাচন আদায় করা। তা না হলে এসব স্বপ্ন দেখে লাভ নেই।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সমঝোতা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার গঠনের অধিকার বিএনপিরই থাকার কথা। কিন্তু কৌশলগতভাবে চাপের মধ্যে থাকার কারণেই বিএনপির এখনকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সরকারের শীর্ষ পদে যেতে আগ্রহী নন। আর এ বিষয়টি অন্য দলগুলো জানে বলেই নানা ধরনের প্রস্তাব আসছে।     

মালয়েশিয়ায় দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম আড়াই বছর মাহাথির মোহাম্মদ এবং পরের আড়াই বছর আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে আনোয়ারের স্ত্রী আজিজা ওয়ান ইসমাইলকে।

বিএনপিসহ ‘উদারপন্থী’ দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হলো, বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া কার্যকর হলে বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনকে সরকারের শীর্ষ পদগুলোতে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হওয়া সম্ভব। কারণ দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ার কারণে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না বলেই অনেকে মনে করেন।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারলে সমঝোতার মাধ্যমে নেতৃস্থানীয় কাউকে প্রধানমন্ত্রী করার কথা সরকারের বাইরে থাকা এই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে পরে উপনির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী করে প্রধানমন্ত্রীর ভার দেওয়া যেতে পারে।

অবশ্য এমন আলোচনায় বি চৌধুরী ও কামাল হোসেনের নাম উঠে এলেও তাঁদের মধ্যে এখনো সমঝোতা হয়নি। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় নির্দিষ্ট মেয়াদের পাশাপাশি সংসদের আসন সংখ্যায়, মন্ত্রিসভায় এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য চান বি চৌধুরী। এ ছাড়া রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভের (আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য আনার কথাও বলেছেন তিনি। 

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এই তিনজনের কেউই ‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আগামী মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী নন’—এমন বার্তা ‘উদারপন্থী’ দলগুলোর কাছে রয়েছে বলে জানা যায়।

গণফোরামের সঙ্গে এক বৈঠকে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ ও মওদুদ আহমদ এমন বার্তা দিয়ে ড. কামাল হোসেনকে জাতীয় ঐক্যে ‘নেতৃত্বের’ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, বিএনপি এখন কেবল দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং দেশের স্বার্থে এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় যাওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে অবশ্যই এ ক্ষেত্রে ড. কামাল হোসেন ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মধ্যে সমঝোতা হতে হবে বলেও সেদিন বিএনপির দুই নেতা স্মরণ করিয়ে দেন বলে জানা যায়।

যদিও ড. কামাল হোসেন ওই দিনের বৈঠকসহ বরাবরই বলে আসছেন, এই বয়সে তিনি কিছুই হতে চান না। তবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে চান।

আর অধ্যাপক বি চৌধুরী একাধিকবার বলেছেন, সরকারের শীর্ষ পদে এমনকি নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হবেন না। তিনি গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমি এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি কিছুই হতে চাই না। কারণ আমি উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি সবই ছিলাম।’

 সুত্র : কালের কণ্ঠ

 

কিউএনবি/রেশমা/৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সকাল ৮:৩৩