২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৫:৪৪

মুন্সীগঞ্জে করলা চাষে হাজারো চাষীর ভাগ্য পরিবর্তন

 

শেখ মোহাম্মদ রতন, মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছামতির নদীর পাড়ে যতদুর দৃষ্টি যায়-দেখতে পাওয়া শুধুই করলার আবাদ।বাংলাদেশে মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত আলুর পরেই সবজি করলার স্থান।

বিস্তীর্ণ বালুকাময় জমিতে শুধুই করলা চাষিদের হাসি। করলা চাষাবাদে এ অঞ্চলের শত কৃষান-কৃষানিদের ভাগ্য-পরিবর্তন ঘটেছে এবার।করলার ব্যাপক ফলন হওয়ায় করলা চাষীরা এবার বেশ লাভবান হয়েছেন।বিস্তীর্ণ জমির করলার হাসির মতোই চাষীদের মুখেও ফুটে উঠেছে হাসি।উৎসব মুখর পরিবেশে এখন সেই করলা তোলার ধুম পড়েছে সেখানে।

অনেক চাষী এ করলা চাষ করে এবার লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন। কেবল মাত্র করলা চাষাবাদ করে কৃষিতে সাফল্য পাওয়ার এ রকম চিত্র দুর্লভ বটে।ইছামতি নদীর পাড়ে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বেতকা ও সিরাজদীখান উপজেলার চরছটফটিয়া গ্রাম জুড়ে করলা চাষের এ সাফল্য গাঁথার চিত্র ফুটে উঠেছে।করলার গ্রামে পরিনত মুন্সীগঞ্জের বেতকা ও চরছটফটিয়াসহ কয়েকটি গ্রাম।

মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির জানান, উপজেলার কয়েকটি গ্রামে এবার ৫ হাজার হেক্টর জমিতে করলার আবাদ করা হয়েছে।স্থানীয় চাষীরা জানান, এক কানি জমিতে করলা আবাদ করে এবার এক একজন চাষী কমপক্ষে পৌনে এক লাখ টাকা লাভ পাচ্ছেন। এবার করলার দাম ভালো, ফলনও বেশী।

তাই যে সব চাষী ২ থেকে ৩ কানি জমিতে করলা আবাদ করেছেন, সেই সব চাষীদেও ভাগ্য বদলে গেছে।মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির আরো জানান, এবার বাম্পার ফলন হওয়ায় চরছটফটিয়া গ্রামের শত শত করলা চাষীর এবার তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। এবার পাইকারী বাজারে কেজিতে ২৫ থেকে ৩৪ টাকা দরে করলা বিক্রি হচ্ছে। আর বাজাওে খুচরা বিক্রি হচ্ছে-৪০ থেকে ৪৫ টাকা করে।

সব কিছুর খরচ মিলিয়ে এক কানি জমিতে করলা আবাদে চাষীদের ৩০-৩২ হাজার টাকা খরচা হচ্ছে। আর এক কানি জমিতে উৎপন্ন করলার বর্তমান বাজার মুল্যে কমপক্ষে এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে এক কানিতেই চাষীর হাতে মুনাফা থাকছে প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো।

যেভাবে করলার আবাদ করা হয়-

জেলার প্রত্যন্ত এ অঞ্চলের চাষীরা বালুকা জমিতে আলু ও করলার সমন্বয়ে দু’ফসলি আবাদ করে থাকেন। একই জমিতে দু’ফসলের আবাদে এবার চাষীরা দু’টোতেই বেশ লাভবান হয়েছেন।আলু চারা কিছুটা বড় হয়ে উঠার পর-পরই ঐ জমিতেই চাষীরা সারি সারি করলার চারা রোপন করে থাকেন। পাশাপাশি জমিতে আলু-করলা এক সঙ্গে বেড়ে উঠে।স্থানীয় চাষী- বশির খা জানান, আলু আগে আবাদ করায় আগেই তা উত্তোলন করা হয়। আলু উত্তোলনের শেষে করলার চারার যত্ন নিতে থাকেন চাষীরা।

এরপর করলার চারায় আসে ফুল। নিজের সন্তানের মতোই করলার চারার যত্নে মনোযোগ দেন চাষীরা মার্চ-এপ্রিলের পুরো দু’টি মাস। শুরু হয়েছে করলা তোলার ধুম পড়েছে বেতকা ও চরছটফটিয়া গ্রামের সর্বত্র এলাকার জমিতে।ঢাকা-বেতকা-তেঘরিয়া সড়কে জেলার টঙ্গীবাড়ি ও সিরাজদীখানের ক’টি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে- চাষীরা করলা নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এখন।

একদিকে জমি থেকে করলা তোলা, অন্যদিকে-উত্তোলনকৃত করলার বাজারজাতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই চাষীদের।বিশেষ করে চরছটফটিয়া গ্রামের প্রতিটি চাষীর ঘরেই করলা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তাদের। এ গ্রামের প্রায় শহ¯্রাধীক চাষী এবার করলার আবাদ করেছেন। আর বেতকা গ্রামে রয়েছে আরো ৫ শতাধিক চাষী।
জমজমাট করলার হাট-
এখানকার করলা চাষীদের তাদের উৎপাদিত করলার বাজারজাত করনের ভাবনায় দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় না- নিজ গ্রামেই গড়ে তুলেছেন করলার হাট।
নিজেদের উৎপাদিত করলার বাজার জমজমাট করে তুলতে জেলার সিরাজদীখান উপজেলার চরছটফটিয়া গ্রামেই গড়ে তোলা হয়েছে এ করলার হাট।ঢাকা-বেতকা-তেঘরিয়া সড়কের পাশে প্রতিদিনই বসছে এ করলার হাট।এখানে মালামাল বোঝাই ও যাতায়াতের রয়েছে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা।

সড়ক পথে ছাড়াও ইছামতি নদী হয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষাবক্ষে গমন খুবই অল্প সময়ের সম্ভব এখান থেকে।তাই ঢাকা-নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন সব্জি বাজারের পাইকাররা এখন হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন করলা কেনায়।

ইছামতি নদীর পাড়ে বালুকাময় জমিতে উৎপাদিত করলার কিনতে প্রতিদিন এ হাটে আসেন কম করে হলেও শতাধীক পাইকার। পাইকাররা এই করলা ক্রয় করে ট্রাক যোগে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজার সহ রাজধানি ঢাকাতে বেশ ভাল দামে বিক্রি করছে বলে পাইকাররা জানান।

করলা চাষী আবুল মিয়া জানান, এ হাটে প্রতিদিন বিকেলে পাইকারী করলা বিক্রি করে থাকেন তারা।নারায়নগঞ্জ ও ঢাকার বড় বড় সব্জি পাইকাররা এখানে গাড়ী নিয়ে এসে করলা কিনেন নেন। প্রতিদিন ভোর হতেই এ অঞ্চলের চাষীরা হাটে আসতে শুরু করেন।জমি থেকে করলা উত্তোলন করে আনা হয় হাটে। এরপর সারাদিন ধরে সারি সারি করলা সাজান তারা। তারপর পাইকারদের সাথে দর-দাম করে কিনে নিয়ে যান ।
করলা চাষ করে লাখপতি চাষীরা-

এবার ২-৪ কানি জমিতে করলা আবাদ করেছেন চরছটফটিয়া গ্রামের চাষী আলমগীর। তিনি জানান, মাত্র ৫০ হাজার খরচ হয়েছে তার করলা আবাদে।এখন সেই করলা তিনি বিক্রি করে পাবেন ২ লক্ষাধিক টাকার বেশী। তার মতোই চরছটফটিয়া গ্রামের চাষী মিয়া মো: মোল্লা, আবুল খা সহ আরো অনেকে করলা চাষ করে লাখপতি বনে যাচ্ছেন বলে আলমগীর দাবী করেন।এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় করলার চাষ ভালো হয়েছে।আরো কয়েক দিন আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে এ অঞ্চলের করলা চাষীদের সারা বছরের সংসার খরচের টাকা উঠে আসবে।

 

 

কিউএনবি/রেশমা/৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সকাল ৮:১০