১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:৫৬

পুরুষের স্বপ্নদোষ পাপ নয়, নারী রজঃস্বলা হলেই পাপ?

নিউজ ডেস্কঃ  প্রত্যেক ছেলের একবার হলেও PMS (Premenstrual Syndrome) হওয়া উচিত। ঋতুচক্র নামে যে চক্রটির মাধ্যমে অবলা লাজুক (!) নারীর দেহ থেকে প্রতি মাসে সবার ভাষ্য মতে,তথাকথিত ‘দূষিত রক্ত’ (?) বের হয়ে যায়, সেই চক্র শুরু হবার আগের কয়েকটা দিনে নারীর মতো পুরুষেরও মুড সুয়িং হোক। তাদেরও হঠাৎ করেই কান্না পাক, তাদেরও হঠাৎ করে চকোলেট আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে হোক। হঠাৎ করে তারাও ভীষণ কামে ঘামুক! (অবশ্য পুরুষের কাম সদা জাগ্রত তাই তাতে না ঘামাই বরং ভালো)।

হরমোনাল ইম্ব্যালেন্সের জন্য পিরিয়ডের আগের কটা দিন-রাত পা-হাত কামড়াক, কোমর ঝিমঝিম করুক, হঠাৎ করে পেটে চিনচিনে একটা ব্যথা শুরু হোক। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বসে থেকে কাজ করতে করতে অফিসের বসকে দেখে তারও ফাটাফাটি ঝগড়া করার ইচ্ছা হোক। আয়রন ম্যান হবার পরেও এ কটা দিন পুরুষেরা পেটের ব্যথায় কুঁজো হোক, ব্যথা নিয়ে রান্না করুক, ব্যথা নিয়ে বাচ্চা পালুক, ব্যথা নিয়ে প্রেম করুক, ব্যথা নিয়ে অনিচ্ছাতেও সঙ্গী আদর খাক, অথবা খিটখিটে মেজাজ নিয়ে সংসার সামলাক, অফিস সামলাক। এ কটা দিন পুরুষের মনে বিষন্নতা ভর করুক, মুখে টপাটপ ব্রন হোক, চুল পরুক এক চিরুনী। তাকে দেখে দূর থেকেই মনে হোক মন মেজাজের আজকে চৌদ্দটা! তারও প্রিয়জনের প্যাম্পারিং এর জন্য মন কেমন করুক!

সব বাজে বাজে হরমোনগুলো মৌমাছির মতো তাঁর মনে হুল ফুটিয়ে মনটাকে বেহেড করে দিক। সব অনুভূতির প্রকাশ , প্রহার একসাথে হোক। হোক হোক সব হোক। একজন নারীর পিএমএস এ যে পরিমাণ অস্বস্তি হয়, তার সবটা পুরুষ নামের বাঘেরা মুখোমুখি হোক। পিএমএসের শেষে রক্ত না দেখুক, তলপেটের তীব্র পেট ব্যথা যেন ছ’মাসে ন’মাসে পুরুষের হয়। পেট ব্যথায় বাঁকা হয়ে হাঁটতে গেলে যেন অন্য সহকর্মীদের রসালো হাসির মুখোমুখি যেন তারা একবার হলেও হোন। একবার হলেও যেন প্রায় অচেনা কোন মানুষের কাছে তার শুনতে হয়, “ কী????? হুউউউউউউ”। একবার হলেও যেন ফার্মেসি থেকে প্যাড কিনতে গেলে “হেভি ফ্লো” কিনবেন, না “রেগুলার সাইজ” বলতে গেলে দোকানী আর চারপাশের লোকের চাহনি দেখে তারাও ইতস্তত করেন।

হ্যাঁ, একটিবার হলেও এমনটা হোক। মাসের তিরিশ দিনের মাঝে তিরিশটা দিন যে একজন মেয়ের সমান যায় না এটা বোঝার জন্য প্রত্যেক পুরুষের জীবদ্দশায় এমন অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত।
“কী? মাসিক হইছে? শরীর খারাপ হইছে? এভাবে আছো যে!”
“হ্যাঁ, হইছে, তো? যার পেট থেকে বের হইছেন তারও হইছে, যে মহিলার সাথে ঘুমান কিম্বা ঘুমাবেন, তারও হবে, তো? এমন করার কী আছে?”

প্রিয় পুরুষকুল, মাসিক কী বলেন তো? আচ্ছা, আমিই বলি।

একজন নারী নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু বহন করেন, আপনাদের মতো কোটি কোটি শুক্রাণু তাদের উৎপন্ন হয় না। প্রতি মাসে একটি করে ডিম্বাণু নারীর ডিম্বাশয়ে পরিপক্ক হয়। ডিম্বাণুটি ফেলোপিয়ান টিউবের মাধ্যমে জরায়ুতে আসে, এখন ডিম্বাণুটি যদি নিষিক্ত হয় তবে তার নষ্ট হবার ভয় থাকে না। ডিম্বাণুটি অনিষিক্ত থাকলে তিন-চার দিনের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যায়, এসময় জরায়ুর ভেতরের সরস স্তর এন্ডমেট্রিয়াম ভেঙ্গে পড়ে। এই ভগ্ন ঝিল্লি সঙ্গের শ্লেষ্মা এবং এর রক্ত বাহক থেকে উৎপাদিত রক্তপাত সব মিশে তৈরি তরল এবং তার সংগে এর তঞ্চিত এবং অর্ধ তঞ্চিত মিশ্রণ কয়েক দিন ধরে যোনিপথে নির্গত হয়ে থাকে। এই ক্ষরণকেই রজঃস্রাব অথবা সোজাসাপ্টা ভাবে মাসিক বলা হয়। আপনারা এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন মাসিক কী! আর তার গুরুত্বটা কী?

এখন আবার নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবেন পিএমএস কী? কী এক পিএমএস নিয়ে আপনাদের শাপ শাপান্ত করলাম!
নারীর দেহে এই ঋতুচক্র শুরু হবার আগে থেকেই হরমোনাল ইম্বেল্যান্স শুরু হয়। কিছু হরমোন বাড়ে, কিছু হরমোন কমে। এসময় কেউ কেউ তীব্র বিষন্নতায় ভোগেন, মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ কারো বেড়ে যায়, অনেকে কাম অনুভব করেন, এছাড়া মেজাজ বিগড়ে যাওয়া, ঝগড়াটে হয়ে যাওয়া, হাত পা খিচ ধরে থাকা, পেটে ব্যথা, এসবও লক্ষ করা যায় তাদের মাঝে। অন্ততপক্ষে বিশ্বের শতকরা আশি ভাগ নারী এই প্রিমিন্সট্রুয়াল সিনড্রোমে ভোগেন।

এখন আপনারা আপনাদের তথাকথিত ঢাল সামনে নিয়ে বলতেই পারেন,“ যুগ যুগ ধরে মেয়েদের শরীরে এমন হচ্ছে, এখন কেন এটা নিয়ে এতো লাফালাফি?” লাফালাফি কারণ একজনের এতো শারীরিক অস্বস্তিতে আপনাদের অসভ্যতা আর টিটকারি আর সহ্য করা যাচ্ছে না, তাই !

“তোমার শরীর খারাপ নাকি? মাসিক হয়েছে নাকি? ”

হ্যাঁ, মাসিক হয়েছে। নিয়মিত মাসিক হয় তো? আমি একজন সুস্বাস্থের অধিকারিণী, আমার কেন রজঃচক্রে ছেদ পড়বে?

সেই বার-তের বছর থেকে প্রত্যেক মেয়ে ঋতুমতী হন। তারা মা হবার যোগ্যতা অর্জন করেন। ঋতুর দেখা না পেলে মাসে মাসে, প্রত্যেক নারী চিন্তায় পড়েন কেন হলো না, কোথায় কোন হরমোনের সমস্যা হলো! সেই ছোটবেলা থেকে এই ব্যথায় কষ্ট পেতে হয়, সাতদিনের ঝামেলা, তার মাঝে জামায় দাগ লাগলে তো কথাই নেই ! তার আগের কদিন পিএমএস! আর এসময়টাতে লোকে হা করে বসেই থাকে কথা শোনানোর জন্য, নোংরা আনন্দ পাবার জন্য। ভাবটা এমন যেন মাসিক হওয়া মানেই সেক্স!

আচ্ছা বলুন তো, আপনাদের তো নিয়মিত স্বপ্নদোষ হয়। পথে ঘাটে, সিনেমার পর্দায়, রাস্তায় কোন মেয়েকে ভালো লাগলে স্বপ্নে তো সেই মেয়েকে আপনারা দফারফা করে ফেলেন। সামান্য কামবর্ধক দৃশ্যে উত্তেজিত হয়ে, এমনকি কোন মেয়ের ছবি দেখে আপনারা তো প্রায়ই হস্তমৈথুন করেন। ছোড়া কী বুড়া! বুকে হাত দিয়ে বলুন, সে তালিকায় কে নেই?

আপনাদের এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কয়টা মেয়েকে দেখেন আপনাদের নিয়ে টিটকারি দিতে? কিংবা আপনাকে চকচকে চোখ নিয়ে জিজ্ঞেস করতে,“ কবার হয়েছে? কবার করলেন?” কেউ করে না, লজ্জায় হোক আর সে ভদ্রতাতেই হোক, সম্পর্ক সহজ না হলে কোন মেয়েই এমন প্রশ্ন করবেন না।

আর আপনারা? নারীর সাথে জুড়ে যাওয়া, তাঁর মাতৃত্বের সাথে জুড়ে যাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে তাঁকে হেনস্তা করতে থাকেন। সে নারী আপনার দু’দিনের পরিচিত না সদ্য পরিচিতা নাকি একান্তই নিজের, আপনাদের তাতে কিছু যায় আসে না! কিছু তো শেখেন ভাইছাবেরা! নরম্যাল হোন। নরম্যাল ব্যাপারগুলাকে নরমালি দেখতে শিখুন অন্তত।

স্বপ্নদোষ যেমন নরম্যাল , ঋতুস্রাবও তেমনই নরম্যাল! এবনরম্যালিটি হোল মেয়েদের এসব নিয়ে দু একটা খোঁচা মেরে কথা বলে হেনস্তা করা। আপনারা নরমাল হলে আমাদের ভাল্লাগবে। অস্বস্তিকর পরিবেশে আপনাদের মতো মানসিকভাবে চরম অসুস্থ লোক নিয়ে আর কত থাকবো আমরা?

ঠিক যেমনি নির্দিষ্ট বয়সের পর আপনিও স্বপ্নদোষে দুষ্ট হোন, ঠিক তেমনি নির্দিষ্ট বয়সের পর নারী মাত্রই রজঃস্বলা হয়!

প্রিয় অবুঝ পুরুষ, নারীকে বুঝতে শিখুন, ভালো থাকুন ।