২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ভোর ৫:৩৫

২শ বছরের পুরনো বাজার পদ্মাগর্ভে বিলীন, রক্ষা পায়নি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠিান

 

খোরশেদ আলম বাবুল,শরীয়তপুর প্রতিনিধি : নড়িয়ায় অব্যাহত পদ্মার ভাঙ্গনে গত এক সপ্তাহে ২শ বছরের পুরনো মূলফৎগঞ্জ বাজারের ৩শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে পুরনো এ বাজারের আরো ৭ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।যে কোন মুহুর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে নড়িয়া উপজলার এক মাত্র ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বাজার সংলগ্ন লস্কর বাড়ী জামে মসসিদ।

কোন কাজেই আসেনি সরকারের অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে তীরে ফালানো জিও ব্যাগ।প্রতিদিনই বিলাশবহুল বাড়ীঘরসহ শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ায় পদ্মার পাড়ে চলছে কান্না রোল ও আহাজারী।রাক্ষুসী পদ্মার হিং¯্র থাবায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে হাজার হাজার পরিবারে জীবন সংসার।এক সময়ের জমিদার ও সমাজের প্রভাশালীরা এসে দাড়িয়েছে ভুমিহীনদের কাতারে।

অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, আমাদের আর কিছুই রইলো না।উত্তসূরীদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না।জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী এ বছর নড়িয়া উপজেলার প্রায় ৪ হাজার ৫শত পরিবার বাড়ী ঘর ও ফসলী জমি হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে গেছে। ভাঙ্গন কবলিতরা একটু মাথা গোজার ঠাই খুজতে ছুটে বেড়াচ্ছে।

পদ্মার তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের চোখে কোন ঘুম নেই। সহায়-সম্বল ঘর-বাড়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রক্ষার্থে প্রাণপন চেষ্টা করেও রক্ষা করতে পারছে না। চোখের পলকেই সবকিছু পদ্মায় বিলিন হচ্ছে।এখনও যাদের বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙ্গেনি কিন্ত নিকটে এসে পদ্মা নদী উকি দিচ্ছে সেকল লোকদের দাবী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা হলে এখনো নড়িয়া পদ্মা নদীর নিকটবর্তী এলাকা, বাজার, ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ মাদ্রাসা কমপ্লেক্স রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

প্রতক্ষদর্শী ও ভাঙ্গন কবলিত এলাকাবসী জানান, এ বছর বর্ষা মৌসুমের থেকে রাক্ষুসি পদ্মা ভাংতে ভাংতে দক্ষিনে এক কিলো মিটার চলে এসেছে।গত ৭দিন ধরে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মুলফৎগঞ্জ বাজারের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।একেকটি ভবন ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ সময় শত শত লোকজন শুধু আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থরা জানায়, সর্বহারা মানুষগুলো দিন রাত করে একটু মাথা গুজার ঠাই খুজছে। সরকারের পক্ষথেকে তেমন কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না তার।তারা বর্ষার আগেই চেয়েছিল সরকারী কোন সাহায্য নয় পদ্মার দক্ষিন তীরে নড়িয়া উপজেলা শহর এবং পুরনো এ মূলফৎগঞ্জ বাজারটি রক্ষায় স্থায়ী বেরিবাঁধ। এ ভয়াবহ ভাঙ্গন রোধে সরকার পদ্মা নদীর দক্ষিন (ডান) তীর রক্ষা বাধ প্রকল্প গ্রহন করে।এরপর গত ২ জানুয়ারী তীর রক্ষা বাধ নির্মানের জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করে।বর্ষার আগে এ সব এলাকার হাজার হাজার মানুষ স্থাীয় বেরিবাধের দাবীতে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দাবী জানিয়ে আসছিল। কিন্তু অজানা কারনে বাঁধ নির্মান কাজ শুরু করা হয়নি।

তারা আরও জানায়, বর্ষার শুরু থেকে অব্যাহত ভাঙ্গন শুরু হলে ৫কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।কিন্ত প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় ভাঙ্গন রোধের কোন কাজেই আসেনি সরকারে এ অতিরিক্ত বরাদ্দ।রক্ষা করা যায়নি ঐতিহ্যবাহি এ বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিলাশবহুল বহুতল ভবনসহ হাজার হাজার পরিবারের ঘরবাড়ী।এ এলাকার অনেক বিত্তবান লোকজন সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের মাথা গোজার ঠাই পর্যন্ত নাই।

বর্তমানে মারাত্বক ভাঙ্গন ঝুকিতে রয়েছে মুলফৎগঞ্জ বাজারের আরো ৭শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নড়িয়া বাজার ও মূলফৎগঞ্জ মাদ্রাসা কমপ্লেক্স বাজারের পূর্ব পাশ্বের লস্কর বাড়ী জামে মসজিদসহ আশপাশের আরো অনেক স্থাপনা।ইতো মধ্যে হাসপাতালের মালামাল সরিয়ে অন্যত্র নেয়া হয়েছে এবং হাসপাতালের রোগীদের পাশের একটি ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তপক্ষ।শরীয়তপুর পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুতের খুটি সরিয়ে নেয়ায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে বাজার, হাসপাতালসহ আশ পাশের এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ।

এলাকাবাসীর দাবী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা হলে এখনো নড়িয়া বাজার, মূলফৎগঞ্জ মাদ্রাসা কমপ্লেক্সসহ অনেক সরকারী বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় অচিরেই হারিয়ে যাবে আরো বহু স্থাপনা।এর আগে নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ মক্তবসহ নড়িয়ার ওয়াপদা বাজার, বাশতলা বাজার, চর জুজিরা, সাধুর বাজার, পৌর এলাকার শুভগ্রাম, পাচঁগাও মূলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৪ হাজার বেশী পরিবারের ঘর বাড়ী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, গত ২ মাসে পদ্মার ভাঙ্গনে প্রায় ৪ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কোন জনপ্রতিনিধি সহ সরকারী কর্মকর্তারা কোন রকম সাহায্য সহযোগীতা করেনি।এলাকায় মহা দূযোর্গ চলছে।আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না।আমরা এখন ভুমিহীনদের কাতারে চলে এসেছি। এতে আমাদের দুঃখ নেই। এখনো যদি সরকার দ্রুতগতিতে পদ্মার দক্ষিন তীর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে তাহলে আরো হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘরবাড়ী রক্ষা করা সম্ভব হতো।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পদ্মা গর্ভে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অতি কাছে চলে আসায় হাসপতালের মালামাল জেলা প্রশাসক মহোদয় এবং সিভিল সার্জনের নির্দেশ ক্রমে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রোগিদের জন্য হাসপাতাল ভবনের দক্ষিন পার্শ্বের আবাসিক দু’টি ভববনে ভর্তি কার্যক্রম এবং জররুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। খুব শিঘ্রই ৩শ ৫০জন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে ২ বান্ডেল করে টিন ও নগদ ৬ হাজার করে টাকা বিতরণ করা হবে।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/বিকাল ৫:১২