২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:০৯

গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সটির নাজুক অবস্থা

 

শেখ মোহাম্মদ রতন, মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ৫০ শয্যার স্বাস্থকমপ্লেক্সটি গত এক যুগ ধরে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে।

অপারেশন থিয়েটার থাকলেও তা চালু করা যায়নি।হাসপাতালটিতে শুধু রক্ত ও প্রসরাব পরীক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোন শারিরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই এখানে। পাওয়া যাচ্ছেনা প্রয়োজনীয় ওষুধ।ভবনটিও জরাজির্ন হয়ে পড়েছে।ফলে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগিরা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগিদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে এ হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে শুরু হয়।পরে গত ১৯৮২ সালে উদ্বোধনের মাধ্যেমে বর্তমান ভবনটিতে সেবা কার্যক্রম শুরু করে। সে সময় হাসপাতালটি ৩১ শয্যা বিশিষ্ট ছিলো। ২০০৭-৮ অর্থ বছরে এটি ৫০ শয্যায় উন্নিত করা হয়। প্রতিদিন হাসপাতালে বর্হিবিভাগে গড়ে সাড়ে ৪শ থেকে সাড়ে ৫শ রোগি সেবা নিতে আসেন।

হাসপাতালে ৫০ শয্যার জন্য কমপক্ষে ৩১ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সেখানে কাগজে কলমে আছে মাত্র ২১ জন।এর মধ্যে ১০ জন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেষণে আছেন।বর্তমানে ১১ জন চিকিৎসক হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।এছাড়াও হাসপাতালের জৈষ্ঠ স্ফাফ নার্স, হিসাব রক্ষক, পরিসংখ্যানবিদ, এন্টি ল্যাব, রেডিও গ্রাফি প্রতিটি পদই শূন্য। ঝাড়–দার ৫টির মধ্যে ৪ টি পদই শুন্য।

সরেজমিনে হাসপাতালের ডাক্তারদের কক্ষ ঘুরে দেখা যায় প্রতিটা কক্ষেই রোগিদের ভীর। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে লাইনে দাড়িয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন তারা। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় ওষুদ ও ডাক্তার দেখাতে না পেরে আক্ষেপ নিয়ে চলে যাচ্ছেন।

এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১৫-২০ জন রোগির সাথে কথা হলে তারা জানায়, এখানে নাক,কান,গলা,চোখের কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। তাই ভালো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা তারা।তাই অনেক সময় বাহিরের ডাক্তারের উপরই ভরসা করতে হচ্ছে।ডাক্তার স্বল্পতার কারণে লাইনে থেকেও ভালো করে ডাক্তার দেখানো যাচ্ছেনা।দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডাক্তারের কক্ষে যেতে পারলেও এক সাথে ৩-৪ জন রোগিকে ২ মিনিটের মধ্যেই কোনরকম দেখে ওষুদ লিখে দিচ্ছেন।

যে সব ওষুদ লিখছেন, তাও হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছেনা। সব ওষুধ বাহির থেকে বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়ে কিনে নিতে হচ্ছে।হাসপাতালে প্যাথলজিষ্ট বিভাগে শুধু রক্ত ও প্র¯্রাব পরীক্ষা করা যায়।অন্য সব পরীক্ষাগুলো বাহিরের ক্লিনিক ও ডায়গোনেষ্টি সেন্টারে করতে বাধ্য হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সজল জানান, হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার সম্পুর্ন বন্ধ রয়েছে। এখানে গাইনী ডাক্তার নেই।তাই সার্জারি ও সিজারিয়ানের মত রোগিদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।এর সুযোগ নিয়ে কমপক্ষে ১০টি প্রাইভেট ক্লিনিক গড়ে উঠেছে।রোগিরা বাধ্য হয়ে ওই ক্লিনিক গুলোতে যায়। ওই সব নিন্মমানের ক্লিনিক গুলোতে অদক্ষ ডাক্তারদেরন ভুল চিকিৎসায় প্রসুতি মা ও বাচ্চার মৃত্যুসহ বড় দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। হাসপাতালের মহিলা,পুরুষ ও শিশু ওয়ার্ড তিনটিই দুইতলা ভবনে। ভবনের সিড়ি বেয়ে উঠতেই দেখা যায়, ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে শেওলা পড়েছে।পলেস্তরাও খসে পড়েছে।সিড়ির উপরে ছাদ চুয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে।

শিশু ওয়ার্ডে কথা হয় ফারজানা বেগম নামে এক রুগীর সাথে তিনি জানান, ৫ দিন ধরে আমার ১০ মাসের বাচ্চাটা পাতলা পায়খানা করছে। ৪ দিন আগে তাকে এ হাসপাতালের ডাক্তার দেখাই।ভালো না হওয়ায় গত রোববার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করি।এর পর একবার ডাক্তার এসে দেখেছিল।ওষুধও লিখে দিয়েছেন।কিন্তু সব গুলোই বাহির থেকে কিনতে হয়েছে। এমনকি খাবার স্যালাইনটিও।

লিপি বেগম নামে একজন বলেন, আমার ছোট বোনকে ৪ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করেছি।মহিলা ওয়ার্ডে যায়গা না থাকায় শিশু ওয়ার্ডে রেখেছি। তিনি জানান, হাসপাতলে শুধু আছি এতটুকুই সেবা পাচ্ছি। হাসপাতালের সৌচাগার গুলো ব্যবহার করা যায়না।মলমুত্রে ভরে আছে। রাতে কক্ষের বাতিও ঠিক মত জ¦লেনা।মো. নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তি বলেন, আমার মায়ের পায়ে ও ঘাড়ে প্রচন্ড ব্যাথা।চারদিন আগে হাসপাতালে ভর্তিকরি।আর্থপেডিক্স ডাক্তার না থাকায় মাকে দেখাতে পারছিনা।

হাসপাতালটির মেডিকেল অফিসার খন্দকার আর্শাদ কবির বলেন, আমাদের হাসপাতালের অবস্থা তেমন ভালো না।হাসপাতালের সুরক্ষা প্রাচীর ভাঙা। হাসপাতালের ছাদ চুয়ে পানি পড়ে।সৌচাগার নেই বললেই চলে। যে দু-একটা আছে তা ব্যবহার অনুপোযোগি।বর্হিবিভাগের রোগীরা সৌচাগার না থাকায় আমার কক্ষের পিছনে ও হাসপাতালের আনাচে-কানাচে মল মুত্র ত্যাগ করছেন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, আমাদের এ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার চালু করার মত যথেষ্ট যন্ত্রপাতি নেই।ডাক্তার ও লোকবলের সমস্যা আছে। হাসপাতালটিও জরাজির্ন হয়ে পড়েছে। এ সমস্ত বিষয় গুলো স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এ হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এড.মৃণালকান্তি দাসকে জানাননো হয়েছে।ওনি সকল সমস্যা নিয়ে স্বাস্থ মন্ত্রণালয়ে জানাবেন এবং সমাধান করার ব্যপারে আশ্বাস দিয়েছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এড.মৃণালকান্তি দাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপের সাথে জানান, হাসপাতালের অবস্থা খুবই খারাপ।আমি সরেজমিনে গিয়ে নিজে এসব অবস্থা দেখেছি।হাসপাতালের ডাক্তারা এখান থেকে বেতন নিচ্ছেন।মন্ত্রী,এমপিদের সুপারিশ নিয়ে রাজধানীর ভালো ভালো হাসপাতালে গিয়ে প্রেষণে কাজ করছেন।অনেকে ছুটিতে থাকছেন। অপারেশন থিয়েটার, স্বাস্থ পরীক্ষাসহ যাবতীয় যত সমস্যা আছে তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট্য মন্ত্রণালয়, জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির বৈঠকে বহুবার এনেছি কিন্তু কেউ বিষয়টার গুরুত্ব দিচ্ছেনা।এ সময় তিনি সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানানো হবে।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/বিকাল ৩:৫১