২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৩৫

২৩০০ ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যু ১০

 

ডেস্ক নিউজ : ভাদ্রের ভাপসা গরমের এই সময় বেড়ে গেছে জ্বর ও সর্দি-কাশির প্রকোপ। ঋতু পরিবর্তনজনিত জ্বরকে আগে সাধারণ মৌসুমি জ্বর হিসেবে হালকাভাবে নিলেও এখন সেই উপায় নেই; সাধারণ জ্বরের আড়ালে মানুষকে কাবু করে দিচ্ছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া আর টাইফয়েড। চিকিৎসকরা বলছেন ডেঙ্গুর পাশাপাশি তাঁরা পাচ্ছেন চিকুনগুনিয়া ও টাইফয়েডের রোগীও। ছোটদের মাঝেও এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে আছে ডায়রিয়ার প্রকোপ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৩০০ জনের বেশি। আর মারা গেছে ১০ জন। গত বছর পুরো ডেঙ্গু মৌসুমে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৭৫৯ জন। আর মৃত্যু হয়েছিল আটজনের। এখনো সামনে আরো প্রায় দুই মাস ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়েছে। আইইডিসিআর এবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে একাধিক বৈঠক করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতার চেষ্টা করে। গত ২৯ জুলাই আইইডিসিআর ঢাকা শহরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর পরামর্শমূলক কর্মশালার আয়োজন করে। তাদের অনেক পরামর্শের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হচ্ছে—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ না নেওয়া এবং কারোর অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রুহুল আমীন কালের কণ্ঠকে বলেন, এবার শিশুদের মধ্যেও অনেক ডেঙ্গু পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াও আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে টাইফয়েডও আছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর যেহেতু ব্যাপক হারে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ গেছে তাই এবার আর ওই রোগের প্রকোপ বেশি না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ চিকুনগুনিয়া কারো একবার হলে দ্বিতীয়বার হয় না বললেই চলে। কিন্তু ডেঙ্গুর চার ধরনের ভাইরাস থেকে হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে একবার কারো এক ধরনের ডেঙ্গু হলে পরে ওই ধরনের ডেঙ্গু আর না হলেও অন্য আরেক ধরনের ডেঙ্গু হতে পারে। এককথায় একজনের চারবার ডেঙ্গু হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়। ফলে আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকলে সে এবারও হতে পারে। ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া হয় এডিস মশার কামড়ে আর টাইফয়েড যেকোনো সময় যে কারো হতে পারে পানি ও খাদ্যদূষণের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর সঙ্গেও টাইফয়েড হতে পারে। তাই জ্বর হলেই আর হেলাফেলার সুযোগ নেই, চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া ভালো।

সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সব শেষ তথ্যানুসারে এ বছর আগস্ট মাসের ২৯ দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩২৭ জন, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কিছুটা কম। গত বছর আগস্টে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৫১ জন।

২৯ জুলাইয়ের সভায় আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, জ্বর হলে চিকিৎসক অথবা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পানি ও পানীয় খাবার খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো প্রকার ওষুধ সেবন না করা, বিশেষ করে ব্যথানাশক জাতীয় ওষুধ না নেওয়া, ডেঙ্গুজ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থার হঠাৎ অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই হঠাৎ অবস্থার অবনতি হলে অতি দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়া, যারা দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে তাদের ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বা হেমোরেজিক ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা থাকায় অতি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত কোনো রোগীর রক্তক্ষরণ (যেমন : দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত বের হওয়া, ত্বকের নিচে ফুসকুড়ির মতো দেখা দেওয়া, বমির সঙ্গে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদি) দেখা দিলে জরুরি হাসপাতালে নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি টাঙানো ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারকরণ জরুরি।

গত মাসেই প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৭টিই এডিস মশার বিস্তার বিচারে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, জরিপে ঢাকা উত্তরের ২৫ এবং দক্ষিণের ৪২টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারের নমুনা ও লক্ষণ পাওয়া যায়। দুই অংশেই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকাসহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এলাকা এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ, পরিত্যক্ত পরিবহন, টায়ার, প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি, ফুলের টব, স্যাঁতসেঁতে মেঝে এডিস মশার বংশ বিস্তার বেশি দেখা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভিলেন্স অ্যান্ড সোস্যাল মেডিসিনের (নিপসম) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি বেশি খারাপ থাকে। আর ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত জ্বর। অন্যান্য অনেক ভাইরাল রোগের মতো সরাসরি এরও কোনো প্রতিষেধক নেই, টিকাও নেই। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে এর মোকাবেলা করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীতে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগের প্রদুর্ভাব প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশার বিস্তারে গত বছর তিনটি (মৌসুম-পূর্ব, মৌসুম, মৌসুম-পরবর্তী) এবং চলতি বছরে একটি (মৌসুম-পূর্ব) জরিপ চালানো হয়েছে।  বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিষয়ে ডাক্তার-নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া চিকিৎসায় জাতীয় নির্দেশনাসমূহ হালনাগাদ করা হয়েছে, সিটি করপোরেশন থেকে লার্ভিসাইড ও এডালটিসাইড ছিটানো হচ্ছে।

ডায়রিয়া : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যকেন্দ্র সূত্র জানায়, এ বছর এ পর্যন্ত দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৭ জন। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট এক দিনেই আক্রান্ত হয় এক হাজার ৪৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুই বেশি।

সুত্র : কালের কণ্ঠ

কিউএনবি/রেশমা/৩১শে আগস্ট,২০১৮ ইং/দুপুর ১২:০৫