১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:১৩

কুয়েতে দেশীয় পণ্য সম্প্রসারণে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এক বাংলাদেশির গল্প

 

ডেস্ক নিউজ : মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম তেল সমৃদ্ধ ধনী দেশ কুয়েত। দেশটির দক্ষিণে সৌদি আরব ও উত্তরে ইরাকবেষ্টিত শেখ শাসিত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজধানীর নাম মাদিনাত আল-কুয়েত বা কুয়েত সিটি। প্রায় ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে বিশ্বের সব দেশের প্রবাসী রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় সকল পণ্য অন্য দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। মিসর, সিরিয়া, ভারতীয়, ফিলিপাইন, পাকিস্তানিসহ বাংলাদেশের প্রবাসীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে প্রায় তিন লাখের উপরে প্রবাসী বাংলাদেশি কুয়েতে আছেন। 

স্বাদের দিকে বাংলাদেশ, ভারত প্রায় সমান হওয়ায় ভারতীয় পণ্য যেমন অন্য দেশিদের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা পছন্দ করেন তেমনি বাংলাদেশি পণ্যগুলো ভারতীয়দের কাছেও বেশ পছন্দের। কুয়েতের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশি পণ্য কুয়েতের বাজারে সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিজ ব্যবসা ও দেশের পণ্যের বাজারজাত করণে।

একই সঙ্গে এসব পণ্য কুয়েতের মত একটি উম্মুক্ত বাজারে সুনামের সহিত টিকে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিছু বাংলাদেশি। তথ্য নিয়ে জানতে পারি এই ব্যবসায়ীরা অনেকে কোন না কোন কোম্পানি বা কুয়েতির মালিকানায় ভিসা নিয়ে কর্মী হিসেবে কুয়েত আসেন। নিজ মেধা, সততা আর কঠোর পরিশ্রমে তারা আজ প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্রান্ডের পণ্য কুয়েতের বাজারে এনে এখন নিজেরাই এক একজন ব্রান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে চলেছেন। তারা অন্য লাখো প্রবাসীর মতো নয়, তাদের অগ্রগতি অন্য সাধারণ প্রবাসীদের জন্য এগিয়ে যাওয়ার পথ পদর্শক হিসেবে কাজ করবে। মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (৩৮) তেমনই একজন।

বন্ধু মহলে মুফতি (বাংলাদেশে কাওমি মাদ্রসা থেকে ইসলামী আইনের উপরে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলে তাকে মুফতি উপাধি দেয়া হয়) উপাদিতে সম্মান করেই ডাকে সবাই।  পিতা মুহাম্মদ সুলতান আলী পেশায় একজন কৃষক, দেশের বাড়ি বরিশালের পিরোজপুর জেলার কাউখালী থানার বেকুটিয়া গ্রামে। মাদ্রসা দারুল উলোম মিরপুর থেকে দাওরাই হাদিস (মাস্টার্স সমমান) শেষ করে ইসলামী আইনের উপর সর্বোচ্চ ডিগ্রী (মুফতি) শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন দেশে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ২০০৫ সালে কুয়েতে আসেন।

এক কুয়েতি মালিকের অধীনে দুই বছর চালক হিসেবে কাজ করেন। ইচ্ছা থাকলে ঠেকায় কে। ওই দুই বছর চালক হিসেবে কাজ করার সুবাধে বিভিন্ন স্থানের পরিচিতি ও মার্কেটের অবস্থান সম্পর্কে ভালই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেখান থেকে বের হয়ে একটি কোম্পনিতে সেল্সম্যান এর চাকরি নেন। মার্কেটিং সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতা থাকায় নিয়োগ পান বাংলাদেশি একটি কোম্পানির কুয়েত ম্যানেজার হিসেবে। দীর্ঘ সাত বছর একটানা সেখানে কাজ করে বাংলাদেশি পণ্য কুয়েতের বাজারে সম্প্রসারণে বেশ এগিয়ে যান। পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কুয়েত এর বাজার ও চাহিদা সম্পর্কে। পূর্ব থেকেই  ব্যবসা করার চিন্তা ছিলো মাথায়। অভিজ্ঞতা আর পুঁজি না থাকায় শুরুতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে। প্রায় ৯/১০ বছর চাকরি করে এক দিকে জমিয়েছেন পুঁজি অন্য দিকে অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা-এই নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা।

প্রথমেই বাংলাদেশি একটি ফুড কুয়েতে এনে বাজারজাত শুরু করেন। আস্তে আস্তে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। একে এক বাংলাদেশ থেকে আনতে থাকেন বিভিন্ন পণ্য। শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নেই, এখন ২০১৫ সাল থেকে তার কোম্পানি আল মাহাসিল এর নিজস্ব মাহাসিল ব্রান্ডে বিভিন্ন স্পাইসি মসল্লা যেমন হলুদ, ধনিয়া, তেজপাতা, মুড়ি, সরিষার তৈল ও কারী পাওডারসহ বেশ কিছু আইটেম এখন কুয়েত ও ইরাকে বেশ চলছে বলে জানান এই তরুণ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।

সরেজমিনে ব্যবসায়ী শহিদুলের ফরওয়ানিয়াস্থ বিশাল গোডাউন ঘুরে দেখা যায়, এক বিশাল বিল্ডিং এর নিচে ৯৫০০ স্কয়ার ফিট পুরোটা জুড়েই তার স্টোর, যেখানে বিভিন্ন পণ্যে পরিপূর্ণ। একদিকে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাংলাদেশি পণ্য বিদেশের বাজারে সম্প্রসারণে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই বলা যায়। অনেক সমস্যার কথাও বলেছেন তিনি। বাংলাদেশকে বিশ্বের বাজারে তাল মিলিয়ে চলতে আরো সহনশীল ও উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে একটি পণ্য কুয়েতে আসতে প্রায় তিন মাস সময় লেগে যায়, যা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এক থেকে দেড় মাসেই চলে আসে। 

তিনি জানান, কুয়েতে ব্যবসা উম্মুক্ত, যে যেই ব্যবসা করতে চান সরকারের নিয়ম অনুযায়ী করতে পারেন। এখানে কোন সিন্ডিকেট চক্র না থাকায় সব সময় বাজারে প্রতিযোগিতা লেগে থাকে। প্রতিনিয়ত কোন না কোন মার্কেটে প্রমোশন চলতেই থাকে। বাংলাদেশি পণ্যের মান নিয়ে বলতে গেলে তিনি জানান, বাংলাদেশি পণ্যের মান অনেক ভালো। তবে উন্নত প্যাকিং এর কারণে পূর্বে বাজার ধরতে অনেক হিমশিম খেতে হয়েছে। তারাও (বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা) এখন বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্ভন করছেন।

তাঁর এখানে বাংলাদেশিসহ ইন্ডিয়া ও মিসরের লোকজন কাজ করেন। তিনি বংলাদেশি কর্মীদের প্রতি বেশি প্রশংসিত, কারণ হিসেবে বলেন, বাংলাদেশের পণ্য একমাত্র বাংলাদেশিরাই মর্যাদা বেশি দেবেন। তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে কিছু অভিজ্ঞ বিক্রয়কর্মী আনার ব্যাপারে । ভিসা (বিশেষ অনুমতি) জটিলতা এখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত তাঁর পণ্যগুলি কুয়েতের বাজারে অনেকটা পরিচিত থাকলেও মুফতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামকে অনেকই চেনেন না। নীরবে নিভৃতে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি, নিজের অতীতের কথা মনে করেন, গরিব দুঃখী মানুষের সেবা করার আশা ব্যক্ত করেন। সততা, নিষ্ঠা আর কঠোর পরিশ্রম করলে আল্লাহ অবশ্যই ভাগ্য পরিবর্তন করবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/২৯শে আগস্ট, ২০১৮ ইং/বিকাল ৪:৪৫