২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১২:২৭

‘কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন ভুয়া-মিথ্যা-গায়েবি’

 

ডেস্কনিউজঃ গত মার্চে নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ালাইন্সের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নেপালের প্রভাবশালী দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনকে ভুয়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অপারেশন কনসালট্যান্ট সালাউদ্দিন এম রহমতউল্লাহ।

ওই তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ থেকে যোগ হওয়া প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপ অব বাংলাদেশের (এএআইজি-বিডি) প্রধান ক্যাপ্টেন এম রহমতউল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ওরা কী করে এই প্রতিবেদন দিলো, সেটাই আমি চ্যালেঞ্জ করেছি ওদের। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও গায়েবি একটি রিপোর্ট। এর কোনো ভিত্তি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট তো আমরা তৈরি করছি। এটার এখনও প্রসেসিং বাকি। মাঝখান থেকে কাঠমান্ডু পোস্ট এই প্রতিবেদন কোথায় পেল? তাদের এই প্রতিবেদন মিথ্যা ও ভুয়া। এই তদন্তের সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। তদন্ত এখনও চলছে। তারা নিজেদের মনগড়া কথা লিখে প্রতিবেদন দিয়েছে। এর সঙ্গে তদন্ত কমিশনের কোনো সর্ম্পক নেই।’

তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা এই সদস্য বলেন, ‘আমি জানার সঙ্গে সঙ্গে নেপালের তদন্ত কমিশনকে ফোন করেছি, তাদেরকে চার্জ করেছি। ওরা নিজেরাও অত্যন্ত সন্ত্রস্ত। ওরা জানিয়েছে, আমরাই ওই পত্রিকাকে ধরছি, কেন তারা আমাদের ম্যাটেরিয়াল ছাড়া গায়েবি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।’ নেপালের তদন্ত কমিশনকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনের রিজয়েন্ডার (প্রতিবাদ) দিতেও বলেছেন বলে জানান সালাউদ্দিন এম রহমতউল্লাহ।

গত ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ। এ দুর্ঘটনায় নেপাল ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলেও কমিটির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজ একটি প্রতিবেদন ছেপেছে নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট।

তাতে বলা হয়, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে মিথ্যা বলেছিলেন। ওই পাইলট মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী এক ঘণ্টার যাত্রাপথে তিনি ককপিটের ভেতর ক্রমাগত ধূমপান করেছিলেন বলেও কাঠমান্ডু পোস্টের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

পত্রিকাটি জানিয়েছে, তদন্ত শেষে নেপালি কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজের ভেতর আবিদ সুলতান অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। সে কারণেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লাল পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও বলছে, কাঠমান্ডু পোস্টের এ প্রতিবেদন ভিত্তিহীন, মনগড়া। কারণ, তদন্ত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত নিয়ে এখনও কিছু বলেনি।

ইউএস-বাংলা বলছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী (আইকাও কর্তৃক প্রণোদিত) যেকোনো দুর্ঘটনা পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত অসমর্থিত মতামত প্রকাশ কোনো গণমাধ্যমের কাছেই কাম্য নয়। আইকাও-এর অ্যানেক্স ১৩ অনুসরণ করে নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বিমান চলাচল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এই দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলাকালে এমন একটি প্রতিবেদন দু’টি কারণে প্রকাশ করা হয়ে থাকতে পারে— অযাচিতভাবে এয়ারলাইন্স ও ক্রুদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণকে আড়াল করার চেষ্টা করা।’

এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত কোনো তথ্যের ভিত্তি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনা নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি এখনও তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি। আমাদের সঙ্গেও কথা বলেনি। তাহলে এই রিপোর্ট তারা কোথায় পেলেন এবং এতকিছু কী করে জানলেন?’

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনকে দূরভিসন্ধিমূলক অভিহিত করে তিনি বলেন, ককপিটে সিসি ক্যামেরা নেই। তাহলে ধূমপানের কথা তারা কোথা থেকে পেলেন? বিমানের ভেতরে ধোঁয়া হলে ফায়ার অ্যালার্ম বাজবে। ফলে তাদের এ ধরনের তথ্য কাল্পনিক।

ইউএস-বাংলার ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান দক্ষ বৈমানিক ছিলেন উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “দুর্ঘটনার আগে ওই বিমানবন্দরেই শতাধিকবার অবতরণের অভিজ্ঞতা ছিল ক্যাপ্টেন আবিদের। তাকে ‘মাস্টার অব ল্যান্ডিং’ বলে অভিহিত করেছিলেন তারই প্রশিক্ষণ ক্লাসের শিক্ষার্থী সৌরভ আল জাহিদ। তার হাতে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার সংবাদে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি।’

এর আগেও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান ছিলেন তাদের একজন ‘ব্রাইট’ অফিসার। তার সাড়ে ৫ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট সামলানোর অভিজ্ঞতা ছিল। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে ড্যাশ-৮-কিউ উড়োজাহাজ নিয়ে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে তিনি পড়েছিলেন, ওই একই মডেলের উড়োজাহাজেও তার ১৭শ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করার অভিজ্ঞতাও ছিল।

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ড্যাশ-৮ কিউ 8০০ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে চার জন ক্রু ও ৬৭ যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে চার ক্রুসহ ২৭ জন বাংলাদেশি, ২৩ জন নেপালি ও একজন চীনা যাত্রী নিহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি, ১০ জন নেপালি ও একজন মালদ্বীপের নাগরিক।

 

কিউএনবি/বিপুল/২৭শে আগস্ট, ২০১৮ ইং/সন্ধ্যা ৭:৪৮