১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:১৮

চামড়া ঋণের ৯০ শতাংশই খেলাপি

 

ডেস্ক সিউজ : চামড়া খাতে ঋণ দেয়ার নামে সরকারি ব্যাংকগুলোতে হরিলুট চলছে। প্রতি বছর এ খাতে যেভাবে ঋণ দেয়া হয়, সে হারে আদায় হয় না। ঋণের বড় অংশই চলে যায় অন্য খাতে। ফলে বেশির ভাগ ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সময় পর অবলোপন বা ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে বাদ দিচ্ছে।

এভাবে ব্যাংকে রাখা আমানতকারীদের টাকা চলে যাচ্ছে অসাধু গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর পকেটে। ব্যাংকের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সহায়তায় এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চামড়া খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং বিধিবিধান ভঙ্গ করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে তেমন কোনো জামানত নেই। খেলাপি গ্রাহকদের কারখানার বেশির ভাগই বন্ধ। কিছু প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা করেও ঋণ আদায় করতে পারছে না।

কেননা ঋণের বিপরীতে যথেষ্ট জামানত নেই। গত জুন মাস পর্যন্ত সরকারি ব্যাংকগুলো চামড়া খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি প্রায় ৮ হাজার ১শ’ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই খেলাপি। নিয়মিত আছে ৯শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা রয়েছে বিশেষ হিসাবে।

এগুলো যে কোনো সময় খেলাপি হয়ে যেতে পারে। আদায়ে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি ঋণের মধ্যে ১ হাজার ২শ’ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কোনো হদিস নেই।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, খাতটি সামনের দিকে এগিয়ে নিতেই সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু কিছু উদ্যোক্তার অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে ঋণ দিয়েও সুফল মিলছে না। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতে। যে কারণে অনেক ব্যাংক এখন এ খাতে ঋণ দিতে চায় না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এ শিল্পের জন্য নেতিবাচক হওয়ায় উদ্যোক্তারা ভালো নেই। যেসব পণ্য তৈরি হচ্ছে সেগুলো বিক্রি করা যাচ্ছে না। আবার রফতানি হলেও ক্রেতারা বিক্রি করতে না পারায় তারা টাকা দিচ্ছেন না। ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাংকে খেলাপি হচ্ছেন। ব্যাংকগুলোও চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিচ্ছে না। তাই এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে। এতে অনেকে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সাভারে চামড়া শিল্পনগরী পরিপূর্ণ না করে কারখানা হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের কারণে অনেকেই লোকসানে পড়েছেন। এ শিল্পের জন্য এটাও প্রতিকূল বার্তা নিয়ে এসেছে। চামড়া খাতের ঋণ তসরুপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ব্যাংকের দায়িত্ব। ব্যাংক ঋণ দেয়ার সময় সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করলে এমনটি হতো না।

সূত্র জানায়, চামড়া ঋণে জালিয়াতির ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটছে। নতুন করে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালে। ওই সময়ে জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট লেদারকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে ঋণ দেয়া হয় ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। রফতানি বিল বিক্রি করার নামে নিয়েছে ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাতে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এই ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি। ঋণ আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই গ্র“পের কারণেই এ খাতে ঋণ বিতরণ ও খেলাপির পরিমাণ বেড়ে গেছে।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের মালিক এমএ কাদের বলেন, ঋণের টাকা তিনি কারখানাতে বিনিয়োগ করেছেন। রফতানির টাকা দেশে আসতে শুরু করেছে। চুক্তি অনুযায়ী টাকা ফেরত দেয়া হবে। বেঙ্গল লেদারের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ৪০ কোটি টাকা। পুরোটাই খেলাপি। ওই টাকায় গ্রাহক অন্য ব্যবসা করছেন। ব্যাংক ওই ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে পুরোটাই অবলোপন করেছে।

এ ছাড়া ইউসুফ লেদার ২৩ কোটি, গ্রিন অ্যারো লেদার ১০ কোটি, সমতা লেদার ১০ কোটি, নিশাদ ট্যানারি ৫ কোটি, মোনানী লেদার ৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বও নেই ব্যাংকের খাতায়। এসব প্রতিষ্ঠানের ৫২ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংক।

রূপালী ব্যাংক থেকে পূবালী ট্যানারি ৩৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন উধাও। ব্যাংক টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ওই ঋণ অবলোপন করেছে। এছাড়া এমবি ট্যানারি ১৪ কোটি, হোসেন ব্রাদার্স ১৩ কোটি, মাইজদী ট্যানারি ১২ কোটি টাকা, এনাম ট্যানারি ৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অন্য ব্যবসা করছে। এসব ট্যানারির কার্যক্রম এখন বন্ধ। ঋণ ফেরত না দেয়ায় এখন খেলাপি হয়ে আছে। ব্যাংক গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা করা ছাড়া ঋণ আদায়ে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তারা প্রায় ২শ’ কোটি টাকা অবলোপন করেছে। একটি সরকারি ব্যাংক থেকে দেশমা শু ইন্ডাস্ট্রিজ ২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন খেলাপি। ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। একই ব্যাংক থেকে রিভার সাইট লেদার কোম্পানি ঋণ নিয়ে এখন খেলাপি। তাদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৪০০ কোটি টাকার বেশি। কারখানাটিও বন্ধ।

এসএনজেট ফুটওয়্যার ১৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন খেলাপি। তাদের কারখানার কোনো অস্তিত্ব নেই। মোহাম্মদিয়া লেদারেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৪ কোটি টাকা। ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংক এই গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিনটি ব্যাংক থেকে ২২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে মিলন ট্যানারি। যদিও এই গ্রাহকের অন্য ব্যবসায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোও ইতিমধ্যে ঋণের টাকা অবলোপন করেছে।

আশ্চর্যের বিষয় হল ঋণ নিয়ে গ্রাহক চামড়া খাতে খারাপ করলেও ব্যবসায় ভালো করেছেন। এর কারণ অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট (বিআইবিএম) একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চামড়া খাতের ঋণের বড় অংশই অন্য খাতে স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে। এ খাতে ঋণ নিয়ে অনেকেই অন্য ব্যবসা করছেন। যে কারণে এ খাতে খেলাপি ঋণের মাত্রা বেশি। এসব ঋণ আর কখনই আদায় হয় না।

এত অনিয়ম সত্ত্বেও চামড়া খাতে প্রতি বছর নতুন ঋণ দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কাঁচা চামড়া কিনতে ঋণ দেয়া হচ্ছে। এ ঋণের সবটাই যাচ্ছে ট্যানারি মালিকদের পকেটে। তাদের হাত থেকে খুব সামান্যই যাচ্ছে কাঁচা চামড়ায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দর বাড়লেও দেশের বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বছরই কমছে। এতে চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এদিকে চামড়া কেনার জন্য কোরবানির ঈদের সময় ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তার বড় অংশই বছর শেষে ফেরত আসছে না। গ্রাহকরা ঋণের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শোধ করলেই নতুন ঋণ পাচ্ছে। ফলে আগের বছরের ঋণ কখনই শোধ হয় না। ঋণের সীমা বাড়িয়ে গ্রাহকদের নতুন ঋণ দেয়া হচ্ছে।

রূপালী ব্যাংক ২০১৬ সালে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১৬০ কোটি ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে এইচ অ্যান্ড এইচ লেদার ১৫ কোটি টাকা নিয়ে ৫ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকি ১৫৫ কোটি টাকা অনাদায়ী। একটি সরকারি ব্যাংক গত চার বছরে ৬১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে পেয়েছে ৬০ কোটি টাকা। বাকি টাকা ফেরত পায়নি। একই বছরে আরও একটি সরকারি ব্যাংক ২০১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫০ লাখ টাকা।

 

 

কিউএনবি/অায়শা/২৭শে আগস্ট, ২০১৮ ইং/দুপুর ১২:৩০