২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:২২

রোহিঙ্গাদের ঈদ আনন্দ, দুঃসহ স্মৃতির তর্পণ

 

ডেস্কনিউজঃ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার এক বছর পূর্ণ হলো। গত বছরেরও এই সময়টি ছিল কোরবানি ঈদের মৌসুম। তখন তাদের সময় কেটেছে প্রাণভয়ে আতঙ্কে আর সীমাহীন দুঃখে-কষ্টে। গত বছরের ২৫ আগস্ট এই দিনে তারা প্রাণ বাঁচাতে নিজ ভূমি ত্যাগ করে চলে এসেছিল বাংলাদেশে। সে সময় ঈদের মৌসুমে তাদের থাকতে হয়েছিল বন-জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে আর ধানখেত ও নদীতে। এর মাঝে কেটে গেছে একটি বছর।

এবারের কোরবানির ঈদে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা, তাদের মুখে ছিল আনন্দের হাসি। পাশাপাশি স্বজন হারানো পরিবারগুলোর মাঝে বিরাজ করছিল শোকের মাতম। তবে ছোটদের ঈদ কেটেছে খেলাধুলায়, আনন্দ-উল্লাসে। উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত ৩০ ক্যাম্পের প্রায় ৮ লাখ নতুন, পুরোনো সোয়া তিন লাখ রোহিঙ্গা মিলে ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭ রোহিঙ্গা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছে।

নিজ দেশ মিয়ানমারে বহুমুখী নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে রোহিঙ্গারা বুধবার শরণার্থী শিবিরের ১২৬৫ মসজিদ ও ৫৬০টি মক্তবে ঈদের নামাজ আদায়ের পর চোখের জলে হারানো স্বজনদের স্মরণ করেছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঈদের নামাজ আদায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমাম ও মুসল্লিরা। মোনাজাতে অংশ নেওয়া লাখো রোহিঙ্গা মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদ প্রত্যাবাসন কামনা করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান।

গত বছর এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপরে দেশটির সেনাবাহিনী বর্বর নির্যাতন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা নিজেদের আবাসস্থল ছেড়ে পালাতে থাকেন। এভাবে পালাতে গিয়ে অনেকে হারিয়েছেন বাবা-মা ও কাছের স্বজনদের। অনেক নারী হয়েছেন ধর্ষণের শিকার। সর্বস্ব হারানো এসব রোহিঙ্গার ঠাঁই হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সাড়ে ৫ হাজার একর বনভূমিতে।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই ঈদের নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাত করেছেন যেন তারা নিরাপদে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরতে পারেন। শংকটাপন্ন মুহূর্তে বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের জন্যও দোয়া করেছেন তারা।

কুতুপালং মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রফিক উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে বাংলাদেশের জনগণ। তাই মোনাজাতে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে এবং বাংলাদেশের জন্যও দোয়া করেছি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘আরাকানে আমরা স্বজনদের হারিয়েছি। পুরো ১ বছর হতে চলেছে বাংলাদেশে আশ্রিত জীবনের। কিন্তু এখনো আমরা নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আশার আলো দেখছি না।’ লম্বাশিয়া ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা নারী রকিমা খাতুন বলেন, আজকের ঈদুল আজহায় ফেলে আসা গত এক বছরের স্মৃতি তাদের শোকবিহ্বল কওে তুলেছে।

পাশের আরেক ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি রহমত উল্লাহ বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদের নামাজ আদায় করতে পারিনি। আজকের এই দিনে আমরা ছিলাম রাখাইনের একটি পাহাড়ি জঙ্গলে। এবার বাংলাদেশে অন্তত ভালো করে ঈদের নামাজটি আদায় করতে পেরেছি।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিত হাজেরা বেগমের ঈদও কেটেছে স্বজন হাজানোর যন্ত্রণায়। অনিরাপদ মাতৃভূমি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে সাগরে নৌকা ডুবিতে এক পুত্র সন্তান মারা যায়। আজ ঈদের দিন গর্ভের সন্তানের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে।

বয়োবৃদ্ধরা মনোকষ্ট নিয়ে থাকলেও ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য গত ঈদুল ফিতরের মতো আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়। নাগরদোলা, রকমারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বৈশাখি মেলার আদলে আয়োজন করে স্থানীয় কিছু মানুষ। নতুন জামা পড়ে সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আনন্দে মেতেছিল শিশু-কিশোররা।

এ প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক আশ্রয় দিয়েছেন। শুরু থেকে সরকার এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রিত এসব রোহিঙ্গার সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে। গত ঈদের মতো এবারও কোরবানির ঈদে ৩ হাজার গরু ৬০০ ছাগল এবং এনজিওদের ১০ হাজার প্যাকেটজাত মাংস, রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব রোহিঙ্গার কোরবানির মাংস দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নিরাপদ প্রত্যাবাসনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরতে ইচ্ছুক। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, কক্সবাজারের ৩০টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত ১ হাজার ২০টি মসজিদ ও ৫৪০টি নূরানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও টেকনাফের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচটি, অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৪৫টি মসজিদ ও ২০টি নূরানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব মসজিদ ও নূরানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঈদের জামাত আদায় করেছেন শরণার্থী রোহিঙ্গারা।

সর্বশেষ এ প্রসঙ্গে জানার জন্য রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালামের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নতুন করে আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে আসে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল আরো সোয়া তিন লাখ রোহিঙ্গা। যুগের পর যুগ বংশ পরম্পরায় তারা রাখাইনে বাস করলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করেনি।

 

কিউএনবি/বিপুল/২৫শে আগস্ট, ২০১৮ ইং/দুপুর ১২:৫৩