ব্রেকিং নিউজ
২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৫১

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্প

নিউজ ডেস্কঃ  অসুস্থ থাকায় বিছানা থেকে ওঠার শক্তি পাচ্ছিলেন না পপি রানী দাস। স্বামীর কাছে একগ্লাস পানি চেয়েছিলেন তিনি। বুঝতে পারেননি, এই এক গ্লাস পানির জন্যে কতখানি মূল্য দিতে হবে তাকে, কতখানি ভুগতে হবে! একটা গ্লাস পপির হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন তার স্বামী, পপি জানতেন না, জল ভেবে যে গ্লাসে তিনি চুমুক দিতে চলেছেন, সেটা ভর্তি ছিল অ্যাসিডে! এরপরে পপি আর কিছু মনে করতে পারে না; তার শুধু মনে আছে, গলা বেয়ে পাকস্থলী পর্যন্ত যেন আগুনের একটা ধারা নেমে গিয়েছিল মূহুর্তের মধ্যে!

ঘটনাটা ২০০৯ সালের, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পপি রানী দাস শিকার হয়েছিলেন এই নির্মম নির্যাতনের। যৌতুকের দাবীতে পাষণ্ড স্বামী এই হাল করেছিলেন তার। গলা, খাদ্যনালী আর পাকস্থলী পুড়ে গিয়েছিল পপির। প্রায় দশটা মাস কথাই বলতে পারতেন না তিনি, খেতে পারতেন না ঠিকমতো। পাইপ দিয়ে তরল খাবার খাওয়ানো হতো তাকে, অ্যাসিড সারভাইভার্স হাসপাতালে ভর্তি পপিকে শক্ত খাবার খাওয়ানো হতো মেশিনে গুঁড়ো করে। কিশোরগিঞ্জে তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগও ছিল না যে খাবার গুড়ো করার মেশিন চালাবেন। আর তাই ঐ হাসপাতালেই থেকে যেতে হয়েছিল পপিকে। আর সাত বছর ধরে তিনি কাটিয়েছেন অমানবিক কষ্টের কিছু সময়।

বাংলাদেশের ডাক্তারেরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পপি আর কখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবেন না বলেই জানিয়ে দিয়েছিলেন তারা। কিন্ত পপি নিজে আশা ছাড়েননি। রোজ তিনি কল্পনা করতেন, ঈশ্বর নিশ্চয়ই কোন দেবদূতকে পাঠাবেন তার যন্ত্রণা লাঘব করার জন্যে! সেই দেবদূত হয়ে এলেন টনি জং নামের এক কানাডিয়ান চিকিৎসক। তিনি ছিলেন প্লাস্টিক সার্জন। এই ভদ্রলোক বাংলাদেশে এসেছিলেন আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা দিতে। কাকতালীয়ভাবেই পপি রানীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার, তিনি উৎসুক হলেন পপির ব্যাপারে জানতে। শুনে টনি ঝং সিদ্ধান্ত নেন একে যে করেই হোক সাহায্য করতে হবে। সবকিছু শুনে তিনি রানীকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাকে কানাডায় নিয়ে এসে চিকিৎসা করানোর সবটুকু চেষ্টাই তিনি করবেন।

শুনতে যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে কাজটা এমন সহজ কিছু ছিল না। প্রথমত, টাকা সংগ্রহ করাটা ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। টনি জং নামলেন সেই কাজে। অন্টারিওর মেডিকেল সিস্টেম এই চিকিৎসার খরচ বহন করবে না। তাছাড়া বিমান ভাড়া, টরন্টোতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্যও অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু টনি ঝং খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, দেশের বাইরের কোন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে কানাডায় এনে চিকিৎসা কারানোর জন্য কোন সরকারী বা বেসরকারী ফান্ডের ব্যবস্থা নেই।

তবে টনি জং হাল ছাড়েননি। বেশ কয়েক জায়গা থেকে ব্যর্থ হবার পরে নিজেই একটি উদ্যোগ নিলেন ফান্ড সংগ্রহের জন্য এবং এর নাম দিলেন পপি ফান্ড। তিনি কয়েটি সম্ভাব্য জায়গায় আবেদন করে পপির গল্পটা বললেন। এতে ভালই কাজ হলো। প্রথম অবস্থায় তিনটি পরিবার সাড়া দিলো টিনি জঙের আবেদনে, তারা রাজী হলো পপির পাশে দাঁড়াতে। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই ৭ লাখ ডলারের ফান্ড যোগার হয়ে গেল। এর পাশাপাশি কয়েকজন চিকিৎসককেও টনি রাজী করিয়ে ফেললেন বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করার জন্য। কিংবা পপির এই হৃদয়বিদারক গল্পটা শুনে কেউ কেউ নিজেরাই বলেছেন তারা চিকিৎসার জন্যে কোন অর্থ নেবেন না। পুরো এক বছর লেগে গেল এই ফান্ড রাইজিঙের কাজে।

পপি রানী কানাডায় গিয়েছিলেন ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী। সেখানে টরেন্টো জেনারেল হাসপাতালে শুরু হয় তার চিকিৎসা। এই সময় তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন টরন্টো প্রবাসী মানব-হিতৈষী কয়েকজন বাংলাদেশীও। টরন্টোতে বাংলাদেশ মাইনরিটি রাইটস এ্যালায়েন্স নামের একটি সংগঠনও এগিয়ে এসেছিল পপি রানীকে সহায়তা করার জন্য। দীর্ঘ দশ মাস ধরে এখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন পপি, সার্জারীর পরেও অনেকগুলো মাস ধরে ডাক্তারেরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাকে। পপির অপারেশনের জন্যে টরেন্টো জেনারেল হাসপাতাল তাদের অপারেশন থিয়েটার অফ টাইমের জন্যেও ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল, কারণ জটিল এই সার্জারীতে প্রচুর সময় লেগেছিল। সার্জারীর সঙ্গে জড়িত থাকা ডাক্তার বা সহকারীদের কেউ একটা পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি, এটা ছিল তাদের পক্ষ থেকে পপির জন্যে উপহার।

ধীরে ধীরে সেরে উঠলেন পপি। কানাডায় পা রাখার প্রায় দশমাস পরে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি, স্বাভাবিক ভাবেই খাবার খেতে পারলেন। টনি জং তো পপির বন্ধু ছিলেনই, রালফ গিলবার্ট নামের আরেক চিকিৎসকের সঙ্গেও ভীষণ খাতির হয়ে গিয়েছিল পপির। গিলবার্টকে পপি ডাকতেন ‘ম্যাজিক ডক্টর’ বলে। ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে পপিকে বিদায় জানালো টরেন্টো জেনারেল হাসপাতাল, দেশের উদ্দেশ্যে বিমানে চড়লেন তিনি। তবে এরমধ্যে কানাডাকেও নিজের আরেকটা ঘর বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন তিনি, এই দেশের কিছু মহৎপ্রাণ মানুষ এগিয়ে না এলে তো তার নতুন জীবন পাওয়া হতো না কোনদিন!

দেশে ফিরে পপি এখন অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের নিয়ে কাজ করতে চান। যে ভয়াবহ সময় তিনি পার করে এসেছেন, সেটা তাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। তিনি জানেন, এই সময়ে একজন নারী কতখানি অসহায় থাকেন। সবার ভাগ্য পপি রানীর মতো হয় না, সবার জন্যে স্রষ্টা টনি জঙের মতো দেবদূত পাঠান না। তাই পপি চান, এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে, নিজের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে। কানাডিয়ান চিকিৎসক টনি জং পপির এই ইচ্ছের কথা শুনে এই কাজের জন্যে ফান্ড গঠন করে দেয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন।

পপির বেঁচে থাকার কথা ছিল না। যৌতুকলোভী অত্যাচারী স্বামী তাকে চিরতরে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। পপির ভাগ্যটা খুব ভালো, তিনি প্রাণে মারা যাননি। সেই পপি বিভীষিকাময় অতীত কাটিয়ে উঠে এখন সুস্থভাবে চলাফেরা করছেন, অন্যান্য অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আর সেটা সম্ভব হয়েছে দূরদেশের কিছু মহৎপ্রাণ মানুষের কল্যাণে!

কিউএনবি/নিল/ ১৯ আগস্ট, ২০১৮ ইং/২০ঃ০০