১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:২৪

গত মাসের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুন!রামগঞ্জে বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল নিয়ে বিড়ম্বনায় ৭০হাজার গ্রাহক

 

মু. ওয়াছিউদ্দিন, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : সমেষপুর গ্রামের আবদুল মন্নান পেশায় একজন কৃষক, স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে ৬ সদস্যের সংসারকে টেনে নিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার কথা চিন্তা করে ২ বছর পূর্বে ঘরে একটি বিদ্যুতের মিটার নিয়ে ৩টি লাইট ও ১টি ফ্যান ব্যাবহার করে আসছে। শুরু থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত ১শত থেকে ২শত টাকার মধ্যে বিদ্যুৎ বিল আসতো। হঠাৎ জুলাই মাসে ১হাজার ৩ শত ৯২ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। এতে সে হতভম্ভ হয়ে পড়ে। ছুটে যায় বিদ্যুৎ অফিসে, অফিসের বিল প্রস্তুতকারী রিংকু ঘোষকে অতিরিক্ত বিল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে ধমক দিয়ে বলে এখন থেকে এভাবে বিল আসবে, ভালো লাগলে ব্যবহার করেন, না হলে বিদ্যুৎ ব্যবহার ছেড়ে দেন।

এভাবে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ৭৫ হাজার আবাসিক ও বানিজ্যিক গ্রাহক জুলাই মাসের অতিরিক্ত বিল পেয়ে চমকে উঠেছেন। কারন প্রতিটি গ্রাহকের বিল পূর্বের বিলের তুলনায় তিন গুন থেকে দশ গুন বেশী। এ অতিরিক্ত বিল থেকে বাসাবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, মন্দির কেউ বাদ পড়েনি। অফিসে গিয়ে অসহযোগিতার কারনে বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছে তারা। গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন, কোথাও গিয়ে তারা এই অস্বাভাবিক বিলের কোন যৌক্তিকতা জানতে পারছেন না। অফিসের লোকজন ও বাহিরের কিছু দালাল প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আশা শত শত গ্রাহকদেরকে বলে দিচ্ছে, এখন থেকে এভাবে বিল আসবে, সময়মত বিল পরিশোধ না করলে লাইন কেটে দেওয়া হবে। তাই এর কোন সদুত্তর বা প্রতিকার না পেয়ে নিরুপায় হয়ে অনেক গ্রাহক ধার্যকৃত বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে।

সরেজমিনে পল্লী বিদ্যুৎ রামগঞ্জ জোনাল অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অতিরিক্ত বিল নিয়ে শত শত ভুক্তভোগীদের দিনভর বিভিন্ন টেবিলে ছোটাছুটি করেও কোনো সমাধান হচ্ছে না। এ সময় অফিসে আসা পূর্ব ভাদুর গ্রামের গৃহিনী মরিয়ম সুলতানা ১৫০ টাকার স্থলে ৬৫০ টাকা , রামগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী কাজী ইব্রাহিম ৬ হাজার টাকার স্থলে ১৯ হাজার ২০ টাকা, সমেষপুর গ্রামের দিনমজুর বাবুল মিয়া ১৮০ টাকার স্থলে ৭২০ টাকা , নন্দনপুর গ্রামের জাকির হোসেন ৩২০ টাকার স্থলে ১৫শত ৫০ টাকা, কাঞ্চনপুর গ্রামের শাহ আলম ১৭০ টাকার স্থলে ১৯৭৬ টাকা অতিরিক্ত বিল আসার কথা জানান ও বিলের কাগজ দেখান।

এ ছাড়াও মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাকির হোসেন, মাহবুব আলম, কামাল হোসেন, হারুন রশিদ, ফারুক হোসেন, মোঃ বাচ্ছু মিয়া, আনোয়ার হোসেন, সুলাইমান, আবু তাহের, আজাদ পাটোয়ারী, মন্তাজ মিয়া, মোতালেব, ব্যবসায়ী মাসুদ, মুন্সিসহ শত শত লোক জুলাই মাসে তাদের অতিরিক্ত ৩ থেকে ১০ গুন বেশী বিল হওয়ার কথা লিখে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানান। রামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের বিল সুপারভাইজার জান্নাতুল আরা, বিল প্রস্তুতকারী খায়রুন আক্তারসহ অনেকে জানান, আজ এক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন শত শত গ্রাহক অতিরিক্ত বিলের বিষয় জানতে আসছেন, এত লোকদেরকে আমরা বুঝাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। তাই দুই একজনের সাথে রাগ করে কথা বলা হয়ে যেতে পারে। একজন লোকের ২শত টাকার স্থলে ৪/ ৫শত টাকা হলেও চলতো কিন্তু ১৪/ ১৫শত হলে নিজের বিবেকে ও বাধা পায়, তাই কি করবো, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি।

কেন এমন হচ্ছে বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের কারন মিটার রিডিংয়ে কারচুপি। মিটার রিডাররা প্রতি মাসে সব গ্রাহকদের মিটারের রিডিং সরেজমিনে না নিয়ে অনুমাননির্ভর বিল করেন। ফলে কোনো কোনো মাসে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বিল কিছু কম হতে পারে। এতে কয়েক মাসের ব্যবহার থেকে কিছু কিছু জমা হয়ে বাড়তি বিল আসতে পারে।যদি এভাবে ইউনিট জমিয়ে রেখে এক মাসে এসে হিসাব সমন্বয় করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবহারকারীর গ্রাহকশ্রেনী পরিবর্তন হয়ে আবাসিক গ্রাহক বাণিজ্যিক গ্রাহকে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এতে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

গ্রাহক বাচ্ছু মিয়া, আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীসহ অনেকে জানান, ভুয়া ও অতিরিক্ত বিল করে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। অফিসে গেলে বলে, পরে ঠিক করে দেয়া হবে। অমুক সাহেব ফিল্ডে, আপনি অপেক্ষা করুন, কম্পিউটার ম্যান নাই ইত্যাদি নানা অজুহাত দেখিয়ে গ্রাকদের হয়রানি করা হচ্ছে। আবার কিছু দালাল আছে তারা মিটারে সমস্যা আছে বলে কিছু কিছু গ্রাহকদের মাধ্যমে মিটার পরিবর্তনের আবেদন করিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। অফিসে গিয়ে সেবার পরিবর্তে স্বীকার হতে হয় প্রতারনার।রামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম ইসমত কামাল জানান, গত মাসে রামগঞ্জে গ্রিড চালু হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিলোনা। গ্রাহক বিদ্যুৎ বেশী ব্যবহার করেছে , রমজান মাসের ব্যবহারের ইউনিট গুলি যোগ হয়েছে, তাই এ মাসে বিদ্যুৎ বিল বেশী আসছে। আগামী মাস থেকে এ সমস্যা থাকবে না। আমি মাইকিং করে গ্রাহকদের বুঝিয়ে দিব।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৯ই আগস্ট, ২০১৮ ইং/বিকাল ৪:৫৫