১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:১১

এ বছরের জুন মাসে চালু হবার কথা থাকলেও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি ৬ বছরেও চালু হয়নি

 

শেখ মোহাম্মদ রতন, ষ্টাফ রিপোর্টার : এ বছরের জুন মাসে চালু হবার কথা থাকলেও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ নতুন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি ৬ বছরেও চালু হয়নি। এখনো অন্ধকার গহ্বরেই পরে রয়েছে।বর্তমান মুন্সীগঞ্জ তিন আসনের সংসদ সদস্য এড.মৃনাল কান্তি দাস ও বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানও জানিয়েছিল এ বছরের জুন মাসেই মুন্সীগঞ্জের নব নির্মিত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ নতুন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি এখন চালু করা হবে।তবে এখন নিজেরাই জানেনা কবে নির্মান কাজ শেষ হবে জেলা বাসীর প্রত্যাশিত সেবামুলক প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ নতুন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি।

৬ বছর পেরিয়ে গেলেও মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মানের পরও চিকিৎসা সেবার জন্য চালু হয়নি। বর্তমানে এ হাসপাতালটি ১শ’ শয্যাই রয়ে গেছে। দির্ঘ্য বছর হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও তা এখনো চলছে ৫০ শয্যার লোকবল দিয়ে।

এদিকে পুরাতন ভবনে বেডের কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।বাধ্য হয়ে অনেকেই মেঝেতে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।কবে নাগাদ নতুন হাসপাতালটি চালু করা হবে, স্পষ্টভাবে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা কতৃপক্ষরাও।তবে জানা গেছে, এই কাজটা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রজেক্টের আওতায়।জাইকার অর্থায়নে ভবনের কাজ করা হচ্ছে।

এখন ফান্ডে টাকা না থাকায় কাজগুলো সম্পূর্ণ করা যাচ্ছেনা।গুরুত্ত্বপূর্ন ডাক্তার ছাড়াও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধ-পত্র।তবে গত ৬ বছর যাবত ২৫০ শয্যার হাসপাতালটির নতুন ভবন চালু হবে বলে আশার বানি দিয়ে যাচ্ছে কতৃপক্ষরা।খুব শীঘ্রই নাকি ভবন নির্মান কাজ সমাপ্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মুন্সীগঞ্জ শহরের মানিকপুর এলাকায় মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের পুরাতন ভবন ঘেঁষে নতুন হাসপাতালের পাঁচ তলা ভবনটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।ভবনটির চার পাশ দেয়াল ঘেরা।প্রতিটি তলার কক্ষের দরজা-জানালার কাজ শেষ হয়েছে। তবে কোন কক্ষে বাতি ও পাখা লাগানো হয়নি।

লিফটের জায়গাও ফাঁকা।প্রতিটি তলা ও কক্ষে ধুলাবালির আস্তরন জমে আছে।ভবনটির দ্বিতীয় তলায় থাকেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুইজন তত্বাবধায়ক। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুরানী এন্টার প্রাইজ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে ২ কোটি ৭৭ লক্ষ ৮৬ হাজার ৩শ’ ৩৩ টাকা ব্যয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্বাবধায়ক জানান, এখনও ভবনে পানি, গ্যাস, ইলেকট্রিক ও লিফটের কাজ করা হয়নি।এগুলো আমাদের কাজ নয়।আড়াই বছর আগে কাজ শেষ হলেও গণপূর্ত অধিদফতর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হাসপাতালটি বুঝে নেননি।

স্থানীয় লোকজন বলেন, গত এক বছর ধরেই শুনছি নতুন হাসপাতাল সামনের মাসে চালু করা হবে।তাদের দাবি অবিলম্বে নতুন হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালু করতে হবে। কবে এই নতুন হাসপাতাল থেকে মানুষ চিকিৎসা সেবা পাবে তা কেউ জানে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও সু-স্পষ্ট করে কিছু বলছে না।এদিকে প্রায় ১৫ লাখ জন সংখ্যার এই জেলার ১শ’ শয্যার মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি রোগীদের ঠিক মত সেবা দিতে পারছে না।২০০৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যা থেকে ১শ’ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এ হাসপাতালটি ১শ’ শয্যার হলেও তা এখনো চলছে ৫০ শয্যার লোকবল দিয়ে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন এখানে গড়ে আট থেকে নয়শ’ জন রোগী সেবা নিতে আসেন।মাত্র ২০-২২ জন ডাক্তার দিয়ে চালানো হচ্ছে হাসপাতালটি।দিন যত যাচ্ছে রোগীর চাপও এখানে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বলে জানান তারা।ভর্তি রোগীদের শয্যার চেয়ে হাসপাতালের বারান্দা ও কক্ষের মেঝেতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেশি থাকতে দেখা গেছে।

চিকিৎসক দেখিয়েছেন এমন কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২-৩ ঘন্টা লাইনে থেকে চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকতে পারলেও ভালো চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এক মিনিটে এক সাথে দেখা হচ্ছে চার-পাঁচজন রোগী। এরপর দায়সারা ভাবে দেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থাপত্র। হাসপাতাল থেকে তেমন কোন ঔষধও দেওয়া হচ্ছে না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।

হাসপাতালে পর্যাপ্ত সিলিং ফ্যান নেই। যেগুলো আছে সেগুলোও ঠিকমত চলছে না। হাসপাতালের শৌচাগার সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপোযোগি। ভিতরে পানির ব্যবস্থা নেই।রোগীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ময়লা স্তুপ আকারে জমা হয়ে আছে।হাসপাতালের তিনটি এ্যাম্বুলেন্সের একটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে।দুটি সচল থাকলেও কিছু দিন পরপর মেরামত করতে হচ্ছে।

হাসপালে চিকিৎসা নিতে আসা একজন রোগী বলেন, ‘আমার মেয়েকে অসুস্থ্য অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি থাকতে বলে।হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় মহিলা ওয়ার্ডে অনেক রোগী। আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে আগে যেখানে কয়েকটা বেড ছিল এখন তাও নেই।ভিতরের পরিবেশটাও খুব খারাপ। তাই বাধ্য হয়ে বারান্দার মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, অনেকে ভর্তি হওয়া সত্বেও জায়গা না থাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল ভবন মেরামত না করায় এটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।হাসপাতালের এমন দূরাবস্থায় আমাদের মত রোগীদের কথা চিন্তা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন ভবনটি চালু করা উচিৎ।

মুন্সীগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুরাতন হাসপাতালে মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনেছি।নতুন ভবনটির কাজ আরো আগে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ কেন এখনো শেষ করা যায়নি এ ব্যাপারটি নিয়ে খুব শীঘ্রই গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হয়েছে। ভবনের কাজ শেষ না হলে জনবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি কোনটার ব্যবস্থাই করা যাবে না।’

তবে নতুন হাসপাতালটি কবে থেকে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবে এ বিষয়টি জানতে চাইলে এ বছরের জুন মাসে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ নতুন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালটি চালু হবে বলে আশা করছি বলে জানিয়ে ছিলেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

মুন্সীগঞ্জ তিন আসনের সংসদ সদস্য এড.মৃনাল কান্তি দাস বলেন, ‘নতুন হাসপাতাল কবে চালু হবে, কি ভাবে হবে আমার এ ব্যাপারে কিছু জানা নেই। আমাদের (পুরোনো) হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল ছাড়া কোন রকমে চলছে।নতুন ভবন চালু করতে হলে, নতুন জনবল নিয়োগ দিতে হবে।’

তবে সকল হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল ও নতুন জনবল নিয়োগ দিয়ে এ বছরের জুন মাসে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ হাসপাতালটি চালু করার কথা ছিল।কিন্তু কেন নতুন ভবন চালু করতে ও চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এনে নতুন ভবনটি কেন চালু করা হচ্ছে না তা দ্রুত মন্ত্রনালয়ের কাছে জানতে চইবো।

 

 

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৩০শে জুলাই, ২০১৮ ইং/বিকাল ৫:৩৪