১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:৩৩

মায়ের কবরের পাশে শুধুই আহাজারি শিশু রায়ানের

“তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো। বেশি রাত জাগলে সকালে সময়মতো স্কুলে যেতে পারবা না—এ কথা বলেই রাত ১১টার পর মামণি তাঁর রুমে ঘুমাতে যান। আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই প্রতিদিন সকালে মামণি নিজের স্কুলে চলে যান। গত বুধবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সকালে উঠে দেখি খাবার টেবিলে নাশতা রেডি। আমি খেয়ে চলে যাওয়ার সময় মামণির রুমের বাইরে তালাবদ্ধ দেখে আঁতকে উঠি। বাবাকে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তোমার মাসহ আমি বেরিয়ে গেছি—আমি এখনই আসছি। তুমি স্কুলে যাও।’ বাবার এই কথা বিশ্বাস করে স্কুলে গিয়ে ফিরে এসে দেখি মূল দরজা খোলা থাকলেও মামণির রুম তালাবদ্ধ। বাবার ফোন বন্ধ। আর খোঁজ করেও বাবার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর তালা ভেঙে রুমে পড়ে থাকতে দেখা যায় মামণির নিথর দেহ।”

গতকাল শুক্রবার এভাবেই বর্ণনা দেয় একমাত্র ছেলে ইফতেখার রায়ান (১৪)। সে ঢাকার রামপুরা আইডিয়াল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। মা-বাবার সঙ্গে সে রাজধানীর রামপুরা বনশ্রীর ডি ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৭ নম্বর বাড়িতে থাকত। গত বুধবার তার বেকার বাবা স্কুলশিক্ষিকা মাকে হত্যা করে পালিয়েছে। নিহত শিক্ষিকার নাম জুলেখা খাতুন রত্না (৪২)। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলের বেতাগৈর ইউনিয়নের বেতাগৈর গ্রামে লাশ দাফন করা হয়।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মায়ের কবরের পাশে বসে আহাজারি করছে একমাত্র ছেলে ইফতেখার রায়ান। দুই মামা শওকত আলী আকবর ও ছায়েতুল্লাহ তাকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো ধরনের সান্ত্বনাই তার কান্না থামাতে পারছে না।ইফতেখার রায়ান কাঁদছে আর বলছে, ‘মামণি, তুমি আমাকে ঘুমাতে বলে কোথায় গেলা? আমাকেও নিয়ে যাও। আমি তোমার কাছে যাব।’ এ সময় সে চিৎকার দিয়ে বলে, ‘আমি খুনি বাবার ফাঁসি চাই। আপনেরা তাকে ধরে আনেন।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে পাশের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ভাটিচরনওপাড়া গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় জুলেখা খাতুন রত্নার। কয়েক বছর পর জাহাঙ্গীর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়।নিহত রত্নার ভাই সৈকত জানান, সেখানে বেসরকারি সংস্থায় চাকরির কথা বলে রত্নাকে নিয়ে বনশ্রী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠে জাহাঙ্গীর। সেখানে রত্না একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি নেন। এ অবস্থায় জাহাঙ্গীর কোথায় কিসের চাকরি করত বলত না। কিছুদিন পরপর গ্রামের বাড়ি থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে যেত। এই টাকা অল্প দিনে খরচ করে আবারও তাঁর বোনকে টাকার জন্য তাগাদা দিত। সময়মতো টাকা দিতে না পারলেই চলত নির্যাতন।

গত মঙ্গলবার রাতে ছেলেসহ দুজন মিলে খাওয়াদাওয়া করে। রাত ১১টার দিকে ছেলেকে শুতে বলে জাহাঙ্গীর ও রত্না নিজেদের কক্ষে ঘুমাতে যায়। প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে সৈকত জানান, জাহাঙ্গীর বুধবার খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় মূল দরজা খোলা ছিল। পরে ছেলে ঘুম থেকে উঠে বাবাকে বাসায় দেখতে পায়নি। ছেলে রায়ান বলে, সে স্কুল থেকে ফিরে দেখতে পায় তার মায়ের হিজাব ও বোরকা একটু দূরে পড়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার মা স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতিকালেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই মসিউর রহমান জানান, এ ঘটনায় তাঁরাও খুবই শোকাহত। তাঁদের ভাবি রত্না খুবই ভালোমনের মানুষ ছিলেন। ভাই জাহাঙ্গীর ছিল অত্যন্ত বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল।তিনি বলেন, ‘ভাবিকে হত্যায় যদি আমার ভাই জড়িত থাকে তাহলে আমাদের পরিবারও তার উপযুক্ত বিচার চায়।’

 

কিউএনবি/ অদ্রি / ২৮.০৭.১৮ / সকাল ৮.০০