১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:২৮

জোট সরকার গঠনের আলোচনা শুরু

পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের দলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোটসঙ্গীর সন্ধান করতে হবে ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই)। তারা সে কাজে নেমে পড়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদের দিকে পা বাড়িয়ে থাকা ইমরানকে ভিভিআইপি নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছে সরকার।

এদিকে ভোটের দিন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলেও গতকাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সুর নামিয়েছে। ‘আপত্তি থাকলেও’ বিরোধী দলের আসনে বসবে বলে জানিয়েছে দলটি। একই টোন এখন আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিরও (পিপিপি)।

পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন (ইসিপি) গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত মোট ২৬৮টি আসনের ফলাফল প্রকাশ করে। গত ২৫ জুলাই দেশটিকে পার্লামেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি প্রাদেশিক নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলোর ফলও প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে দেখা যায়, জাতীয় পরিষদের প্রকাশিত ২৬৮টি আসনের (নির্বাচন হয়েছে ২৭০ আসনে। দুটি আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে) মধ্যে পিটিআই পেয়েছে ১১৯টি আসন। পিএমএল-এন ৬৮টি এবং পিপিপি পেয়েছে ৪৩টি আসনে জয়লাভ করেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১২টি আসন।

এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ফলাফল তুলনামূলকভাবে খারাপ হয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর জোট মুত্তাহিদা মজলিশ-ই-আমল (এমএমএ) ১২টি, মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম-পি) ছয়টি, পাকিস্তান মুসলিম লীগ-কায়েদ পাঁচটি আসন পেয়েছে।

জাতীয় পরিষদের পাশাপাশি প্রাদেশিক পরিষদগুলোর ফলাফলও ইসিপি গতকাল ঘোষণা করে। পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ পাঞ্জাব প্রদেশে পিএমএল-এন আসনের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। এই প্রদেশটি গতবার তাদের হাতেই ছিল। তবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারেনি তারা। পাঞ্জাব প্রদেশের মোট আসন ২৯৫টি। এর মধ্যে পিএমএল-এন পেয়েছে ১২৭টি আসন। পিটিআই ১২৩টি আসনে জয় পেয়েছে। সরকার গড়ার চেষ্টা তাদের মধ্যেও প্রবলভাবে রয়েছে। পাকিস্তানের মোট ২০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৬০ শতাংশই এই প্রদেশে বাস করে। ইমরানকে পূর্ণ ক্ষমতার চর্চা করতে হলে অবশ্যই এই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখতে হবে।

সিন্ধু প্রদেশে মোট আসন ১২৯টি। এ রাজ্যে পিপিপি জয় পেয়েছে। তাদের আসন ৭৪টি। পিটিআই ২২টি। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে মোট ৯৭টি আসনের মধ্যে পিটিআই ৬৭টি, এমএমএ ১০টি আসন পেয়েছে।

বেলুচিস্তান প্রদেশে মোট আসন ৫০টি। বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টি পেয়েছে ১৪টি আসন। এরাই এই প্রদেশের সব চেয়ে বড় দল। ৯টি আসন নিয়ে এমএমএ রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

পাকিস্তানের প্রচলিত দ্বিদলীয় অবস্থা থেকে বের হয়ে ক্ষমতায় আসতে চলেছেন ইমরান। দেশের ক্ষমতায় নতুন মুখ হলেও তিনি অচেনা কেউ নন। পশ্চিমা বিশ্বে তাঁর পরিচিতি ‘সেলিব্রিটি প্লেবয়’ হিসেবে। ১৯৯২ সালে ক্রিকেটে বিশ্বকাপ বিজয়ী এই সফল অধিনায়ক অবশ্য তাঁর দেশে আজকাল জনপ্রিয়, ধার্মিক ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারক হিসেবেই অধিক পরিচিত। যদিও রাজনীতিতে তিনি ‘ধর্মের কার্ড’ খেলছেন বলে পুরনো অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এবার পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অর্থ ও সমর্থনপুষ্ট হয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন এমন কথা সরবে এবং আড়ালে প্রায় শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা, শক্ত হাতে বিরোধী ও গণমাধ্যমের দমনকে সেই বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবেই হাজির করতে চাইছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

তবে নির্বাচনের আগে বা ভোটের দিন বিরোধীরা যতই কথার খই ফোটাক চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর সব পক্ষই তা মেনে নিয়েছে। পিএমএল-এনের এক এমপি এবং নওয়াজ শরিফের ভাস্তে হামজা শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের আসনে বসব। যদিও বহু বিষয় নিয়েই আমাদের আপত্তি রয়েছে।’ পাকিস্তানে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতিবারই ওঠে। গত বার পিটিআই এই অভিযোগ নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে চার মাস পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে ছিল। সেই অসহযোগে সেনা সমর্থনও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দুই পক্ষেরই লক্ষ্য ছিল নওয়াজ সরকারকে অচল করে দেওয়া। এবার বিরোধী দলের প্রতি সেনাবাহিনীর সেই সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এখন জয়ী দলে জোর তোড়জোড় চলছে জোট গঠনে। পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য জাতীয় পরিষদে ১৩৭টি আসন প্রয়োজন। সেই হিসেবে পিটিআইয়ের আসন ২০টি কম পড়ে। অন্যদিকে এবার পিপিপি আসন পেয়েছে ৪৩টি। শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল ইমরান হয়তো তাদের দারস্থ হবেন। তবে তেমন সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন পিটিআইয়ের মুখপাত্র ফাওয়াদ চৌধুরী। তিনি জানান, পিটিআই নয়, বরং স্বতন্ত্র ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে চান তাঁরা। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর দর কষাকষিতে কয়েক দিন লেগে যাবে।

ইমরানকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে সে কয়টা দিন অপেক্ষা করতে হবে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা প্রটোকল এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন ইমরান। গত বৃহস্পতিবার থেকেই তাঁকে ভিভিআইপি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বাংলো পরিদর্শন করে গেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এলাকায় পুলিশ টহল চলছে। বাড়ির প্রাচীরে কাঁটাতার বসানোর কাজও শুরু হয়েছে।

সূত্র : বিবিসি, ডন, দ্য নেশন, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

 

কিউএনবি/ অদ্রি / ২৮.০৭.১৮ / সকাল ৭.৫৮