১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:২১

ভোটের আগেই শুধু আমাদের দিকে তাকায়

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটায় রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে রিকশায় সাহেব বাজারের এক আবাসিক হোটেলে যাওয়ার পথে দেখতে পেলাম, সড়কের দুই পাশ ছেয়ে আছে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীদের পোস্টারে। তবে পোস্টারে বৈচিত্র্য নেই। মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে শুধু একজনেরই পোস্টার চোখে পড়ল, তিনি আওয়ামী লীগের এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। অন্য পোস্টারগুলো কাউন্সিলর প্রার্থীদের।

এমনিতে কোলাহলহীন শান্ত এই শহরে এখন মাইকে মাইকে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা শোনা যাচ্ছে। মাইক লাগানো অটোরিকশা ধীরে ধীরে চলছে, কিংবা রাস্তার কোণে দাঁড়িয়ে আছে। মাইকে বাজছে রেকর্ড করা কথা। নারী-পুরুষের যুগল কণ্ঠে ছন্দে ছন্দে ভোট চাওয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন নগরী, মাদকমুক্ত নগরী, ইভ টিজিংমুক্ত নগরীসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিবেকের ডাক শোনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। অমুক ভাই এবং তাঁর মার্কার পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে।

যুবক রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি ভোটার কি না। মাথা নেড়ে বললেন, ভোটার।

ভোট দিতে যাবেন?
‘যাব না কেন? যাব।’
কাকে ভোট দেবেন?
‘যাঁকে ভালো লাগে।’
বলা যাবে না? আচ্ছা বলেন তো, মেয়র হবে কে?
‘লিটন ভাই।’
কীভাবে জানেন?
‘বাতাস বোঝা যায়।’
উনি কি ভালো?

‘লিটন ভাই সরকারের লোক। সরকারের লোক না হলে মেয়র হয়ে লাভ নাই। কিছু করতে পারে না।’

এক খাবারের হোটেলে ৪৬ বছর বয়সী হোটেলকর্মী আমার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তাঁর নাম ঊহ্য রাখার অনুরোধ জানালেন। আমি বললাম, এখানে লোকজন খাওয়াদাওয়া করতে করতে নির্বাচন নিয়ে গল্পগুজব করে না? তিনি বললেন, এটা ব্যস্ত হোটেল। এখানে গল্পগুজব করার টাইম নেই। লোকজন চা-সিগারেট খেতে খেতে আড্ডা দেয়, গল্পগুজব করে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে। আমি তাঁকে বললাম, সে রকম একটা জায়গায় যেতে চাই, যেখানে নির্বাচন নিয়ে গল্পগুজব শুনতে পাব।
‘আমার মনে হয় না ইলেকশন নিয়ে কেউ আলাপ করে।’
কেন?
‘ইলেকশন নিয়ে আর আগের মতো আনন্দ-ফুর্তি নাই। উৎসাহ নাই।’
কেন নাই?
‘আমাদের জীবনে ইলেকশন ম্যাটার করে না।’
সারা শহরে তো শুধু নৌকা মার্কার পোস্টার দেখি, ধানের শীষের পোস্টার নাই কেন?
‘ধানের শীষের পোস্টার কিছু ছিল। কিন্তু নাই হয়ে গেছে।’
কীভাবে নাই হয়ে গেল?
তিনি হেসে বললেন, ‘তা আমরা কীভাবে বলব?’
নির্বাচন নিয়ে কি মানুষের মনে কোনো ভয় আছে যে অশান্ত হতে পারে? এ রকম মনোভাব কি চোখে পড়ে যে গন্ডগোল হতে পারে, কী দরকার ভোট দিতে যাওয়ার?
‘সঠিক জানি না। কেউ কেউ এ রকম ভাবতে পারে। বিশেষ করে লেডিস ভোটাররা।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি। এটা ব্যতিক্রম। অন্য সব সিটি করপোরেশনে পুরুষ ভোটারের সংখ্যাই বেশি। সুতরাং রাজশাহীতে নারী ভোটারদের ভোট দিতে যাওয়া না-যাওয়ার গুরুত্ব অন্যান্য সিটি করপোরেশনের তুলনায় বেশি।

কাপড়ের দোকানে কজন নারী ভোটারের সঙ্গে কথা বললাম, ভোট দিতে যাবেন? আমার এই প্রশ্নের উত্তরে মধ্যবয়সী এক নারী বললেন, ‘অবশ্যই যাব।’
গন্ডগোল হলেও যাবেন?
‘গন্ডগোল হবে কেন?’
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ককটেল ফুটেছে। ভোটের দিন ফাটতে পারে না?
‘আশা করি শান্তিমতো ভোট দিতে পারব।’
মহিলার সঙ্গে দুই তরুণী ছিলেন। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, তাঁরাও আশা করেন ভোটের দিন শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন।
কিন্তু জুতাপট্টিতে দুই নারী বললেন, তাঁরা ভোট দিতে যাবেন না, কারণ ‘গ্যাঞ্জাম’ হতে পারে।
মাস্টারপাড়ায় কাঁচাবাজারে এক যুবক লেবু বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভোট নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা কী? তিনি দাঁত বের করে হেসে বললেন, ‘আমি এখানকার ভোটার না।’
তাঁর পাশের তরকারি বিক্রেতা বললেন, ‘ভোট নিয়ে চিন্তাভাবনা করে আমাদের কী লাভ? যাঁদের লাভ আছে, তাঁরাই চিন্তাভাবনা করে।’ পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান এক মধ্যবয়সী লোক। সম্ভবত ভোটের কথা শুনেই থামলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সাংবাদিক?’ আমি মাথা নেড়ে সায় দিলে তিনি বললেন, ‘যাঁরা পলটিশ করে, শুধু তাঁদেরই ইলেকসন নিয়ে ইন্টারেস। সাধারণ পাবলিকের কোনো ইন্টারেস নাই। আমি অনেক সাংবাদিককে এটা বুলেছি; পাবলিকের কোনো ইন্টারেস নাই।’
কেন নাই?

‘খুবই সোজা কথা। যারা পলটিশ করে, তারা নিজের আখের গুছানোর জন্য সবকিছু করে। পাবলিকের জন্য কিছুই করে না। তাহলে পাবলিকের কেন ইন্টারেস থাকবে?’
আমি বললাম, সিটি করপোরেশনে ভোট তো রাজনীতি নিয়ে নয়। আপনারা সিটি করপোরেশনকে ট্যাক্স দেন। সেই ট্যাক্সের টাকার সদ্ব্যবহার হোক, আপনারা চান না? আপনাদের শহর সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, উন্নত হোক, তা আপনারা চান না?
তিনি বললেন, ‘চাই তো। সবাই চাই। কিন্তু চাইলেই কি পাওয়া যায়? আমরা ট্যাক্স দিলে কী হবে, তারা তো পাওয়ারফুল। ভোটের আগেই শুধু তারা আমাদের দিকে তাকায়। ভোটের পরে আর তাকায় না। ভোটের পরে তারা আকাসে উঠে যায়।’
এই অবস্থা কত দিন চলবে?
‘কোন অবস্থা?’
এই যে আপনাদের ট্যাক্সের টাকায় চলে, কিন্তু…।

‘শুধু রাজসাই শিটি তো না, গোটা দেসটাই কি এইভাবে চলছে না? আমরা পলটিশের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি।’
জুতাপট্টির এক সস্তা জুতার দোকানের মালিক, দাড়িগোঁফে ঢাকা ৬৫ বছরের বৃদ্ধ বললেন, ‘কে ভালো? সক্কলের চরিত্র এক।
তখন পাশের গলিতে মাইক বাজছিল, ‘রাজশাহীর উন্নতির জন্য…’। আমি বৃদ্ধের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, ওই যে বলছে, রাজশাহীর উন্নতির জন্য…।
তিনি হেসে বললেন, ‘নিজের উন্নতির জন্য। যে ভোটে জিতে, খালি তার নিজের উন্নতি হয়। মানুষের কোনো উন্নতি হয় না।’
তবু তো নির্বাচন হবে। আপনি ভোট দিতে যাবেন না?
‘আমি ভোট দিই না।’

এ রকম হতাশ লোকের সংখ্যা অবশ্য খুব বেশি নয়। ৩০ জুলাই সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে, অনেক মানুষ ভোট দিতে যাবেন, বড় ধরনের গন্ডগোল ছাড়াই ভোট গ্রহণ শেষ হবে, এ রকম প্রত্যাশাই ব্যক্ত করলেন বেশির ভাগ মানুষ।তবে একই সঙ্গে এটাও বোঝা গেল, স্থানীয় সরকার পর্যায়েও জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

মশিউল আলম

 

কিউএনবি/ অদ্রি / ২৬.০৭.১৮ / দুপুর ৩.৫০