২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:২৮

পাকিস্তানে আজ কী ঘটবে?

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে পাকিস্তানে চলছে নানা হিসাব-নিকাষ। রাজপথ যেমন হয়ে উঠছে সহিংস, চলতি মাসেই বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ জুলাই আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির সমাবেশে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৪ জনের মৃত্যু ঘটে। ১২ জুলাই এক সাবেক সংসদ সদস্যকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ১৩ জুলাই দুইটি বোমা হামলায় ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়। তাছাড়া রাজনীতির মাঠেও চলছে যোগ-বিয়োগের খেলা।

৭১ বছর বয়সী দেশটিতে এবারও পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছে সেনারা। তাই সেনাবাহিনী যেমন হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মও। আবার নির্বাচন কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনাসহ উৎকণ্ঠাও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী পাঁচ বছরের জন্য পাকিস্তানের মজলিশ-ই-শূরা বা সংসদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে আজ। এদিকে দেশটির ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে সেনা মোতায়েনের ঘটনাও। ৮৫ হাজার ভোট কেন্দ্রে মোতায়েন করা হয়েছে ৩,৭১৩৮৮ সেনাসদস্যকে।

নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত সৈন্যরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আচরণবিধি দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী শুধু সফলভাবে নির্বাচন পরিচালনা করার কাজে সহায়তা করবে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব থাকবে নির্বাচন কমিশনের হাতে।

এদিকে গত সোমবার মধ্য রাতে নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধের পর দেশজুড়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তাদের উপস্থিতিতেই গতকাল মঙ্গলবার ব্যালট পেপার ও বাক্স কেন্দ্রে কেন্দ্রে পঠিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশনকে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে’ সহায়তার জন্য দেশজুড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক সেনা মোতায়েনের কথা জানানো হয়েছে।

নির্বাচনে নওয়াজ শরিফ, ইমরান খান আর বিলাওয়াল ভুট্টোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও মূল লড়াই হবে মূলত নওয়াজ ও ইমরানের মধ্যে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে পানামা পেপারস তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পাকিস্তানের আদালত তাকে সরকারি দায়িত্বে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করে। এরপর নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই শেহবাজ শরিফ পিএমএল-এন এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাবেক ক্রিকেটার ইমারন খানের পিটিআই বিতর্কিত কয়েকটি দলের সমর্থনপুষ্ট, যাদের একটি দলে আল কায়দার সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন। আর পিপিপি প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া জারদারি সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসসম্পন্ন পরিবারের সন্তান।

প্রধান তিন দলের দুই দলই নির্বাচনের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন আর ইমরান খানের পিটিআইয়ের মধ্যে জোর লড়াই হবে। তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জানা যাবে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতিতে চলা নানা নাটকীয়তার অবসান কী হতে যাচ্ছে নাকি প্রভাবশালী সেনাবাহিনীই আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়া অব্যাহত রাখবে।

পাকিস্তানে জাতীয় সংসদের ৩৪২টি আসনের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে দুইটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ২৭২ জন জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। বাকি ৭০টি আসনের মধ্যে ৬০টি নারীদের জন্য ও ১০টি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত। এছাড়া প্রাদেশিক সভার আরো ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত করা হয়।

এগিয়ে ইমরান খান : এ পর্যন্ত সব সমীকরণেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান এগিয়ে। তিনি ও তার দল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট বলে কথিত আছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের আগেই বিচার বিভাগ, সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভোটের ফল পিটিআইয়ের পক্ষে আনতে কাজ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

তাছাড়া নির্বাচনের আগেই ভোট জালিয়াতির যে অভিযোগ তুলেছেন পিএমএলএন দলের নেতারা তার সঙ্গে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন পিপিপির নেতারা। বলা হয়েছে, তাদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে। মিডিয়ায় রিপোর্ট কাভারেজ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়েছে সামরিক কর্মকর্তারা। তাদের দল ইমরান খানের সঙ্গে জোট গড়তে চাপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি উগ্র ডানপন্থীদেরও কাছে টানতে নানা চেষ্টা চালিয়েছেন ইমরান।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সেনাবাহিনী আসলে ইমরানকে সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজালেও তাদের খেলার শেষ অংশ বোধ হয় এখনো বাকি। আর সেটা দেখা যাবে নির্বাচনের পর। তবে যিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন তাকে এক অপূর্ণতার অভিশাপ নিয়েই ক্ষমতার মসনদে বসবেন। কারণ জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রীই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। সবশেষ নওয়াজ শরিফের সামনে সে সুযোগ থাকলেও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়।

তবুও জল্পনায় নওয়াজ : জেলে নওয়াজ শরিফ। তবু ভোটের মুখে সব জল্পনা তাকে ঘিরেই। পাকিস্তান গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই নওয়াজ ও মেয়ে মরিয়মকে ভোটের আগে জেল থেকে বেরোতে দিতে চায় না বলে অভিযোগ। সম্প্রতি দেশের প্রধান বিচাপতির কাছে এমন চাপ এসেছে বলে জানিয়েছেন ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি। গত সোমবার বন্দি নওয়াজকেই এক হাত নিলেন তেহরিক-এ-ইনসাফের প্রধান ইমরান খান। ইমরান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের সেনাবাহিনীকে গালমন্দ করাটাও অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন নওয়াজ। আর নির্লজ্জের মতো ভারতের সঙ্গে ভিড়তে চেয়ে বলে বেড়াচ্ছেন, মুম্বাই হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত ছিল।’

প্রসঙ্গত, পাকিস্তান সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কমপক্ষে ৩৪২টির মধ্যে কমপক্ষে ১৭২টি আসন জিততে হবে। প্রশ্ন হলো, ইমরান কি পাবেন তা? এদিকে পাকিস্তানের বিখ্যাত সিকিউরিটি ফার্ম একেডির করা এক জরিপ বলছে, পিটিআই এবার ৯৯টি ও পিএমএল ৭২টি আসন জিতবে। সে হিসেবে জোট সরকার ছাড়া গতি নেই। ইমরান খানের দল পিটিআই, শেহবাজ শরিফের পিএমএলের বাইরে তৃতীয় বড় দল হলো পাকিস্তান পিপলস পার্টি, যার প্রধান প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও আসিফ আলি জারদারির বড় সন্তান বিলাওয়াল জারদারি। নির্বাচন পূর্ববর্তী বিভিন্ন জরিপ বলছে, এই তিন দলকেই জোট সরকার গঠন করতে হবে।

সেনাবাহিনী : পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব কতটা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি দেশটির জনপ্রিয় পত্রিকা ডনের করা এক জরিপে দেখা যায়, পাকিস্তানের ৮৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন আসছে নির্বাচনে সেনা প্রভাব থাকবেই। ৩৫ শতাংশ মনে করেন, সেনারাই ফল নির্ধারণ করে দেবে। গেল মেয়াদে নওয়াজ শরিফের জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।

ধর্মও বিষয় : পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্মও অনেক বড় বিষয়। এই তো কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী হতে মরিয়া ইমরান খান উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন পেতে ব্লাসফেমি আইনের প্রতি তার জোর সমর্থন দিলেন। এমনকি জঙ্গি সংযোগের অভিযোগ অভিযুক্ত অনেক ‘ইসলামিক’ নেতাও লড়ছেন নির্বাচনে।

কিউএনবি/রেশমা/২৫শে জুলাই, ২০১৮ ইং/সকাল ১০:০৯