ব্রেকিং নিউজ
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৪৫

নেতাদের সামনে এখন অনেক কাজ

নিম্নমানের পরিষেবা ও বেকারত্ব নিয়ে ইরাকি জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে অনেক দিন ধরেই। বেশ কয়েক দিন ধরেই তারা চাকরির সুযোগ, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করছে। শিগগির এ পরিস্থিতির অবসান ঘটবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বসরা নগরীতে ইতিমধ্যে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরাক সরকার তার নিরাপত্তা বাহিনীকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট থেকে সৈন্য ও সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশন বসরায় পাঠিয়েছে।

আসলে চলমান সংকট নিয়ে জনসাধারণ ও রাজনীতিকদের বোঝাপড়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। আর এ কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সরকার এখন বিক্ষোভকারীদের হাতে যাতে জনগণের সম্পদ ও তেলসম্পদের কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। রাজধানী বাগদাদ যাতে অস্থিতিশীল না হয়, সে জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে প্রকৃত ক্ষতি এড়াতে ইরাকি রাজনীতিবিদদের সেসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, যেসব বিষয় এ ধরনের বিক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে। তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁদের জনসাধারণের কাছে এই সংকেত পাঠাতে হবে যে সঠিক ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা তাঁদের আছে। ইরাকের আসল সমস্যা আসলে বিশৃঙ্খল নির্বাচনমূলক গণতন্ত্রের মধ্যে। এই ব্যবস্থা হয়তো রাজনীতিবিদসহ মুষ্টিমেয় লোকের জন্য ভালো, বিশেষ করে যেখানে ইরাক তেলসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ এবং দেশটির তহবিলের প্রায় ৮০ শতাংশই তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সম্পদের সিংহভাগই বাইরে পাচার হয়, যা থেকে লাভবান হয় সরকার, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী ও বিভিন্ন কোম্পানি। এই গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় আমজনতা খুব একটা উপকৃত হয় না।

তত্ত্বগতভাবে ইরাকে ভোটারদের ক্ষমতা আছে কয়েক বছর অন্তর ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করার, যদি তারা সরকারের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু আসলে কি তারা সেটা করতে পারছে? ইরাকের এই অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অন্যতম একটি কারণ। ইরান এবার ইরাকের সাধারণ নির্বাচনকে তার মিত্রদের ক্ষমতায় রাখা এবং সমালোচক ও শত্রুদের ক্ষমতার বাইরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্রগুলোতে ৫৬ শতাংশ ভোটার অনুপস্থিত ছিলেন। এটা ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের সর্বশেষ উদাহরণ। আসলে ইরাক রয়েছে ইরানের প্রভাববলয়ে। ইরাকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক—সব ক্ষেত্রে ইরানের প্রভাব রয়েছে। সাধারণ ইরাকিরা মনে করে, এভাবে আধিপত্য বিস্তার করে ইরান তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করছে। তারা এখন তেহরানের শক্ত প্রভাববলয় থেকে বের হতে চায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইরাকি রাজনীতিকেরা কি তেহরানের প্রভাববলয় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার সাহস দেখাবেন এবং যে জন্য তাঁদের
নির্বাচিত করা হয়েছে, সেই কর্মসংস্থানের দিকে নজর দেবেন? ইরাকি সরকারি কর্মকর্তারা গত ফেব্রুয়ারিতে কুয়েতে আন্তর্জাতিক দাতাদের এক সম্মেলনে বলেছেন, ইরাক পুনর্গঠনে ব্যয় হবে ৮ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। দেশটির পরিকল্পনামন্ত্রী সালমান আল জুমাইলি বলেছেন, ইরাকের পুনর্গঠন ইরাকের জনগণের মধ্যে যেমন স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে, তেমনি ইরাকের স্থিতিশীলতা এই অঞ্চল ও গোটা বিশ্বকে স্থিতিশীল করবে।

ইরাকের একটি উজ্জ্বল দিক হলো ওপেকভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এটি এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ, যখন কিনা তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলার। ইরাকের কাছে বর্তমানে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত আছে, যা দেশটির সমৃদ্ধির স্বপ্ন পূরণের জন্য যথেষ্ট, যদি ইরাকি নেতারা শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন। বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য যদি একটি বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা দেশের ২০ শতাংশ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানে সাহায্য করতে পারবে এবং যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারবে।

বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ ইরাকের অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং পরিবহন, কৃষি ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে দেশটিকে বহুমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে পারে। তবে ইরাকি জনগণের ক্ষোভের অবসান তখনই ঘটবে, যখন রাজনীতিকদের সঙ্গে তাদের মতের পার্থক্য থাকবে না। অর্থাৎ রাজনীতিবিদেরা যখন জনগণের সমস্যাগুলো প্রকৃত অর্থে অনুধাবন করবেন এবং তা সমাধান করবেন। এ জন্য ইরাকি নেতাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। খালিজ টাইমস থেকে নেওয়া

অর্ণব নীল সেনগুপ্ত সাংবাদিক ও মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক ভাষ্যকার

কিউএনবি/ অদ্রি / ২৪.০৭.১৮ / সকাল ১১.৩৫