১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৪৯

১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

‘জন্মেছি, সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে কাঁপিয়ে দিলাম।
জন্মেছি, তোদের শোষণের হাত দুটো ভাঙ্গব বলে ভেঙ্গে দিলাম।
জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে করেই গেলাম।
জন্ম আর মৃত্যুর দুটি বিশাল পাথর রেখে গেলাম।
পাথরের নিচে, শোষক আর শাসকের কবর দিলাম।
পৃথিবী অবশেষে এবারের মতো বিদায় নিলাম।’

-মেজর জিয়াউদদিন (কর্ণেল তাহেরকে নিয়ে)
ঢাকা সেন্ট্রাল জেল।

১৯৭৬ সালের ২১ শে জুলাই।

বিপ্লবের ইতিহাসে একটা কালো দিন হিসেবে এই দিনটি রয়ে যাবে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়ের সূচনা যদি ’৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট হয়, তবে সেই কালো অধ্যায়ের বিস্তৃতি ঘটে ৩ নভেম্বর আর ৭ নভেম্বরে। এবং এর পরিপূর্ণতা পায় ’৭৬ এর ২১ শে জুলাই। এই প্রায় একবছরের কালো অধ্যায়ের আফটারম্যাথ হিসেব করতে গেলে দেখা যায় পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতি উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি সেই রাজনীতিতে এখনো।

লিখাটা শুরু করার আগে প্রেক্ষাপটটা বিবেচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ’৬২ সালে ছাত্রলীগ নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। নিউক্লিয়াস ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নের ও দাবীর জোরদার এক নাম। সেই নিউক্লিয়াসের উপর ভর করে পরবর্তীতে ৬ দফা, গণঅভ্যুত্থান থেকে ধরে বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন, সর্বোপরি স্বাধীনতা এসেছিল। ’৭১ এর সিচুয়েশনটা যদি বিবেচনা করি, তাহলে বলা যায় এটা জনযুদ্ধ নিঃসন্দেহে। কিন্তু রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক একটা আন্দোলনকে জনযুদ্ধে পরিণত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল। বঙ্গবন্ধুর এক ডাকে কোটি মানুষ যুদ্ধে নেমে পড়াটা কিন্তু তারই প্রমাণ। জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভটা ছিল পাকিস্তানিদের প্রতি কিংবা আরেকটু ক্লিয়ার করে বললে প্রশাসনের প্রতি, সেই ক্ষোভ চরম মাত্রা পায় বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণে। প্রত্যেকটা ঘটনা ছিল রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। আর সেই অংশটির দায়িত্ব পালন করে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস আর আওয়ামী লীগ। নিউক্লিয়াসকে আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা করার কারণটি পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করব। এইটুকু পর্যন্ত যা নিয়ে আলোচনা করলাম তা আসলে যুদ্ধের একটা অংশ। এই যুদ্ধের আরো একটা দিক ছিল, এবং সেটা নেহায়েত কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু।

এবার আসি আমরা যুদ্ধের সে দিকটায়- সামরিক দিক। পূর্ব পাকিস্তানের বহু সামরিক অফিসার পাকিস্তান আর্মিতে চাকরী করত। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। তবে তাদের জন্য এই চাওয়াটা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকির। কিন্তু ঐ যে কথায় আছে না- “বীরেরা ঝুঁকির ভয় করেনা”? অনেক বাংলাদেশি সেনা পাকিস্তান থেকে পালিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল কর্ণেল তাহের। বাঙালি অফিসারদের মধ্যে একমাত্র “মেরুন প্যারাসুট উইং” উপাধি প্রাপ্ত ব্যক্তি কর্ণেল তাহের। তিনি যেমন সাহসী ছিলেন, তেমনি ছিলেন দেশপ্রেমিক। তার সম্পর্কে কবি নজরুলের কবিতাটি সম্পূর্ণ খাটে,

“ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান।”

কর্ণেল তাহের শুধু একজন সামরিক অফিসার নন। তাই তাকে অন্য সকল অফিসারদের সাথে একই কাতারে ফেলা যায় না। তিনি ছিলেন বিশেষ একজন।বাংলাদেশের রাজনীতি তাকে টানত। এই রাজনীতির তরেই জীবন ও দিয়েছেন। তাহের ছিলেন অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের পরপর অধিকাংশ সামরিক অফিসারের বা সেক্টর কমান্ডারদের জীবন এক অর্থে থেমে গিয়েছিল, সেখানে কর্ণেল তাহের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন দেশকে সুন্দরভাবে গড়ার প্রত্যয়ে। সমাজতন্ত্রের পক্ষে, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ছিলেন তাহের সবসময় সোচ্চার। পাকিস্তানের সময় থেকেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। বড় ভাই আবু ইউসুফের বাসায় চলত তাঁর রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ভাষায় বলতে হয় “আউট অব দি বক্স থিংকার”। তিনি আসলেই স্রোতের বিপরীতে ছিলেন, সারাটিজীবনই। তাঁর ছোটোবেলার গল্প পড়লে দেখা যায় তিনি একবার ডাকাতের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। অস্বাভাবিক সাহসী এই ব্যক্তি খুব ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

আমি এই লিখায় তাঁর জীবন সম্পর্কে কিছু লিখতে চাই না। বরং তাঁর নেয়া কিছু সিদ্ধান্ত এবং তাকে নিয়ে নেয়া কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতে চাই

প্রথমত, ২৫ শে জুলাই পাকিস্তান থেকে পালিয়ে কর্নেল তাহের বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। জেনারেল ওসমানীর জন্য মুক্তিযুদ্ধের রিপোর্ট তৈরী করতে গিয়ে তিনি দেখেন যে ১১ নম্বর সেক্টর তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও তাঁর আশেপাশের এলাকা ছিল যুদ্ধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি এলাকা।পরবর্তীতে এই ১১ নম্বর সেক্টরেই তিনি যুদ্ধ করেন এবং এই সেক্টরটিই ব্রাদার্স প্লাটুন হিসেবে পরিচিত ছিল। তাহেরের সব ভাই-বোন এই সেক্টরে তাঁর অধীনে যুদ্ধ করেছিল। কামালপুর অভিযান ছিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযান। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তাহের। এই অভিযানই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাহেরের জন্য। নিজের জন্মদিনেই মর্টারের আঘাতে পা হারান তিনি। কামালপুর অভেদ্য রয়ে যায়। কামালপুরের সে অভিযান আসলে ঢাকা অভিযানের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দ্বিতীয়ত, বাহাত্তর সালের এপ্রিলে দেশে ফিরে আসার পর তাহেরকে কুমিল্লা ৪৪ নং বিগ্রেডের কমান্ডার হিসেবে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সামরিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তার মাথায় আসে যুগান্তকারী একটি আইডিয়া। পিপলস আর্মি বা গণবাহিনীর চিন্তা। মানে হল আর্মি শুধু সীমান্ত পাহারায় দিবে না, বরং ক্যান্টনমেন্টে থাকাকালীন সময়ে তারা নিজেরা চাষবাস করবে এবং নিজেরা জীবিকা উপার্জন করবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী জনসাধারণের কাতারে নেমে আসাটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কর্নেল তাহেরের দেয়া দীক্ষায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সেনাসদস্যরা জনগণের কাতারে নেমে এসে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছিল। সমাজতন্ত্রের সূক্ষ্ম আর এর সুন্দর ধারণা সেনাবাহিনীতে পুশ করার অন্য কোনো উপায় হতো ছিলো না।

তৃতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর কাছে ১৯৭২ সালের শেষের দিকে কর্নেল তাহের একটি উৎপাদনমুখী সেনাবাহিনী গঠনের রূপরেখা প্রদান করেন।  কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাহেরের স্বপ্নের সে রূপরেখা গ্রহণ না করায় অভিমানে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর দুই বছর কর্নেল তাহেরকে বাধ্য হয়ে অনেকটা বাঁধা-ধরা জীবনযাপন করতে হয়৷ বাল্যকাল থেকেই যিনি শোষণমুক্ত সমাজের কথা ভাবতেন, নেতৃত্ব ছিল যাঁর সহজাত গুণ, সে মানুষটিকে একেবারে নিষ্ক্রিয় জীবন-যাপন করতে হয়। সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেয়ার দুই বছরের মধ্যে রাজনীতিতে যোগদান বা দল গঠন না করার আইনি বাধা ছিল। এক্ষেত্রে এবার আমার লিখার প্রথমদিকের অংশে চলে যাই যেখানে আমি নিউক্লিয়াসকে আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা করেছিলাম। সেই অংশের নিউক্লিয়াস অংশটি বাহাত্তরে এসে নতুন একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দলটির নাম জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। এই দলটি ছিল বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিরোধীদল এবং শতভাগ মুক্তিযোদ্ধার দল। এই দলের আদর্শ অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিকতায় জাতীয়তাবাদ- কর্নেল তাহেরকে আকর্ষণ করে। তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত ছিল ১৯৭৪ সালে জাসদে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া যেখানে তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।

চতুর্থত, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেই জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেন। কর্নেল তাহের রাজনীতির চর্চা করতেন বলেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চাইতেন না রাষ্ট্র সামরিক যাঁতাকলে পিষ্ট হোক। কারণ ইতিহাস বলে সামরিক শাসন রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই তিনি এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ‘জাসদ’ এর নেতৃত্বে ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লব সংগঠিত হয়। মেজর জিয়াকে মুক্ত করে আনেন তাহের। এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে অবশ্য বেশকিছু দ্বিমত আছে। জিয়ার মতো কালসাপকে তাহের যে কেন বিশ্বাস করেছিলেন, তা নিয়ে সকলে সন্দিহান। কেউ কেউ মনে করে এটি তাহেরের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের কারণে হয়েছিল, আর কেউ কেউ মনে করেন তাহের জিয়ার প্রতি একটু অনুগত ছিলেন। তাই জিয়াকে তিনি মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এই জিয়াই পরবর্তীতে কর্ণেল তাহেরের ফাঁসির ব্যবস্থা করেছিলেন। সেটি ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য এক পাঠ।

এতক্ষণ কর্ণেল তাহেরের নেয়া কিছু সিদ্ধান্তের কথা আলোচনা করছিলাম। এবার তাঁর উপর নেয়া কিছু সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করি। এই সিদ্ধান্তগুলো ছিল সামরিক আদালতের। সামরিক সরকার তার চরিত্র অনুযায়ী কর্নেল তাহেরসহ জাসদের ৩৩ জন নেতাকে বন্দী করে। তারপর তাঁর সমগ্র পরিবার রাষ্ট্রীয় ক্রোধের মুখে পড়ে। ১৯৭৬ সালের জুন মাসে কেন্দ্রীয় কারাগারে তারকাঁটা দিয়ে স্থান নির্দিষ্ট করে কর্নেল তাহেরসহ ৩৩ জন বন্দীর অবৈধ বিচার শুরু হয়৷ ইতিহাসের জঘন্যতম বিচার কার্যটি সম্পন্ন হয় এই আদালতে, যেখানে তাহেরের ফাঁসির সিদ্ধান্ত আসে। এই বিচার নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

প্রথমত, তাহেরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহের মামলা করা হয়। মামলাটি করা হয় জিয়ার সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে। এবার আসি এই অপরাধের জন্য ফাঁসির শাস্তির ব্যাপারে। যে অপরাধের জন্য তাহেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো বিধান ছিল না। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। যা প্রমাণ করে, এই বিচার ছিল সম্পূর্ণ একটি প্রহসন।

দ্বিতীয়ত, আমরা জানি যে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের বা আসামীর উকিলদের আসামীর পক্ষে কথা বলার অধিকার থাকে। এখানে আসামিদের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়নি আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ। এমনকি সাক্ষীদের জেরা করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। সুতরাং বিচারের বিরুদ্ধে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।

তৃতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তা-ও শোনানো হয়নি। তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়নি তাঁরা দোষ স্বীকার করেন কি না। তাঁদের সাফাই সাক্ষীরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। আত্মীয়-পরিজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলার সুযোগ পাননি অভিযুক্তরা। দেওয়া হয়নি এফআইআর ও অভিযোগপত্রের কপি। ফৌজদারি মামলায় যেসব প্রক্রিয়ার অনুসরণ করার কথা ছিল, তার কোনোটাই অনুসরণ করা হয়নি। আদালতের নিরপেক্ষতা তো দূরে থাক, রায়টি যে পূর্ব নির্ধারিত ছিল- তা এই পয়েন্টটি থেকেই বুঝা যায়।

চতুর্থত, পৃথিবীর কোনো আদালতেই পঙ্গু ব্যক্তির ফাঁসি দেওয়ার কোনো আইন ঐদিন পর্যন্ত ছিল না। কর্ণেল তাহের হয়ত ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি ছিলেন, যাকে পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও ফাঁসির কাঠে ঝুলতে হয়েছিল।

এসব বিশ্লেষণ থেকে আমরা দেখতে পারি যে কর্ণেল তাহেরের যে বিচারটি করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সাজানো একটি নাটক। আর এই নাটকের মূল হোতা ছিলেন খোদ জিয়াউর রহমান। নিজের ক্ষোভ থেকে তাহের এবং তাঁর সঙ্গীদের বিচারের নামে প্রহসন করেছিলেন এই ব্যক্তি।

১৯৭৬ সালের ১৪ জুন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৭ জুলাই তাহেরকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। এরপর ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু তাহেরকে যে আইনে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সেই আইনে ওই সময় মৃত্যুদণ্ডের কোনো বিধান ছিল না। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ’৭৬-এর ৩১ জুলাই মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। তাই আইনগতভাবে ওই দণ্ড ছিল অবৈধ। তথাকথিত ওই আদালতের বিচারক আবদুল আলী ও অন্যরা বলেছেন, বিচারের সময় তাঁদের সামনে কোনো কাগজ বা নথিপত্র ছিল না। (সূত্রঃ প্রথম আলো,২০১১)

এই মহান দেশপ্রেমিককে দেশদ্রোহীর তকমা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু সত্য চাপা থাকে না। তাঁর মৃত্যুর ৩৫ বছর পরে এই প্রহসনের বিরুদ্ধে রায় এসেছে। প্রমাণিত হয়েছে কর্ণেল তাহের দেশপ্রেমিক ছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে যখন যাচ্ছিলেন তাহের, তখনো তাঁর মনে কোন ভয় ছিল না। কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি জানতেন সত্য গোপন থাকবে না, ইতিহাস তাঁকে আজীবন স্মরণ করবে। তাই তো কর্ণেল তাহের আজও আমাদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। আজো তিনি বিপ্লবীদের জন্য এক আদর্শ। কর্ণেল তাহেরকে কখনো আমরা ভুলব না। এই জাতি কখনো ভুলবে না। বিপ্লবীদের মৃত্যু হয়, কিন্তু বিপ্লবের মৃত্যু হয় না।

তথ্যসূত্রঃ
জাসদের উত্থান পতন-অস্থির সময়ের রাজনীতি,
ক্রাচের কর্ণেল,
ডঃ আনোয়ার হোসেনের বিভিন্ন লিখা
২০১১ সালের ২২ শে মার্চ ট্রাইবুনালের রায়।

 

কিউএনবি/ অদ্রি / ২১.০৭.১৮ / সকাল ১১.৩৫