১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৪৩

‘আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়’

 

‘আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়’ডেস্কনিউজঃ  কক্সবাজারের মাতামুহুরি নদী এলাকার জন্য একটি ডুবুরি দলের আবেদন জানিয়েছেন আনোয়ার হোসেন। মাত্র একদিন আগে মাতামুহুরির পানিতে যিনি হারিয়েছেন দুই সন্তান।

তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান এই বাবা বলেন, ‘নিয়তির এ কেমন নির্মম পরিহাস। আমার এক মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে ছেলেগুলোকে নিয়ে গেছে আল্লাহ। আমি কাউকে বুঝাতে পারছিনা এই দুই সন্তান হারিয়ে আমার বুকে কত যন্ত্রণা হচ্ছে। তবে সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমি চাইনা আমার মত আর কোন বাবার বুক এভাবে খালি হোক।’

প্রশাসনের কাছে এই এলাকায় একটি খেলার মাঠ করে দেওয়ার দাবি জানান আনোয়ার হোসেন। বলেন, ‘যাতে করে আমাদের সন্তানেরা আর নদীর পাড়ে খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা না যায়। এই খরস্রোতা নদী মাতামুহুরির এলাকায় যেন একটি ডুবুরির দল থাকে। যাতে পানিতে ভেসে যাওয়া সন্তানদের উদ্ধার করতে পারে। ডুবুরী না থাকার কারনে আমার সন্তানদের ঠিক সময়ে উদ্ধার করা যায়নি। যদি ডুবুরী দল থাকত হয়ত আমাদের সন্তানদের জীবিত উদ্ধার করতে পারতাম। আমি চাইনা আর কোন সন্তান বাবা-মাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাক।’

গত শনিবার (১৪ জুলাই) চকরিয়ার মাতামুহুরি নদীতে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি হওয়া পাঁচ স্কুল ছাত্রের মধ্যে ছিল দুই ভাই আমিনুল হোসেন এমশাদ ও মেহেরাব হোসেন। এদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে নির্বাক হয়ে আছেন তাদের মা একমাত্র বড় বোন। বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন তারা।

এই দৃশ্য শুধু আনোয়ার হোসেনের পরিবারে নয়, মাতামুহুরি নদীর চরে ফুটবল খেলা শেষে নদীতে গোসল করতে নেমে মারা যাওয়া অন্য তিন শিক্ষার্থীর পরিবারেরও একই অবস্থা। সন্তানদের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল, মাতামুহুরিতে এভাবে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই এভাবে পানিতে ডুবে মারা যায় মানুষ আর দুই এক দিন পর সেই লাশ ভেসে উঠলে তা উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।

এসব লাশ উদ্ধারে প্রশাসনের কোনো ভূমিকা থাকে না। কারণ এই কাজের জন্য প্রশাসনে কোনো ডুবুরি নিযুক্ত নেই। এমনকি পর্যটন নগরী কক্সবাজারেও নেই কোনো প্রশিক্ষিত ডুবুরি। ফলে কেউ পানিতে ডুবে গেলে তাকে উদ্ধারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি আনতে হয়। ততক্ষণে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।

একই ঘটনা ঘটেছে এই পাঁচ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও। আট ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। যদিও এর আগেই স্থানীয়রা উদ্ধার করেন তিনজনের লাশ।

স্থানীয় প্রশাসনে বা ফায়ার সার্ভিসে ডুবুরি থাকলে এই শিশুদের জীবিত ফিরে পাওয়া যেত বলে মনে করেন স্থানীয় মোহাম্মদ জাকারিয়া। তিনি বলেন ‘এই স্কুল শিক্ষার্থীরা পানিতে ভেসে গেছে বিকেলের দিকে। সেই থেকে স্থানীয় জনগণ উদ্ধার অভিযানে নেমেছে। কিন্তু কোন ডুবুরি নামেনি। প্রশাসনও তেমন কিছু করতে পারেনি ডুবুরির অভাবে। পরে ঘটনার ৮ ঘন্টা পর রাত ১১ টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি আনা হয়। ততক্ষণে সবই শেষ।’

আরেক স্থানীয় নাগরিক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজারের মত একটি জায়গায় ডুবুরি নেই। এটি খুবই দুঃখজনক। শুধু মাতামুহুরি বলে কথা না। এই উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায়ই ঘটে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু ডুবুরির অভাবে তা ঠিক সময়ে উদ্ধার হয়না। তাই এই এলাকায় ডুবুরি দল টিম খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।’

বিষয়টি স্বীকার করে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পরিদর্শক জি.এম মহিউদ্দিন জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ডুবুরি থাকলে উদ্ধার কাজ দ্রুত করা যেত। এসব না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তবে ডুবুরি দলের সদস্য সংযুক্তর বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

এর আগে গত শনিবার বিকেলে আজের্ন্টিনা-ব্রাজিল দলে বিভক্ত হয়ে ফুটবল খেলা শেষে ছয় কিশোর মাতামুহুরি নদীতে গোসল করতে নামে। কিছুক্ষণ পরই তলিয়ে যায় তারা। তবে এদের মধ্যে কেবল মারুফ ইসলাম জামিল নামে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও মারা যায় অন্য পাঁচজন। এরা হলো চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আমিনুল হোসাইন এমশাদ, মো. ফারহান বিন শওকত, সায়ীদ জাওয়াদ অরবি, তূর্ণ ভট্টাচার্য ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মেহরাব হোসেন।

রোববার (১৫ জুলাই) বেলা ১১ টায় নিহত পাঁচস্কুল শিক্ষার্থীর মধ্যে চারজনের জানাজায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয়। এছাড়া তূর্ণ ভট্টাচার্যকে সৎকারের জন্য তার নিজ বাড়ি কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিউএনবি/বিপুল/১৬.০৭.১৮/দুপুর ২:১৩