২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৩০

বাংলাদেশে মুসলিমদের দাঁড়াতে হবে নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে : তসলিমা

 

ডেস্ক নিউজ : সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, তাদের জায়গা-জমি দখল, ঘর-বাড়ি উচ্ছেদ, খুন-ধর্ষণ-নির্যাতনের মতো ঘটনা বাংলাদেশে অহরহ ঘটে চলছে। এই সমস্যা সমাধানে সম্প্রীতি জাগ্রত করার কোনো বিকল্প নেই। আমেরিকার নিউইয়র্কে বাঙালিদের একটি মিলনমেলার অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ফেসবুকে পোস্ট করা তার দীর্ঘ স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

‘নিউইয়র্কের বাঙালি হিন্দুদের নেমন্তন্ন গ্রহণ করলাম দুদিন আগে। ইউরোপ আমেরিকায় বাঙালি হিন্দু দুই রকমের, পশ্চিমবঙ্গের আর বাংলাদেশের। এই দুই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে বন্ধুত্ব কমই হয়। শ্রেণীর তফাতের কারণেই মূলত। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তুলনায় অবস্থাপন্ন, পেশায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর …। বাংলাদেশের হিন্দুরা অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণীর। বাংলাদেশের হিন্দুরা মিশতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তাদের সঙ্গে মিশতে চান না। অগত্যা বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলাদেশের মুসলমানদের সঙ্গেই মেশেন। সেদিনের নেমন্তন্নে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ– এই দুই অঞ্চলের হিন্দুই ছিলেন। পরস্পরকে ভালোবেসে ছিলেন, তা কিন্তু নয়।’

‘তথাগত রায় বিজেপি নেতা, এখন ত্রিপুরা রাজ্যের গভর্নর, তাকেও ডিবেট আর ডিনারের জন্য নেমন্তন্ন করা হয়েছিল। তথাগত রায় ভালো বক্তা। সেদিন তিনি যা বললেন, তা হলো, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের লড়তে হবে বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের হিন্দুদের দুর্দশা ঘোচানোর আর কোনও পথ নেই। মারাঠী হিন্দু, তেলুগু হিন্দু, রাজস্থানী হিন্দু, বিহারি হিন্দু, পাঞ্জাবী হিন্দু, কন্নড় হিন্দু, — কেউ বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের দুঃখ ততটা অনুভব করবেন না, যতটা অনুভব করবেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু। কারণ তারাই তাদের কাজিন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করলে ভারত সরকার চাপ সৃষ্টি করবেন বাংলাদেশের সরকারের ওপর। এতেই হবে সমস্যার সমাধান।’

‘আমি একমত হইনি। বলেছি, বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তাদের মন্দির ভেঙ্গে ফেলা হয়, এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের। সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের নাগরিক। ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। অথচ হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে এই সরকার কোনও ব্যবস্থা নেননি। মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল লেখক প্রকাশক ব্লগারদের এক এক করে খুন করে ফেললেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে এই সরকার কোনও ব্যবস্থা নেননি। এই সরকার বরং ধর্মান্ধদের নিয়ে ওলামা লীগ নামে একটি দল তৈরি করেছেন। মসজিদ-মাদ্রাসার আর প্রয়োজন না হলেও দেশ ছেয়ে ফেলছেন মসজিদ মাদ্রাসা বানিয়ে। হিন্দুদের ঘৃণা করার জন্য, নির্যাতন করার জন্য, ওঁদের মেরে ফেলার জন্য , ওঁদের মন্দিরের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য, জেহাদ করার জন্য দিন রাত মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করছেন অগুনতি পীর হুজুর। সবকিছু জানার পরও এঁদের ওয়াজ বন্ধ করার কোনও ব্যবস্থা সরকার আজও নেননি।’

‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে খুব পছন্দ ভারতের। দুই চারজন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারকে ফাঁসিতে চড়িয়েছেন বলে হাসিনাকে মৌলবাদবিরোধী শক্তি বলে ভাবার কোনও কারণ নেই। হিন্দুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা বাংলাদেশের কোনও সরকার করেননি, হাসিনাও করেননি। কিন্তু করতে হবে। দেশের মানুষ– যারা গণতন্ত্রে, মানবাধিকারে, ধর্মনিরপেক্ষতায়, অসাম্প্রদায়িকতায়, বাক স্বাধীনতায়, মানবতায় বিশ্বাস করেন, তাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে সমাজ বদলাবার, রাষ্ট্রধর্মকে বিদেয় করার, সংবিধানকে সেক্যুলার করার। প্রগতিশীল মানুষের সংখ্যা বাড়লেই হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’

‘তথাগত রায়ের মূল বক্তব্য, হিন্দুদের হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমার বক্তব্য, হিন্দুকে হিন্দুর পাশে, মুসলমানকে মুসলমানের পাশে, ইহুদিকে ইহুদির পাশে, খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানের পাশে দাঁড়াতে হবে– এ বড় সাম্প্রদায়িক ভাবনা। আমি হিন্দু নই, হিন্দু ধর্মে আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে আমি দাঁড়াই। নির্যাতিত মুসলমান, নির্যাতিত ইহুদি খ্রিস্টান বৌদ্ধর পাশে দাঁড়াই। আসলে, মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায় — এমন সমাজই আমাদের তৈরি করতে হবে।’

কিউএনবি/রেশমা/১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং/দুপুর ১২:৩২