১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৫১

বাবা-মায়ের মতো শিক্ষকরাও কি বিরক্ত হয় শিশুর প্রশ্নে?

 

ডেস্ক নিউজ : মন কোনো শিশু আছে যার প্রশ্নে মা-বাবা বিরক্ত হয় নি? এমন কোনো বাবা-মা আছে যারা সন্তানের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে তাকে ধমকে থামিয়ে দেয় নি। কথা বলতে শেখার পর ইঁদুরের মত দাঁতে ধার দেওয়ার ছলে সারাদিন মুখে বকবকানি চলেনি এমন অভিযোগ কে দিবে, কোন শিশুর বিরুদ্ধে? কী, কেন, কোথায়, কখন ইত্যাদি অভ্যস্ত বান্তর ও অবান্তর প্রশ্নের চর্বিত চর্বনে ফেনা ওঠেনি কোন শিশুর মুখে? স্বজন যেমন শিশুর কৌতূহলী প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছে, তেমনি তার ভিতর জ্ঞানের তৃষ্ণাও দেখেছে, হয়েছে প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ইঙ্গিত পেয়ে আশাবাদী হয়েছে ভবিষ্যতেরও। তখন তার পারিবারিক জীবন, পরিচিত জন যেমন সীমাবদ্ধ, তেমনি প্রশ্নগুলোও; তবুও সীমাহীন তার জিজ্ঞাসা। 

৪-৫ বছর বয়স হলেই তাকে পাঠানো হচ্ছে বিদ্যালয়ে। সেখানে শিশু পারিবারিক পরিচিত জনের সীমা পেরিয়ে সুযোগ পাচ্ছে বিস্তর সঙ্গের এবং বিষয়ের। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের ক্ষেত্রগুলোর হচ্ছে সীমাহীন, জানার জগৎ হচ্ছে বিস্তৃত। এখানে তার সেই অভ্যস্ত বান্তর ও অবান্তর প্রশ্নের গতি হওয়ার কথা লাগামহীন ঘোড়ার মতো। এখন বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হয় না। শিক্ষকরা আরো বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি কেমন? নতুনকে জানবার সেই দুর্বার তৃষ্ণায় তাকে কতটা উদ্বুদ্ধ করছে এই নতুন পরিবেশ? তারা কতটা প্রশ্নমুখর বিদ্যালয়ে? বাবা-মায়ের মতো শিক্ষকেরাও কি বিরক্ত হচ্ছে শিশুর অনবরত প্রশ্নে? নাকি তারা ভুলতে বসেছে জী-স্যার, হ্যাঁ-স্যার এর উত্তরের মাঝে? পড়া দেওয়া, পড়ানো এবং উত্তর মুখস্ত করার মধ্য আবদ্ধ হয়ে নেই তো শিশুর যোগ্যতা ভিত্তিক জ্ঞান? 

আমি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেছি, শিশুদের কাছে মুক্ত প্রশ্ন চেয়ে দেখেছি তাদের জানার আগ্রহ নেই, বা সে আগ্রহ তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে না, অথবা তারা হারাতে বসেছে তাদের সেই শিশুসুলভ অবান্তর কৌতূহলও। বিশিষ্ঠ প্রাবন্ধিক আবুল ফজলের ভাষায়, ‘জিজ্ঞাসা বন্ধ হওয়া মানে উত্তর না খোঁজা, সমস্যার মোকাবিলা করতে অস্বীকার করা মানে সমাধানের দিকে পিঠ ফিরে থাকা।’(নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ. ১২১)। আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে বইয়ের পোকা হয়ে শুধু উত্তর মুখস্ত করছে। তারা সনদপত্র পেয়ে ফাইল ভারী করছে কিন্তু বাস্তব জীবন পরিচালনায় স্বদক্ষতায় থাকছে পিছিয়ে। তাদের সামনে শিক্ষক গাইড হিসেবে না থেকে ধরিয়ে দিচ্ছে গাইড বই। যাও বাবা পড়ে খাও। অত্ত চিন্তা করার কী আছে? গাইডে অনেক প্রশ্ন আছে, যোগ্যতার, অযোগ্যতার, কী নাই। তুমি একা ভেবে কত প্রশ্ন বের করবে? পরীক্ষায় এখন যোগ্যতা ভিত্তিক প্রশ্ন করে পরীক্ষার্থীকে যাচাই করা হয়। তাছাড়া, গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন আসছে পরীক্ষায়। এমনকি আনসিন কমপ্রিহেনশনও। সুতরাং জিজ্ঞাসা বন্ধ, মুখস্ত করো, পরীক্ষায় ঢালো, পাশ হয়ে যাবে। পড়তে ইচ্ছা না হয় অপেক্ষা করো, প্রশ্নতো ফাঁস হবে। সেগুলো দেখে যেও, হয়ে যাবে।

পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ জাপান পরিমান নয় শুধুমাত্র মানকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ৯ বছরের প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের ভর্তির হার শতভাগ এবং এই গ্রেডে কোনো অশিক্ষিত শিশু নেই। শতকরা ৮৫ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে আনন্দবোধ করে। ( https://novakdjokovicfoundation.org/interesting-facts-about-japanese-school-system/) অথচ আমাদের দেশে শিশুদের বিদ্যালয়ে শতকরা ৮৫ ভাগ নিয়মিত করার জন্য উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিংসহ কত রকমের আয়োজন করা লাগে। 

জাপানে শিক্ষার্থীরা শেখে খেলা আর আনন্দে আর আমরা তাদের গলধকরণে করি বাধ্য। জাপানে কোন ব্যক্তিকে সরকারী বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে ৪ বছর মেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কোর্স বা ২ বছর মেয়াদি নিম্ন মহাবিদ্যালয় কোর্স সম্পন্ন করে শিক্ষণ সনদ অর্জন করতে হয় এবং তারপর টিচিং সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। আর আমাদের দেশে নূন্যতম উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই একজন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতার যোগ্যতা অর্জন করে। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম। সন্তানকে কিভাবে লালন পালন করতে হয় তা মাকে শিখিয়ে দেওয়া লাগে না, হয়তো এই ভরসাতেই ৬০% মহিলা শিক্ষক নিয়োগ প্রথাও আছে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষক নিয়োগে কোনো কোটা থাক তা মানতে রাজি নই। আমার প্রশ্ন হলো এই মায়েরাও কী তাদের সন্তানদের কৌতূহলী তৃষ্ণা ধরে রাখতে পারছে? 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে ৭০ বছর বয়সে রাশিয়া ভ্রমন করে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে অভিভূত হয়েছেন। আমাদের সন্তানদের অবস্থা প্রসঙ্গে আফসোস করে বলেছেন, ‘ওরা কোনোদিন জানতে চাইতে শেখে নি- প্রথম থেকেই কেবলই বাঁধা নিয়মে ওদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তার পরে সেই শিক্ষিত বিদ্যার পুনরাবৃত্তি করে ওরা পরীক্ষার মার্কা সংগ্রহ করে।’(রাশিয়ার চিঠি, পৃ. ৩০)। একই গ্রন্থে তিনি আরো বলেছেন, ‘যে শিক্ষা আমাদের দেশে প্রচলিত তাতে করে আমাদের চিন্তা করার সাহস, কর্ম করবার দক্ষতা থাকে না; পুঁথির বুলি পুনরাবৃত্তি করার ’পরেই ছাত্রদের পরিত্রাণ নির্ভর করে।’(পৃ. ২১)। আমাদের সন্তানদের আমরা যতটা শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলছি তার চেয়ে অনেক বেশি পরীক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলছি। তাইতো পরীক্ষার আগের রাতে বাবাকে ছুটতে দেখা যায় প্রশ্ন ফাঁসের কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না। সন্তানের অযোগ্যতা সত্ত্বেও ছুটতে দেখা যায় বৃত্তি পাওয়ানোর অনৈতিক দৌড়ে। আছে টিউশন মাস্টারের এ + পাওয়ানোর গ্যারান্টিসহ আগামী সমৃদ্ধ ব্যাচের আকাঙ্ক্ষা। পরনির্ভরশীল ভবিষৎ প্রজন্ম গঠনে আমরা সবাই ছুটছি অক্লান্ত।

প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।’স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে নতুনকে জানার দুর্বার তৃষ্ণায় অতৃপ্ত থাকতে হবে। অতৃপ্ত জ্ঞানের তৃষ্ণায় যদি আমাদের বিদ্যালয়ের শিশুদের তৃষ্ণার্ত করতে পারি তবেই তাদের মনে জাগবে কৌতূহল, প্রশ্নের সীমাহীনতা। যদি কোনো প্রশ্ন না থাকে তবে নতুন কিছু জানার আগ্রহ থাকে না। শিশুর মনে প্রশ্ন জাগাতে হবে, সমস্যা সমাধানে তাকে ভাবাতে হবে, তবেই সে হবে জ্ঞান তৃষ্ণার্থী। যত বেশি প্রশ্ন, তত বেশি জানার প্রচেষ্টা, তত বেশি যুক্তি নির্ভরতা। এই যুক্তিনির্ভর জ্ঞানই সুশিক্ষা, যা ছাড়া মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অসম্ভব।

 

 

কিউএনবি/আয়শা /১২ জুলাই, ২০১৮ ইং/বিকাল ৫:৩২