ব্রেকিং নিউজ
১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৫:১৭

বাবা’র চিঠি

 

আফজাল সাহেবের বয়স সত্তর বছর প্রায়।বিপত্নীক।তিন ছেলের জনক।দু’বছর হল ওদের মা’মারা গেছেন।অসাধারন একজন মা’ ছিলেন,খুবই সহজ সরল।অন্যদিকে আফজাল সাহেব ভীষন রাশভারী গোছের।কখনও নিয়মের বাইরে যাননি।এ বয়সেও হালকা ব্যায়াম,পার্কে হাঁটা,স্বল্প খাওয়া দাওয়াই তার রুটিন।ছেলেদেরকেও কঠোর নিয়মের মাঝে মানুষ করেছেন।বড় ছেলে ব্যাংকার,আফজাল সাহেবের বাড়ীতেই আছেন।বিয়ে করেছে ও দুই বাচ্চার বাবা।মেজ ছেলে ডাক্তার,ছেলের বউ ডাক্তার।ওরা থাকে নিউজিল্যান্ডে,ওদেরও একটি মেয়ে।

ছোট ছেলে ইন্জিনিয়ার,স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা আছে,এখনও বিয়ে করেনি।ওদের মা’ মারা যাওয়ার পর আফজাল সাহেবের জীবনেও কিছুটা অনিয়ম শুরু হল।কারন তিনি সারাজীবন যে নিয়মের মধ্যে ছিলেন তার পেছনে ওনার সহধর্মিনীর ভূমিকাও যথেষ্ট ছিল।তবে একেবারে খারাপ নেই,মোটামুটি ভালোই আছেন।তবে নিউজিল্যান্ড ঘুরে দেখার একটু সুপ্ত বাসনা ছিল,যদিও ছেলেকে এখনও জানাননি।আর ছেলে, ছেলের বউ একবারও যেতে বলেনি।ছেলেদের পড়াতে গিয়ে নিজের পকেটও প্রায় খালি করে ফেলেছেন।

বড় ছেলে বাড়ী করছে।তিনি মনে মনে ভেবেই রেখেছেন,উনিও ওদের সাথেই নতুন বাড়ীতে উঠে যাবেন।এই দুই নাতির সাথে তার খুব ভাব।নাতিদেরকে উনিই পড়ান।যদিও বড় বউ ওনার পড়ানো খুব একটা পছন্দ করছেননা।আবার ওদের জন্য আলাদা করে টিউটর রেখেছেন।নতুন বাড়ীতে ওরা দু’জন আর দাদা একসঙ্গে এক রুমে থাকবেন,তা নিয়ে দাদা-নাতির কত পরিকল্পনা।ওরাতো ওদের বাবা’কেও বলে রেখেছে,ওরা দাদা’র সঙ্গে এক রুমেই থাকবে।ওরা দাদা’র সামনেই বলেছে আর ওদের বাবা’ও রাজি আছে।তো সব ঠিকঠাক সবাই আর দু’মাস পরেই ওরা নতুন বাড়ীতে উঠবে।দাদা আর নাতিরা তো ঠিকই করে ফেলেছে সামনের ফাঁকা জায়গাটাতে ওরা বাগান করবে।প্রতিদিন নিয়ম করে গাছে পানিও দেবে।সবাই খুব খুশি।

নতুন বাড়ী নতুন আসবাব দিয়ে সাজানো হচ্ছে।আফজাল সাহেব তার পুরানো খাট নতুন করে পালিশ করাচ্ছেন।মনে মনে ভাবছেন,এই খাটে তিনজনের বেশ ভালোভাবেই জায়গা হয়ে যাবে।সব আসবাব দিয়ে ঘর সাজানো হয়েছে।আফজাল সাহেব কতবার করে ছেলেকে,বউকে ওনার শোয়ার খাটটা নিয়ে যেতে বলছেন,ওরা কোন উচ্চবাচ্য করছেনা।শেষমেস উনি বলেই ফেললেন,আমার এই খাট ছাড়া আমি কিন্তু ঘুমাতে পারিনা।ছেলের বউ বলল,’আপনি আবার কোথায় যাবেন?আপনিতো এখানেই থাকবেন’।উনি বললেন,’তার মানে আমি যাচ্ছিনা,বড় খোকা?স্পষ্ট করে বল।

বড় খোকা আমতা আমতা করে বলল,বাবা,তুমি ওখানে কী করে যাবে? মাত্র তিনটা বেডরুম।বাচ্চারাওতো বড় হয়ে যাবে, একদিন।ওদের দু’জনার দু’রুম আর আমাদের একটা।তাছাড়া এত বড় বাড়ী,কত ভাড়াটিয়া,তুমি চলে গেলে এসব দেখবে কে?আফজাল সাহেব কখনও কাঁদেননা।সেই কবে ওদের মা’মারা যাবার সময় কেঁদেছিলেন।আর আজ অনেক কষ্টেও চোখের পানি আটকাতে পারছেননা।উনি আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন।দু’দিন পর ওনার বড় খোকা ওনাকে সালাম করে সপরিবারে চলে গেলেন।নাতিরা দাদাকে রেখে যেতে চাইছিলইনা।ওরা জোর করে নিয়ে গেল।আফজাল সাহেব এই দুদিন ভেবে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।ওনার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি উনি দান করে দিয়েছেন।

শুধু এই বাড়ীটা তিন ছেলের বাচ্চাদের জন্য দাদা-দীদার উপহার হিসেবে উইল করে দিলেন,ছেলেদের কারোও নামে না।ওরা যখন বড় হবে তখনই পাবে,এ ব্যবস্থাও তিনি করে গেলেন।তারপর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে উনি কোথায় যেন চলে গেলেন।কেউ জানেনা,কেউ দেখেনি আর ওনাকে।একদিন নতুন বাড়ীতে ওরা নীল খামে ভরা একটা চিঠি পায়।দাদার চিঠি পেয়ে ওরা খুলে ফেলেছে।ওদের বাবা- মা’ বাইরে থেকে এসে দেখে ওদের বলে,কী করছো তোমরা? ওর খুশী হয়ে বলে,বাবা,’দাদার চিঠি’।এইমাত্র পেলাম,আসো,একসাথে পড়ি।

বড়খোকা বলল,বাবার চিঠি?চিঠিতে লেখা ছিল,” বড় খোকা,তোমার বাড়ী যে খুব ছোট তাও নয়,সেখানে আমার জন্য তোমার ড্রইংরুমেও আমার খাট রাখার জায়গা হলোনা।যাক আমার খোঁজ কখনও করতে এসোনা,তোমার মা’য়ের আত্মা কষ্ট পাবে,বাচ্চাদের ওদের মতো বড় হতে দিও,জটিলতা শিখিওনা।

লেখাঃ ***সৈয়দা সালমা খায়ের (শিবা)***

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/ ১৭.০৬.২০১৮/ রাত ৯.০০