২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১:২১

দুই পৃথিবী দুই পুরুষ

আমার স্ত্রী শয্যাসঙ্গী হিসেবে বড্ড বেশি শীতল। সে শুধু আমার ঘর সুন্দর করে সাজাতে জানে। কিন্তু বিছানার চিত্র যে কদর্য সেটা তার চোখে পড়ে না। আদর্শ ঘরনির রূপ দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত। কাঠের পুতুলে আর রুচি হয় না। একঘেয়ে জীবনে সুখ খুঁজি তাই। শরীরের আনন্দের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে চাই।’

জাহিদ রহমানের কথাগুলো শুনে মণিকা নামের মেয়েটি অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে হেসে উঠল। হাসিটা শুধু ঠোঁটেই নয়, সমস্ত শরীর দিয়ে হাসল যেন। এত আবেদন জাগাতে কী করে পারে এরা? চোখের চাহনি দেখলেও সমস্ত শরীর তীব্র কামনায় জ্বলতে থাকে। হাসতে হাসতেই মণিকা বলল, আমি আছি তো, আজ আর আপনার কোনো বাসনা অপূর্ণ থাকবে না…।
আহ, কণ্ঠে কী মাদকতা! এই মেয়ের মধ্যে ভেসে যেতে নয়, ডুবে যেতে হয়।
নিষিদ্ধ উন্মত্ততায় কেটে গেল অনেকটা সময়।

ভোরের আলো ফুটতে এখনো দেরি। এই সময়টায় কোনো রিকশা পাওয়া যায় না। ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছে সেতু। সজল নিশ্চয়ই এখনো জেগে অপেক্ষা করছে। সেতু বহুবার মানা করা সত্ত্বেও সে নিষেধ শোনে না। সারাটা রাত্তির না খেয়ে, না ঘুমিয়ে ওর প্রতীক্ষায় বসে থাকে। সেতু ফিরলে দুজনে একসঙ্গে বসে খায়।

আজ বাড়ি ফিরে সেতু অবাক হয়ে গেল। তাদের এক কামরার ছোট্ট ঘরটা কী সুন্দর করে সাজিয়েছে সজল। ঘিয়ে রঙের কতগুলো প্রদীপ জ্বলছে। মেঝেতে শুধুই রক্ত গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। আর দেয়ালে সজলের নিজ হাতে আঁকা সেতুর একটি পোর্ট্রেট। মাঝ বরাবর সজলের হাত যায়নি দেখে একেবারে নিচের দিকে লাগিয়েছে। তবু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। সজলের হাতে ছোট্ট একটি কেক।

হুইল চেয়ার টেনে সেতুর কাছে এল না সজল। যেখানে ছিল সেখান থেকে কেকটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, শুভ জন্মদিন সেতু।
সেতুর চোখে মুখে বিস্ময় আর আনন্দ খেলা করছে দেখতে পেয়ে সজল খুশি খুশি গলায় বলল কীরে, বেশি অবাক হয়ে গেলি নাকি? পাশের বাড়ির পলক কিন্তু অনেক হেল্প করেছে। পুরোটা আমার ক্রেডিট না। আর শোন, প্রদীপ আরও ফুল আনানোর পরে ভালো একটা কেকের টাকা জোগাড় করতে পারিনিরে। তাই কোনোরকমে নিজেই বানিয়েছি চুলোয়। একটু খেয়ে দেখ না কেমন হলো?

সেতুর চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সে তা লুকোনোর জন্য কপট রাগ দেখিয়ে প্রশ্ন করল, তুমি চুলোর কাছে কেন গিয়েছিলে? একদম ঠিক করোনি। যদি কোনো অঘটন ঘটে যেত?
আমার সঙ্গে যা অঘটন ঘটার সেতো কবেই ঘটে গিয়েছে রে। নতুন করে আর কিছু হবে না। তুই এত করিস এই সংসারটার জন্য, আমার জন্য। আর আমি আমি এতই অধম যে ভিক্ষা করেও তোকে খাওয়াতে পারি না। নিজের ওপর ধিক্কার আর গ্লানি ছাড়া কিছুই তো নেই। সামান্য এটুকুও যদি তোর জন্য করতে না পারি তো বেঁচে থেকে কী লাভ আমার?
আবার এসব কথা? তুমি কিন্তু প্রমিজ করেছিলে এই নিয়ে আর কোনো দিন কিছু বলবে না।
আচ্ছা ঠিক আছে ছাড় এসব, ছবিটা কেমন এঁকেছি বললি না তো!

নতুন করে কী বলব বলো? তোমার হাতের সৃষ্টি সব সময়েই পৃথিবীর সেরা। তোমার আঁকা ছবি দেখেই তোমার প্রেমে পড়েছিলাম ভুলে গেছ?
আহা তারপরে কতগুলো দিন পার হয়েছে এর মধ্যে জানিস? তোর এখনো আমার মতো পঙ্গু অকর্মণ্য মানুষের প্রতি প্রেমটা বেঁচে আছে কী করে তাই ভাবি।
খুব জোরে বাতাস বইছে দেখে সেতু পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। সজলের কথা শুনে পর্দা থেকে হাত সরিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, আমার মতো অশুচি, পাপী মেয়ের প্রতিই বা তোমার এত প্রেম কী করে বেঁচে আছে আমিও সেটা দিনরাত ভাবি। আমাকে তো তোমার ঘেন্না লাগার কথা। কেন লাগে না বলতে পার? আমাকে তালাক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার কথা, কেন দাও না বলতে পার? আমাকে দেখে বিতৃষ্ণার মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার কথা, কেন নাও না বলতে পার?

জীবনের সঙ্গে অবিরত যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হওয়া সেতুকে সজল ধাতস্থ হতে সময় দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, কাকে ঘেন্না করব? যে সারাক্ষণ নিজের ওপর অকথ্য অত্যাচার করছে শুধু আমার সঙ্গে থাকবে বলে, তাকে? যে প্রতিদিন সেতু থেকে মণিকা হয় শুধু আমার মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়ার জন্য, তাকে? যে তার নিজের জন্য একটি পয়সাও খরচ না করে তিল তিল করে টাকা জমায় শুধু আমার চিকিৎসার জন্য, তাকে? ত্যাগ আর কষ্ট ছাড়া যে মেয়েটা জীবনে কিছু করলই না, তার প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা ছাড়া কী করে অন্য কিছু আসবে বল? তুই তো সেই সেতু, যে কিশোরীবেলায় আমার হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলি, আমার দুর্ঘটনার জন্য কলেজের মাঝপথে তোকে পড়া ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তোর সংগ্রাম, তোর স্যাক্রিফাইস, তোর ভালোবাসার কাছে শরীর তো অতি তুচ্ছ একটা জিনিস রে। কতগুলো দানব শুধু তোর শরীরটাকেই ময়লা করতে পারবে, তোর ওই ঝকঝকে পরিষ্কার আর অসম্ভব সুন্দর মনটাকে তো কোনো দিন কলুষিত করতে পারবে না। সেই সাধ্য কারও নেই রে। আর সে আমি জানি দেখেই তোকে এত ভালোবাসি।

সেতু কিছু বলার আগেই হঠাৎ একটা দমক হাওয়া এসে প্রায় সবগুলো প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে গেল। অল্প যে দু-তিনটা জ্বলে থাকল তাদের স্বল্প আলো পুরো কামরাটিতে এক অদ্ভুত মায়াজাল সৃষ্টি করল। স্পষ্ট দেখা না গেলেও সজল বুঝতে পারল সেতুর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। সে গাঢ় স্বরে বলল, সেতু, চোখ মোছ। আজ তোর জন্মদিন, এদিনে কাঁদতে নেই…।

সেতু রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, না, মুছব না…কেন এত ভালোবাস তুমি আমায়?
পর্দার পাশে দাঁড়ানো ক্লান্ত অসহায় এই মেয়েটিকে এক চিলতে রহস্যময় আলোয় সেই মুহূর্তে কী অপূর্ব যে লাগল তা সে টেরও পেল না। সজল মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। হৃদয়ে এক সমুদ্র মমতা ধারণ করে রাখা ইন্দ্রানীর মতো দেখতে এই মানবী কখনো নোংরা হতে পারে? অসম্ভব! তার কাছে সেতু পৃথিবীর শুদ্ধতম নারী। গভীর ভালোবাসায় সে সেতুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আয় আমার কাছে, তোর হাতটা একটু ধরি…।
যাব না বলেও চোখ ভর্তি জল নিয়ে সেতু এগিয়ে গেল…সজলের ভালোবাসার হাত অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।

পরিশিষ্ট: সেতু জানে না আর কত দিন তাকে মণিকা সেজে নিজের শরীরের বলি চড়াতে হবে। সে শুধু জানে চরম যন্ত্রণার মুহূর্তে সজলের ভালোবাসা তাকে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। মণিকা জানে তাকে জাহিদ রহমানের মতো কিছু পুরুষের মনোরঞ্জন করতে হবে, আছে যারা শুধুমাত্র শারীরিক সুখদানের ত্রুটির জন্য স্ত্রীকে অসম্মান করে। আর সেতু বাড়ি ফিরে যাবে সেই পুরুষটির কাছে যে স্ত্রীর শরীরের থেকে মনের বিশুদ্ধতাকে বেশি সম্মান করে।

সারা বুশরা: বেডফোর্ড, ইংল্যান্ড।