১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ভোর ৫:৫৪

কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উপকৃত হচ্ছে মিলমালিকরা

নিউজ ডেস্কঃ  সরকারিভাবে কুষ্টিয়া জেলা থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন বোরো চাল কেনার সিদ্ধান্ত হলেও এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কোন ধান কেনা হচ্ছে না। এতে মিল মালিককরা লাভবান হলেও ঠকছেন কৃষকরা। তাই সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জেলার কৃষকরা। কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে চাল তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন মিলাররা। অথচ ধানের বাম্পার ফলনের পরও আশানরূপ মূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষকরা।

কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় বোরো ধানের ব্যাপক ফলন হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদও বেশি হয়েছিল। তাই ঝড়, বৃষ্টির পরও ফলন হযেছে আশাতীত। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলে তারা লাভবান হতে পারত। অথচ ফড়িয়া, দালাল ও মিলারদের কারনে ভাল দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। অনেক কৃষক লোকসানে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন।

কৃষি অফিস জানিয়েছে,‘ জেলায় গত বছরের তুলনায় ধান আবাদ এ বছর বেশি হয়েছে। সদর উপজেলায় আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৫ে৬০ হেক্টর। আর জেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে। এ থেকে ধান উৎপাদন হওয়ার আশা রয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার মেট্রিক টন।

জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৬ সালে বোরো ও আমন মৌসুমে ধান কেনা হয় কুষ্টিয়া জেলা থেকে। সে বছর জেলা থেকে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন ধান কেনা হয়েছিল। ২৬ টাকা কেজিতে ধান বিক্রি করতে পেরেছিল কৃষকরা।

তবে সে সময় দালালদের দৌরাত্মসহ নানা কারনে কৃষকরা সরাসরি ধান দেয়া করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েন। এ সুযোগ নেন সেসময় স্থানীয় চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ীরা। তারপরও সরকার ধান কেনায় ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে ধান কিনে আনেন।

সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা (কারিগরি) একেএম শাহ নেওয়াজ জানান,‘ চলতি বছর জেলা থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন চাল কিনবে। তবে জেলায় এখন পর্যন্ত ধানের কোন বরাদ্দ দেয়া হয়নি।’

জানা গেছে, মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশ থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত হলেও তা জেলায় জেলায় বিভাজন করা হয়নি। এ কারনে ধান কেনার কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যান্য বছর একই সাথে চাল ও ধান কেনা শুরু হতো। তবে এ বছর এখন পর্যন্ত শুধু ধান চাল কেনা হবে। পরে ধান কেনা হবে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

জেলার সব চেয়ে বড় ধানের বাজার আইলচারা ও উজানগ্রাম বর্তমানে মোটা জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়। আর চিকন জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকায়। সরকার এ বছর ধান কেনার জন্য দর নির্ধারণ করেছে ২৮ টাকা কেজি। সেই হিসেবে প্রতিমণ ধানের দর দাড়াচ্ছে ১ হাজার ১২০ টাকা।

উজানগ্রাম এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান,‘ বর্তমানে এক বিঘা ধান কাটতেই খরচ হচ্ছে ৩ হাজার টাকার বেশি। ধান কেটে মাড়াই ও বস্তা বোঝায় করতে আরো খরচ আছে। এ বছর পানি ও সারের খরচও বেশি হয়েছে। তাতে বাজারে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মনে। এতে লাভ হচ্ছে না। কোন রকমে উৎপাদন খরচ উঠছে।’

আব্দালপুর গ্রামের কৃষক খলিল বিশ্বাস বলেন,‘ তিনি এ বছর প্রায় ৪ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। ফলনও সব মিলিয়ে ভাল হয়েছে। তবে গত বছরের থেকে এ বছর ধানের দাম অনেক কম। তাই যে লাভের আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক কম লাভ হচ্ছে। সরকারি গোডাউনে ধান দিলে কিছু লাভ হতো। তবে সময়মতো ধান না কেনায় হতাশ কৃষকরা।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগরে প্রায় সাড়ে ৩০০ মিল রয়েছে। এর মধ্যে সয়ংক্রিয় চাল প্রস্তুত কল রয়েছে ৩২টির মত। গত বছর এ সময়ে চড়া দামে ধান কিনলেও এ বছর বেশ সস্তায় ধান কিনছেন মিলাররা। মিল মালিকরা সারা দেশে তাদের এজেন্ট ও দালালদের মাধ্যমে সস্তায় ধান কিনে গোডাউন জাত করছেন। পরে এ ধান থেকে চাল তৈরি করেই চড়া দামে বিক্রি করেন তারা।

খাজানগর এলাকার একাধিক মিল মালিকের সাথে কথা হলে জানান,‘ ধানের ফলন বেশি হওয়ায় এ বছর এখন পর্যন্ত বাজার স্বাভাবিক। ৮০০ টাকার মধ্যে ধান পাওয়া যাচ্ছে। এসব ধান কিনে তারা চাল তৈরি করে বিক্রি করছেন। চালের বাজারও গত বছরের তুলনায় কম বলে জানান তারা।

এ বছর সরকার কুষ্টিয়া থেকে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন চাল কিনছে। চালের দাম নির্ধারণ করেছে কেজি প্রতি ৩৮ টাকা। এতে প্রতি মণ মোটা চাল মিলাররা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারছে ১ হাজার ৫২০ টাকায়। বর্তমানে ধানের যে বাজার চলছে তাতে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে প্রস্তুত করে সরকারি গোডাউনে সরবরাহ করে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারবেন মিলাররা। জেলা খাদ্য অফিসের কর্মকর্তারাও জানিয়েছে, এ বছর মিল মালিকরা ভাল লাভ করতে পারবেন। তবে কৃষকরা তেমন দাম পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তারা।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন,‘ সরকারি গোডাউনে হাইব্রীড যে মোটা জাতের চাল মিলাররা সরবরাহ করবে সেই ধান তারা কিনছেন ৭৯০টাকা মনে। গাড়ি খরচ দিয়ে তাদের মিলে এসে দাম পড়ছে ৮১২ টাকা। এই দামে ধান কিনেও তারা চাল দিয়ে লাভ করতে পারবেন।’

কিউএনবি/নিল/ ২২ মে/১৪ঃ৩৪