২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৩৩

অস্কার বিজয়ী কিংবদন্তি চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ীকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র

 

মিয়া মোহাম্মদ ছিদ্দিক, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ছায়া-সুনিবিড় ছোট গ্রাম মসুয়ায় বিশ্ববরেণ্য অস্কার বিজয়ী চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়ীকে গিরে গড়ে ঊঠতে পারে মনোরম নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র।

এই ঐতিহাসিক বাড়ীটির পূর্বে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট, পশ্চিমে কয়েক একর জায়গা জুড়ে বাড়ীটি, পূর্বে প্রাচীর ও সিংহ দরজা ছিল যা এখন নেই। পশ্চিমে জরাজীর্ণ ভবন, যা এখন ভূমি অফিস। তার একটু পশ্চিমে গেলেই ডাকঘর। বাড়ীর ভিতরে রয়েছে কারুকার্য খচিত প্রাচীন দালান, বাগানবাড়ী, হাতীর পুকুর, খেলার মাঠ ইত্যাদি।

সত্যজিৎ রায়ের পিতামহের তৃতিবিজড়িত বাড়ীটি এখন সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে।বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্দোগে ২০১২ সালে ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি রেস্ট হাউজসহ বাড়ির সীমানা প্রাচীর ও রাস্থাঘাট সংস্কার করা হয়।

এই বাড়ীতে ১৮৬০ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী।তিনি ছিলেন বিখ্যাত শিশু কিশোর পত্রিকা ‘সন্দেশের’ (১৯১৩) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাঁর বাবার নাম ছিল কালীনাথ রায়।পাঁচ বছর বয়সে নিঃসন্তান চাচা হরি কিশোর রায় চৌধুরী তাঁকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। পিতার দেয়া কামদারঞ্জন রায় নাম বদলিয়ে রাখেন উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী।

কিন্ত দত্তক পুত্র গ্রহণের বেশ ক‘বছর পর হরি কিশোর রায় চৌধুরী ঔরসে নরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী জন্মগ্রহণ করায় দত্তক পুত্র উপেন্দ্র কিশোরের গুরুত্ব কমতে থাকে। হরি কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন জমিদার। তাঁর স্নেহে লালিত উপেন্দ্র কিশোর ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে ১৮৮০ সালে প্রবেশিকা এবং কলকাতা মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট থেকে বি এ পাস করেন।

এদিকে হরি কিশোর রায় চৌধুরী ভবিষ্যতে সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে ঔরসজাত পুত্র ও দত্তক পুত্রের মাঝে যাতে কোন সংঘাত না বাধে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।এজন্য বাড়ীর চার দেয়ালের বাইরে নকশা করে লোহার খুঁটি দিয়ে দত্তক পুত্রের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বাড়ীর সীমানা নির্ধারণ করে নেন।

লোহার খুঁটিগুলো আজও রয়েছে। সীমানা নির্ধারিত বাড়ীতে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর উরসে ১৮৮৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন জ্যেষ্ঠ পুত্র সত্যজিৎ রায়ের পিতা শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়।জন্মের পরই সুকুমার রায়সহ উপেন্দ্র কিশোর চলে যান কলকাতায়।মাঝে মাঝে নিজ বাড়ীতে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে আসতেন তিনি।তাঁর মেজো মেয়ে পুণ্যলতার অনেক সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছোট বেলার দিনগুলোতে সেকালের মসুয়ার বর্ণাঢ্য রায় চৌধুরীর পরিবারের বিবরণী রয়েছে।

হরি কিশোর রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী মসুয়ায় জমিদারী লাভ করেন। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী হয়ে পড়েন কলকাতা কেন্দ্রিক। নাতি সত্যজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতাতেই এবং বেড়ে ওঠা সবই হয়েছে কলকাতায়। মসুয়া গ্রামের ভাঙ্গা-চোরা সত্যজিৎ রায়ের এই পৈতৃক বাড়ীটি দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। বহু জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। সত্যজিৎ রায় কোনদিনই এখানে আসেননি। সবাই জানে এটি সত্যজিৎ রায়ের বাড়ী।

এ অঞ্চলের মানুষ মনেপ্রাণে এখনও ধরে রেখেছেন সেই বিশ্ববরেণ্য অস্কার বিজয়ী চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়ীটি। একদা এ বাড়ীকে বলা হতো ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার এ ঐতিহাসিক বাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী মেলা। মসুয়া গ্রামে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের স্মৃতি চিহ্নটুকু ধরে রাখার জন্য গঠিত হয়েছে সত্যজিৎ রায় স্মৃতি সংসদ।

প্রতি বছর ৫ই মে পালন করা হয় সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিবস। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী সাহিত্যিক-কবি বাড়ীটি পরিদর্শনে আসেন। তাছারা গ্রামের শ্যামল- সবুজ ছায়া ঘেরা শান্ত পরিবেশের দুর্নিবার আকর্ষণ তো রয়েছেই।এলাকাকাসী ও আগত দর্শনার্থীরা বলেন, সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ নজর দিলে ঐতিহাসিক এই বাড়ী টিকে গিরে গড়ে ঊঠতে পারে মনোরম নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র।

কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব আইন উদ্দিন বলেন,এ বাড়িটি কটিয়াদীবাসির গর্ব। সত্যজিৎ রায়ের এই পৈতৃক বাড়ীটি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংস্কার করায় সাধুবাদ জানাই।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/১৩ই মে, ২০১৮ ইং/সন্ধ্যা ৬:৫৭