২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৪৩

এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত

 

সাহিত্যঃ এটা একটা প্রেমের গল্প হয়ে উঠলেও হতে পারত, যদি না শহরের এপাড়া–ওপাড়া থেকে বলা নেই কওয়া নেই একজন দুজন করে হঠাৎ হারিয়ে যেতে শুরু না করত। এটা একটা মিষ্টি অভিমানী গল্পও হয়ে উঠতে পারত, যদি জোনাথন গোমেজ ওরফে জন অনেক দিন বাদে ফিরে এসে বেশ কিছুদিন চুপ করে থেকে তারপর বলে উঠতেন যে তিনি রাগ করে, প্রিয়জনদের ওপর অভিমান করেই বাড়ি ছেড়েছিলেন, এর পেছনে আর কারও হাত ছিল না। তারপর যে মানুষটির ওপর রাগ, বা অভিমান, বা না বলা ক্ষোভ, ‘দেখো আমি না থাকলে কেমন লাগে’–মার্কা সস্তা নাটকীয়তা, সেই মানুষটি দুই হাতে প্রবলভাবে সমস্ত শক্তি দিয়ে বাকি জীবনটা আঁকড়ে ধরে রেখে বলত, আর কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না তুমি, কথা দাও, ঈশ্বরের দিব্যি, আল্লার কসম…আর এইভাবে মধুরেণ সমাপয়েৎ হতে পারত গোটা ঘটনাটার। কিন্তু হৃদিতা আর জনের গল্পটা এত সরল ছিল না।

হৃদিতার সঙ্গে জনের পরিচয়ের দিনটাও ছিল ভারি অদ্ভুত। তার আগের সমস্ত রাত আর সারাটা সকাল ধরে শহরে বৃষ্টি হচ্ছিল ঝরনাধারার মতো। গোটা আকাশ এমন ঝমঝম করে বাজছিল যেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সেতার বাজছে। এ রকম বৃষ্টি হলে হৃদিতার খালি মনে পড়ে যায় সেই একটা কবিতা, একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল আমাদের ইস্টিশনে…। কবিতাটা পড়লে তার মন কেমন করে উঠত, সব সময়। কিন্তু এই শহরে কি আর বৃষ্টি বাদলা নিয়ে রোমান্টিকতার সুযোগ আছে মানুষের? বেলা না বাড়তে শহরের বড় বড় রাস্তাঘাট রোড ডিভাইডার আর ফুটপাতসুদ্ধ গেল ডুবে, এখানে-ওখানে গাছের গুঁড়ির মতো মুখ থুবড়ে পড়ে রইল বিকল টেম্পো-সিএনজি আর দু-একটা প্রাইভেট কার। নোংরা কালো থিকথিকে আবর্জনা ভাসতে থাকা পানিতে প্যান্ট গুটিয়ে জুতা হাতে হাত উঁচু করে অফিস–চলতি লোকেরা নগরপিতাকে শাপশাপান্ত করতে করতে চলল। আর গলির মুখে দাঁড়িয়ে একটা রিকশাওয়ালাকেও লালমাটিয়া যেতে রাজি করাতে না পেরে হৃদিতার তখন মাথার চুল ছেঁড়ার দশা, কেন যে টুকটুকিকে আজ স্কুলে যেতে দিল সে! ছুটির সময় পেরিয়ে গেছে আরও আধঘণ্টা আগে। আহা, মেয়েটা বোধ হয় মার পথ চেয়ে চেয়ে চোখের জল ফেলছে, এই বৃষ্টির মতো। এরই মধ্যে দু-দুবার স্কুলে ফোনও করে ফেলেছে হৃদিতা। ক্লাস টিচার আশ্বস্ত করেছেন, বাচ্চারা সব ভালোই আছে, আর সব অভিভাবকেরই দেরি হচ্ছে আজ, কী আর করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তবে যত দ্রুত সম্ভব অভিভাবকেরা এসে নিয়ে গেলেই ভালো হয়, কেননা স্কুলের কর্মচারীদেরও তো বাড়ি ফিরতে হবে, নাকি? শেষমেশ হৃদিতা শুচিবাই না করে এই নোংরা পানিতেই নেমে হাঁটা দিল। সালোয়ারের প্রায় হাঁটু অব্দি গেল ভিজে, ওড়নাটা দুই হাতে মুঠো করে বুকের কাছে ধরে, পার্স আর সেলফোনটাকে কোনোমতে বাঁচিয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে পানি ঠেলে এগোতে চেষ্টা করল সে। এরই মাঝে ভস করে পাশ দিয়ে যাওয়া একটা গাড়ি পানি ছিটিয়ে সবাইকে ভিজিয়ে দিল, আর পথচারীরা সমস্বরে গালাগাল করে উঠল যাত্রীকে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্কুল থেকে ফোন। টুকটুকি নিশ্চয় গলা ছেড়ে কাঁদছে! হৃদিতা অনেক কসরত করে ধরল ফোনটা। ওপাশে ক্লাস টিচার নয়, একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘আমি ক্রিসের বাবা বলছি।’

ক্রিস টুকটুকির ক্লাসে পড়ে। হৃদিতা চেনে ওকে। ‘কী হয়েছে টুকটুকির?’ উদ্বেগ, সংশয়, আতঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করে হৃদিতা।

: আপনার মেয়েটি খুব কাঁদছে। আপনি কত দূর?

হৃদিতার কান্না পেয়ে যায়, ‘আমি, আমি এখনো বাড়ি থেকেই বেশি দূর যেতে পারিনি। রিকশা-টিকশা কিচ্ছু পাচ্ছি না। টুকটুকিকে একটু দেবেন, প্লিজ?’

ওপাশের লোকটি এবার বলে, ‘দিচ্ছি। তবে আমি ওকে পৌঁছে দিতে পারি। যদি আপনি বলেন। আমিও ধানমন্ডির দিকেই যাব।’

হৃদিতা ইতস্তত করে। অপরিচিত লোকটিকে বিশ্বাস করা যায় কি না ভাবে। যত ছোটই হোক, টুকটুকি মেয়েই তো। আর এই শহরে ছয় বছরের মেয়েশিশুও যে নিরাপদ নয়, তা সব মা জানে। হৃদিতার সংশয় টের পেয়ে এবার লোকটি বলে, ‘আপনি তাহলে ওর সাথে কথা বলেন। বলেন ক্রিসকে যেন সে যেতে দেয়। ও ক্রিসের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।’

হৃদিতা মন ঠিক করে ফেলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আরও দুই ঘণ্টায়ও সে স্কুলে পৌঁছাতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে লোকটির সাহায্য নেওয়া ছাড়া গতি নেই। এভাবে প্রথম পরিচয়ের দিনই হৃদিতা জনের ওপর আস্থা রাখে। বহুদিন পর তার মনে হয় যে পৃথিবীতে এমন কেউ আছে, যার ওপর সে আস্থা রাখতে পারে। ভেবে তার ভালো লাগে, অস্বস্তিও হয়। আর এই ভালো লাগা ও অস্বস্তি—দুই-ই পরবর্তী দিনগুলোতে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। বহুদিন একা থাকা হৃদিতা ধীরে ধীরে ভাবতে থাকে, জগতে নিজের কেউ একজন থাকাটা মন্দ নয়। এতে জীবন অনেকটাই নির্ভার হয়।

যা হোক, সেদিন জন ক্রিস আর টুকটুকিকে নিয়ে বহু কষ্টে সমুদ্র সমান পানি পেরিয়ে লালমাটিয়া থেকে ধানমন্ডি পৌঁছেছিল। আপাদমস্তক ভেজা হৃদিতা অশ্রুসিক্ত হয়ে বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছিল জনকে। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে এক কাপ চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেও ভুলে গিয়েছিল সে। তবে এরপর থেকে, যতবারই স্কুল গেটে দেখা হয়েছে, ততবারই হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে কথা বলেছে তারা। তারপর ধীরে ধীরে হৃদ্যতা বেড়েছে। টুকটুকির জন্মদিনে ক্রিস আর জনও আমন্ত্রিত হয়েছে পিৎজার দোকানে। প্লে-কর্নারে বাচ্চারা ব্যস্ত হয়ে পড়লে পরস্পরের জীবন সম্পর্কে জানতে চেয়েছে তারা। ক্রিসের মা ছিলেন জার্মান। জার্মানিতেই জনের সঙ্গে পরিচয় ও বিয়ে। বাংলাদেশে এসে সন্তান হয় তাদের। তারপর ক্রিসের মা কঠিন অসুখে পড়েন। নন হজকিন্স লিমফোমা। এক বছর ভীষণ ভোগান্তির শেষে মৃত্যু হয় তার। হৃদিতাও তার গল্প বলে। অল্প বয়সে ঝোঁকের মাথায় আরিফের সঙ্গে বিয়ে, বিয়ের এক বছরের মাথায় টুকটুকির জন্ম, তারপর আরিফের বেকারত্ব, বদলে যাওয়া, মাদকাসক্তি, ডিভোর্স, বাড়ির অমতে বিয়ে ছিল বলে হৃদিতার জিদ করে বাবা–মার কাছে না ফেরা, আর মেয়েকে নিয়ে ঢাকা শহরে সিঙ্গল মাদারের জীবনযাপনের খুঁটিনাটি—কোনো কিছুই বাদ পড়ে না। তারপর থেকে তারা সময় পেলে ফোনে খুদে বার্তা পাঠাতে শুরু করে, রাতে ঘুম না এলে ফেসবুকে চ্যাট করে, ছুটির দিনে নিজেদের বাচ্চাদের আনন্দ দেওয়ার ছুতোয় আশপাশে কোথাও ঘুরতে যায়, আর এভাবেই একটা প্রেমের গল্প ডালপালা মেলতে শুরু করে এই নিষ্ঠুর শহরে, নির্দয় এক সময়ে।

এটা সেই সময়ের গল্প, যখন আপনি পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাবেন দুনিয়ার নানা দিকে পলায়নরত সন্ত্রস্ত দেশান্তরি মানুষের মুখ, যখন আমেরিকা আবার ‘গ্রেট’ হওয়ার সংকল্পে স্থির, যখন গরু আর শূকরের ভোজ্যতা নিয়ে বাদানুবাদে মানুষ মরছে অকারণে, যখন শিশুকে আগুনে ছুড়ে ফেলে মায়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে কোথাও কিংবা চলন্ত বাস থেকে লাঞ্ছিতা তরুণীকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে শালবনে, আত্মজাকে হত্যা করতে বুক কাঁপছে না পিতার। কী আশ্চর্য ব্যাপার যে তখনো প্রেমের গল্প লেখার ফরমাশ আসে সম্পাদকদের কাছ থেকে, এরপরও আমরা প্রেমের গল্প লিখে ফেলতে চাই জন বা হৃদিতাকে নিয়ে, আর এই অদ্ভুত শহরে বসবাসরত একাকী আর দুঃখী দুজন মানুষের প্রেমের গল্পের মধুর পরিণতির দিকে আগ্রহ আর আশা নিয়ে চেয়ে থাকি। সে রকম এক সময়ে, একদিন, এই শহরে, বর্ষা অতিক্রান্ত হওয়ার অনেক দিন পর, পদার্থবিদ্যার শিক্ষক জোনাথন গোমেজ বড়দিনের ছুটি শুরু হওয়ার দিন তার মা হারা ছয় বছরের সন্তান ক্রিসকে বলেন, ‘আমরা যদি এই ছুটিতে টুকটুকিদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাই, কক্সবাজার বা সিলেট, কেমন হয় বলো তো?’

ছেলেটা এই প্রস্তাবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। টুকটুকি তার স্কুলের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’, আর বাবাও যে টুকটুকির মায়ের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হয়ে উঠছেন, তা সে বেশ বুঝতে পারে; তাহলে বেস্ট ফ্রেন্ডরা মিলে এবারের ছুটিটা দারুণ কাটবে। সে তক্ষুনি টুকুটকিকে ফোনে খবরটা জানাতে চায়, কিন্তু বাবা তাকে নিষেধ করেন এখন জানাতে। বলেন, ‘সন্ধ্যায় আমরা কেক আর চকলেট নিয়ে ওদের বাড়ি যাব, কেমন? তখনই না হয় সব প্ল্যান হবে।’ এই বলে জোনাথন গোমেজ কেক আর চকলেট কিনতে বেরিয়ে যান। সেই যে যান, আর ফেরেন না। এই অদ্ভুত শহরে বলা নেই কওয়া নেই তিনিও হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যান।

পরবর্তী কয়েক দিন বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে বসে হৃদিতার বারবার সেই নারীটির কথা মনে হতে থাকে, যার শিশুকে আগুনে ছুড়ে ফেলে তাকে সবার সামনে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছিল।

‘মিস্টার গোমেজের সাথে রাত দেড়টায় আপনার কি কথা হয়েছিল? আপনার মেয়ের বাবা কে? মিস্টার গোমেজের ছেলের মা কোথায়? আপনার সঙ্গে এই খ্রিষ্টান পরিবারের সম্পর্ক কী? আপনারা একসঙ্গে সিলেটের ট্রেনের টিকিট করেছেন কেন? আপনি কি ধর্মান্তরিত হয়েছেন? আপনার কি মনে হয় এটা কোনো ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর কাজ? গোমেজকে কি কেউ হুমকি দিয়েছিল? তার সঙ্গে কি আপনার ফিজিক্যাল রিলেশন আছে? আপনার সাবেক স্বামী বা আপনার পরিবার কি কোনোভাবে জড়িত? আপনার ডিভোর্স কেন হয়েছিল? গোমেজ কি আপনার সন্তানের বাবা? আপনি কি তার রক্ষিতা…?’

ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্নের জবাব দেওয়া শেষ হলে হৃদিতা বিধ্বস্ত, ত্রস্ত, বিপর্যস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে দেখে দুটি ভয়ার্ত শিশু গুটিসুটি মেরে সোফায় বসে আছে। হৃদিতার শত অনুরোধ সত্ত্বেও ক্রিসকে পুলিশ তাদের কাস্টডিতে নিয়ে যায়। পুলিশ তাঁর ল্যাপটপ, সেলফোন আর বাড়িঘর তছনছ করে বইপত্র খাতা কাগজও নিয়ে যায়। দুজন সাংবাদিক নাছোড়বান্দার মতো তার ফ্ল্যাটের নিচে বসে থাকে, দিনের পর দিন। সিআইডি অফিসার বলেন যে পুলিশের অনুমতি ছাড়া হৃদিতা যেন শহর ছেড়ে কোথাও না যায়। হৃদিতার অফিসেও সবাই তাকে দেখলেই কেমন হঠাৎ চুপ করে গিয়ে কাজকর্মে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে শুরু করে। আর টুকটুকিকে স্কুল পরিবর্তন করে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় সে, কারণ স্কুলের সামনের অভিভাবকেরা এমন দৃষ্টিতে তাকাতে থাকে যেন সে পার্কের পতিতা। তারপর সপ্তাহ কেটে যায়, মাসও যায়। পুলিশ ও সাংবাদিকদের তৎপরতা একসময় কমে আসে। এই শহরে আরও নতুন নতুন মানুষ নিয়মিতভাবে নিখোঁজ হতে থাকে। আরও কোনো নতুন নারী ধর্ষিত হয়। আরও কত নতুন শিশু গৃহহারা হয়, আরও কত পরিবার পানিতে ভেসে পায়ে হেঁটে দেশান্তরি অভিবাসী হয়। বছর ঘুরে আবার বর্ষা আসে। আবারও ইস্টিশনের ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি নামে শহরে। আবারও পথঘাট ডুবে যায়, আবারও স্কুলে আটকা পড়ে শিশুরা আর এবারও নগরপিতাকে গালাগাল করে মানুষ। কিন্তু হৃদিতার গল্পটা অসমাপ্ত থেকে যায়। গল্পের শেষটা দেখার আশাও পূরণ হয় না আমাদের। যে গল্পটা একটা প্রেমের গল্প হলেও হতে পারত।

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/ ১০.০৫.১৮/ রাত ৮.১০