২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:৫৫

‘ব্রিকলেন ৭৮’ বিলেতে বাঙালির জয়যাত্রা

 

মঞ্চের আলো আঁধারির খেলায় তখন মিছিল, স্লোগান, ভাঙচুর, পরবর্তী আন্দোলনের পরিকল্পনা, কুশীলবরা, দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক ৪০ বছর আগে। আর মঞ্চের ঠিক সামনে বসে আছেন সেদিনের অধিকার আন্দোলনের নায়করা।চমক, ফারুক, ক্যাথরিনসহ অনেকেই, বয়সের ভারে ন্যুব্জ অনেকটাই, কিন্তু কুশীলবদের সঙ্গে যেন নিজেরাই মঞ্চ দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের চোখেমুখে ছিল সেই অভিব্যক্তি।লন্ডনের মঞ্চে ফিরে এসেছিল ৪০ বছর আগের সেই ব্রিকলেন। আলতাব আলী হত্যার ৪০ বছর স্মরণে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যেগে পালিত হয় আলতাব আলী দিবস। মুরাদ খানের রচনায় ব্রাডি আর্ট সেন্টারে মঞ্চায়িত হলো নাটক ‘ব্রিকলেন ৭৮’ নির্দেশনায় ছিলেন সুদীপ চক্রবর্তী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সুদীপ চক্রবর্তী লন্ডনে কমনওয়েলথ স্কলারশিপে নাটক নিয়ে পিএইচডি করছেন। সুদীপ তাঁর মঞ্চ পরিকল্পনায় এবং আলোকসজ্জায় দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। মঞ্চে শুধুমাত্র কয়েকটি খাটের বাক্স বারবার বদলে দিচ্ছে দৃশ্যায়ন। কখনো দোকান, কখনো ড্রয়িংরুম, কখনো গলির দেয়াল, কিংবা আলতাব আলীর কফিন।আলতাব আলী হত্যার পর কফিন ছেড়ে ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে যখন আলতাব আলী হারিয়ে যায় সেই দৃশ্যটি ছিল অসাধরণ। মনে হচ্ছিল সত্যি যেন কেউ মিশে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে অসীম শূন্যতায় অথবা অন্ধকারে। হু হু করে উঠে দর্শকের বুক।

দেয়ালে দেয়ালে লেখা ‘পাকি বাস্টার্ড’ কোথাও লেখা ‘গো ব্যাক হোম’ দোকানে দোকানে বর্ণবাদী হামলা, রাস্তায় হামলা, কাজ থেকে ঘরে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা, এমনি এক কঠিন সময় ছিল ৮০-এর দশকের লন্ডনের বাঙালিদের। ‘শহীদ আলতাব আলীর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে, কঠিন সেই সময়কে অতিক্রম করেছিল ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা।ঘর থেকে বের হলেই বর্ণবাদীদের আক্রমণ, গালিগালাজ শুনতে হতো প্রতিনিয়ত। সবারই ধারণা ছিল একদিন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার। ব্রিটেন তাদের দেশ নয়। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ড বদলে দেয় সবকিছু। বাঙালি ঘুরে দাঁড়ায়। প্রতিবাদমুখর হয়। অবতীর্ণ হয় নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। বিশেষ করে সেই সময়ের তরুণরাই নিজেদেরকে ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

আলতাব আলী ভাগ্য বদলাতে এসেছিলেন স্বপ্নের বিলেতে। সেদিন কাজ থেকে ঘরে ফেরার পথে ব্রিকলেনের এডলার স্ট্রিটে নির্মমভাবে বর্ণবাদীদের হামলায় নিহত হয়েছিলেন। মাত্র ২৫ বছরের নিরপরাধ তরুণ আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ডে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকে এক মোহনায় মিলিত করে।১৯৭৮ সালের ৪ মে, সেদিনও ছিল ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের নির্বাচন নিয়ে তখনো এতো উৎসাহ ছিল না। ব্রিটেন তখনো তাদের দেশ হয়ে উঠেনি। কিন্তু আলতাব আলী হত্যার পর, তারা আর ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করেনি। অভিবাসী পরিচয় থেকে ব্রিটিশ বাংলাদেশি হয়ে উঠে। নিজেদের আত্মপরিচয় নিয়ে ব্রিটেনেই শুরু হয় তাদের নতুন পথচলা। লেখা হয় জয়যাত্রা।

নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী বলেন,’মৃত্যু অর্থ পরাজয় নয়। কখনো একটি মৃত্যু অগণিত জীবনের মুক্তির পথ খুলে দেয়।’নাট্য সৃজনের সময় আমার মানসপটে বারবার রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-এর রঞ্জন চরিত্রের রূপ ধরা দেয় ‘ব্রিকলেন ৭৮’-এর আলতাব আলী চরিত্রে। জীবন ও শিল্প একীভূত হয় এখানে। যে চরিত্র শারীরিক উপস্থিতি নয়, চেতনা দিয়ে মুক্তির বার্তা পৌঁছে বেড়ায়। সবার অংশগ্রহণে ‘ঘৃণা নয়, বন্ধু’ বার্তা আবারো দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বব্যাপী ডানপন্থার উত্থান প্রতিরোধে।জমিরের স্ত্রীর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করছেন প্রতিভা, যেন নিজের বড় বোন, ভাবির মতো। আলতাব আলীর মায়ের হাতের ডিম ভুনা খাওয়ার ব্যাকুলতা তাকেও ব্যাকুল করে তোলে। আলতাবের জন্য ডিম ভুনার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ফিরে আসে আলতাবের লাশ।

বাঙালি নারী যে প্রয়োজনে কতোটা কঠোর হতে পারে সেই বীরত্বের দিকটিও নিয়ে এসেছেন নাট্যকার মুরাদ খান। বাংলাদেশ থেকে সদ্য ব্রিটেনে আসা ঘরের বধূটিও আলতাব হত্যার পর প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তার অনাগত সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি রেখে যাওয়ার জন্য। স্বামী জমির আলী যখন বলছিলেন ‘তুমি কি আন্দোলন করবে?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন আর কিছু না পারি শাড়িটা ঝুলিয়ে দেব আমার প্রতিবাদ হিসেবে।যুদ্ধ, মৃত্যু- এসব যেমন সত্যি, তেমনি শ্বাশত সুন্দর মানুষের প্রেম। একদিকে চলছে বর্ণবাদী আন্দোলন এর মাঝেই বাঙালি ললনা সালেহার প্রেমে পড়ে যায় বর্ণবাদী এক যুবক।

আলতাব আলীর চরিত্রে রাজিব জেবিতিককে বহুদিন মনে রাখবে দর্শক। পুরো নাটকটি ছিল ইংরেজি ভাষায়। কিন্তু কৃষক পরিবার থেকে আসা আলতাব আলীর মুখে নির্ভুল ইংরেজি বলা একটু খটকা লাগে। দোকানি চরিত্রে মুরাদ খান যেমন দেশি লুডু খেলায় ‘আয় আয় ছক্কা’ কিংবা একটু বাঙালি উচ্চারণে কাট কাট ইংরেজি বলেছেন যা সেই সময়ের মানুষের ইংরেজি কথোপকথনের সঙ্গে সুন্দর সমন্বয় করে। তরুণদের আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণের ভূমিকাটা আরেকটু বেশি রাখার সুযোগ ছিল। নাট্যকার হয়তো চরিত্র সংখ্যা সীমিত রাখার কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।নাটকে আরো যারা অভিনয় করেছেন অনিল মিত্তো, রনিকা সৈয়দ, টম হেড্রিক, সিমন উইলিয়ামসন। সংগীতে পবন চাঁদ, সেট ডিজাইনে ছিলেন, জায়েদ খান ও আবু হায়দার চৌধুরী।

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/ ০৯.০৫.১৮/ দুপুর ১.৫৬