১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:২৪

কেলেঙ্কারিতে সাহিত্যের নোবেল

নিউজ ডেস্কঃ  চলতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে না। যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ তদন্ত নিয়ে বেকায়দায় পড়া সুইডিশ একাডেমি গতকাল শুক্রবার এ ঘোষণা দিয়েছে। একাডেমি জানিয়েছে, ২০১৮ সালের পুরস্কারটি ২০১৯ সালের পুরস্কারের সঙ্গে একসঙ্গে দেওয়া হবে। অর্থাৎ আগামী বছর একসঙ্গে দুটি পুরস্কার দেওয়া হবে।

নারীঘটিত যৌন কেলেঙ্কারির বেশ কিছু অভিযোগকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কমিটির দায়িত্বে থাকা দ্য সুইডিশ একাডেমির ভেতর উত্তেজনা ও অসন্তোষের ঝড় বইছিল। একাডেমির তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন একাডেমির নারী সদস্য ক্যাথরিন ফ্রোস্তেনসনের স্বামী ফ্রান্সের আলোকচিত্রশিল্পী জঁ ক্লদ আরনল্ট। গত বছরের নভেম্বরে ‘মি টু’ ক্যাম্পেইনের অনুসারী ১৮ জন নারী আরনল্টের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনে। ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি এসব যৌন নিপীড়ন চালান। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক মাত্রায় উত্তেজনা ও সমালোচনা শুরু হয়।

এ অভিযোগের ভিত্তিতে আরনল্টের স্ত্রী ক্যাথরিন ফ্রোস্তেনসনকে নোবেল কমিটি থেকে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। কিন্তু এই দাবি সুইডিশ একাডেমির সভায় নাকচ হয়ে যায়। এর জের ধরে ১৮ সদস্যের কমিটি থেকে সম্প্রতি ক্যাথরিনের পাশাপাশি একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি দানিয়ুসসহ মোট চারজন পদত্যাগ করেন। ফলে একাডেমিতে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোরাম সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত ভোট না থাকায় বিষয়টি নিয়ে বেশ জটিলতায় পড়ে একাডেমি। চলতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করতে গত বৃহস্পতিবার একাডেমির ১০ সক্রিয় সদস্য বৈঠকে বসেন।

  বৈঠকের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মতে গতকাল সুইডিশ একাডেমির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিটির সদস্য কমে আসায় এবং জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাছাইয়ের কাজ অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছিল। এ বছরের চলমান বাছাই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে আগামী বছর একসঙ্গে দুটি অর্থাত্ ২০১৮ ও ২০১৯ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। এ সময়ের মধ্যে একাডেমি তার হারানো শক্তি ও গৌরবের সঙ্গে সারা বিশ্বের পূর্ণ আস্থা ফিরে পেতে সক্ষম হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

অবশ্য একাডেমির কয়েকজন সদস্য যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ঐতিহ্য ধরে রাখা উচিত ছিল। কিন্তু অন্যদের মত হচ্ছে, একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।

একাডেমির সদস্য ক্রিস্টিনা লুং সাংবাদিকদের বলেন, একাডেমি এখনো ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে সক্ষম। সম্ভাব্য বিজয়ীর নামের তালিকার যাচাই-বাছাই প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে এবং কমিটির টেবিলে এখন পাঁচজনের নাম রয়েছে, যেখান থেকে পুরস্কারের প্রচলিত রীতি মেনে একজনকে সাহিত্যে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া সম্ভব। যদি এ বছর সত্যি সাহিত্যে পুরস্কার দেওয়া না হয়, তাহলে এর দায় স্বীকার করে একাডেমি থেকে সব সদস্যের পদত্যাগ করা উচিত।

তবে একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি আন্দ্রেস উলসন সুইডিশ রেডিওকে বলেন, কমিটির সদস্যদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় এবং নোবেল পুরস্কারের গৌরব ও এর প্রতি বিশ্বের মানুষের বিশ্বাস কমে যাওয়ায় নোবেল কমিটির এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় ছিল না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সুইডিশ একাডেমির সদস্যদের বিভ্রান্তির কোনো দায় আগের, বর্তমানের এবং ভবিষ্যতের কোনো পুরস্কার বিজয়ী নেবেন না এবং তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব একাডেমির। এ কারণে তিনি মনে করেন ২০১৮ সালের সাহিত্যে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক।

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার চালুর পর থেকে এবারের আগে আরো সাতবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ‘না দেওয়ার’র ঘোষণা দিয়েছিল সুইডিশ একাডেমি। ১৯১৫, ১৯১৯, ১৯২৫, ১৯২৬, ১৯২৭, ১৯৩৬ ও ১৯৪৯ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারকে ‘রিজার্ভ প্রাইজ’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। এই সাতবারের মধ্যে পাঁচবারই নির্ধারিত বছরের পুরস্কার পরের বছরের বিজয়ীর সঙ্গে রিজার্ভ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।

বিবিসি জানিয়েছে, বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে ছয় বছরের হিসাব বাদ দিলে এ পর্যন্ত শুধু একবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ১৯৩৫ সালে সুইডিশ একাডেমি জানিয়েছিল, পুরস্কারের জন্য কোনো যোগ্য প্রার্থী তারা পায়নি।

গত বৃহস্পতিবার সুইডেনের রাজা ও সুইডিশ একাডেমির চেয়ারম্যান কার্ল গুস্তাফ ঘোষণা দেন, সুইডিশ একাডেমির আইনি ব্যাখ্যার জটিলতাগুলো দূর করতে তিনি তা আরো পরিষ্কার করেছেন। এর পর থেকে সুইডিশ একাডেমির কোনো সদস্য নিজ আগ্রহে এবং ব্যক্তিগত কারণে কমিটি থেকে পদত্যাগ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, সব সদস্যই একাডেমির আমরণ স্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁদের পদত্যাগের ব্যাপারে রাজার অনুমতির প্রয়োজন হতো, যা এর পর থেকে আর লাগবে না বলে রাজার ঘোষণায় বলা হয়েছে।

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবতার কল্যাণে অবদানের জন্য ১৯০১ সাল থেকে চিকিত্সা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতির নোবেল। এর মধ্যে পাঁচটি ক্যাটাগরির পুরস্কার নরওয়ের নোবেল একাডেমি থেকে ঘোষণা করা হলেও সাহিত্য পুরস্কারের দায়িত্ব সুইডিশ একাডেমির ওপর।

কিউএনবি/নিল/ মে/১৭ঃ৩২