২৭শে জুন, ২০১৯ ইং | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:১৬

কান ঘেঁষে রক্ত ঝরেছিল তবু বন্ধুদের নাম বলিনি… রোল নম্বর ‘ওয়ান জিরো জিরো’

 

প্রবাসঃ সেই সেদিন। ঠিক মনে পড়ে না কার বেঞ্চিতে কাকে উদ্দেশ্য করে কিংবা কে লিখেছিল- মেয়ে, তুমি উর্বসী। ঠিক মনে পড়ে না, সেখানে উত্তর এসেছিল কীনা।আমাদের সময়ের কলেজ বেঞ্চগুলো বুক চিতিয়ে ভালোবাসার কথা লুফে নিলেও বড্ড কৃপণ ছিল মেয়েগুলো! তারা বুঝতোই না কতোটা অনুভবে স্পর্শে আবেগের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় লেপ্টে আছে এই প্রতিটি অক্ষর-শব্দ।
.
বছর শেষে সাফ-সুতরাতে এসে হয়তো কোনো রঙ মিস্ত্রী সেই শব্দগুলো ছুঁয়ে মৃদু হেসে বলেছে- ‘কী, পাগলরে বাবা। মেয়েটা উত্তর দিলে কীইবা এমন ক্ষতি হতো! এভাবেই কতকত প্রলেপে মিশে আছে ভালোবাসার হাজারো অব্যক্ত আর্তনাদ। আমি সেই সময় থেকে উঠে আসা এক আগন্তুক বলছি। রোল নম্বর ‘ওয়ান জিরো জিরো’। সেই কমন রুম, লাল দালানের ভৌতিক ল্যাব; খোলা মাঠ, শুভ্র ক্রিস্টালের স্মৃতিসৌধ; তীব্র গরমে রাণীর দীঘির হিমশীতল আবেশ। মাইরি মনে গেঁথে আছে।
.

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আমি ছিলাম সায়েন্স ফ্যাকাল্টির। তখন ম্যাথমেটিক্স ক্লাস নিতেন সম্ভবত জয়নাল আবেদিন স্যার। মেহেদি মাখা রঙিন দাঁড়িতে ঢেকে থাকা লম্বাটে গড়নের মুখের মানুষটা পরতেন পাজামা-কোর্তা। আমি জানি না ভুল বলছি কিনা। হতেও পারে গুলিয়ে ফেলেছি। প্রচণ্ড কড়া প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক।
.
একদিন কী হলো ক্লাসে পেছন থেকে খুব মিহি কণ্ঠে বিড়ালের মতো ‘মেঁয়াও’ বলে কে যেন ডেকে উঠলো। স্যার বললেন- কে… কে শব্দ করলো? পিন পতন নিস্তব্ধতা পুরো ক্লাসজুড়ে। এর মধ্য থেকেই আবার বিড়ালের ডাক। অন্য কেউ রা করলো না। উত্তর না পেয়ে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে এবার বললেন- আমি জানি কে এই কাজটি করেছে, সে যদি নিজ থেকে উঠে না আসে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না! তাও কেউ এলো না।
.
সেই দিনটা ছিল আমার জীবনের চরম অবিশ্বাসী একটা দিন। প্রচণ্ড অভিমানের দিন। আমি আজও ভেবে পাই না অপরাধ না করেও আমাকেই কেন শাস্তির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল! শ্রদ্ধেয় স্যারের নির্দয় প্রহারে সেদিন আমার কান ঘেঁষে রক্ত ঝরেছিল। আমি কিন্তু সেদিন আমার বন্ধুদের নাম বলিনি। অন্তত এই জায়গায় আমি আজো জয়ী। আজো তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। আজো ভাবি, আরেকবার। যতবার সুযোগ হবে ততবার। তাও বন্ধুত্ব টিকে থাক, দৃঢ় হোক বন্ধন।

আজ এতবছর পর সেই গল্পটা লিখতে গিয়ে সত্যিই স্মৃতিকাতরতা ভর করেছে। এমনিতে এখানে বছরের প্রায় ছয় মাস তুষারপাত হয়। অথচ কী আশ্চর্য! আজ ফকফকা সোনালী রোদ। নীল আকাশের চাদরে ঢেকে আছে শুভ্র তুষার আর সদ্য গজিয়ে ওঠা পাতার সবুজের প্রান্তর। আমি হাত পেতে দূরদেশে অনুভব করি আমার বাংলাদেশকে; আমার প্রিয় মানুষগুলোকে।

এহেছান লেনিন
(সেশন- ’৯৫-’৯৬, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ)

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/২২.০৪.১৮/ ১১.৩৩

Please follow and like us:
0
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial