১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৫৯

পূর্ণাঙ্গ তালিকা হয়নি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার

 

ডেস্ক নিউজ : বিবর্তনের হাত ধরে এগিয়ে চলা শহরের সভ্যতার রূপান্তরের প্রতিটি বাঁকেই থাকে নানা স্মৃতিচিহ্ন। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপনাগুলো একদিকে যেমন অতীতের ভুল, সাফল্য ও গৌরবগাথা স্মরণ করিয়ে দেয় তেমনি বর্তমানকে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা ও প্রণোদনাও দেয়। কিন্তু এই বদ্বীপের দীর্ঘ সময়ের রাজধানী ও অন্যতম প্রধান শহর ঢাকার সেই স্মৃতিচিহ্নগুলোর বড় অংশই হারিয়ে গেছে। যেগুলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সেগুলোও নষ্ট কিংবা ধ্বংসের পথে।

 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪০০ বছরেরও বেশি পুরনো ঢাকার প্রত্নতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা-ভবনগুলোকে এখনো সর্বজনীন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে চিহ্নিত করা যায়নি। ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি পরিপূর্ণ তালিকা তৈরি হয়নি। স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে যেমন সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই তেমনি এগুলোর মালিকানায় থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব ও উদাসীনতা। পরিপ্রেক্ষিতে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। অথচ রক্ষণাবেক্ষণে জোর দেয়া হলে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ব্যক্তিমালিকদের জন্য অর্থকরি ও গৌরবের বাহন হতে পারে।  পাশাপাশি পুরান ঢাকাকে ঘিরে বিকশিত হতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন। যা থেকে সরকারও অর্থ উপার্জন করতে পারে। আর ঢাকা থাকতে পারে বিশ্বের ঐতিহ্যময় শহরগুলোর অনন্য তালিকায়।
 
সম্প্রতি এ প্রতিবেদক ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে রমনা, সদরঘাট ও যাত্রাবাড়ী এলাকা পর্যন্ত ঘুরেছেন। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঢাকার পুরনো মানচিত্র এবং আলোকচিত্রে থাকা অনেক স্থাপনা-ভবন এখন আর নেই। অনেকগুলো কোনোভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। বেদখল হয়ে গেছে বেশকিছু স্থাপনা। কতগুলো স্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেগুলোর ইতিহাসও। বয়োবৃদ্ধরা বলছেন, নতুন প্রজন্ম জানেই না তাদের স্থানীয় ঐতিহ্যকথা। আদি ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো। গোটা বাংলার এক সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর জনপদ এখন  অনেকটাই পিছিয়ে। পুরান ঢাকার সমাজে যে ভারসাম্যহীনতা ও নাগরিক সুবিধার অপর্যাপ্ততা তৈরি হয়েছে তার একটি বড় কারণও এ ঐতিহ্য লালনে অবহেলা।
 
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সংখ্যা কত?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষা করতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হলো- এগুলোর স্থাপত্যিক, নান্দনিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তথ্যসম্বলিত একটি পরিপূর্ণ তালিকা প্রণীত না হওয়া। একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্যসহ তালিকা থাকলে সেটি ধরে স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করতে পারত। স্থাপনাগুলোর বেসরকারি মালিকরাও সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে অধিক যত্নশীল এবং এক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা চাইতে পারতো। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তালিকা না থাকায় কোনটি ঐতিহ্যবাহী ভবন আর কোনটি নয় তা নিয়েই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে।
 
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় ঢাকা বিভাগের ৩৮টি স্থানের নাম উল্লেখ রয়েছে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার ৯৩টি ভবনকে ঐতিহ্যবাহী হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করে গেজেট জারি করে রাজউক। ৪টি অঞ্চলের ১৩টি রোড এবং এলাকাও ওই তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের নভেম্বরে ভবন সংখ্যা কমিয়ে ৭৫টিকে তালিকাভুক্ত করে গেজেট জারি করে রাজউক। এ তালিকার ওপর আস্থা নেই ইতিহাসবিদ ও স্থাপত্যবিদদের। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশিত অধ্যাপক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ’ বইয়ে শুধু ঢাকা শহরেই অন্তত ৪৭টি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বর্ণনা করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত এবং ড. আহমাদ হাসান দানী লিখিত ‘ঢাকা : অ্যা রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ বইয়ে ঢাকার শতাধিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নাম উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ শীর্ষক বইয়েও দেড় শতাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনার উল্লেখ রয়েছে। ১৮৫৯ সালের ঢাকা সার্ভে মানচিত্রেও প্রায় দেড়শ’ স্থাপনার খোঁজ মিলে। ১৯ শতকের শুরুর দিকে আঁকা চার্লস ড’য়েলের বেশকিছু ছবিতেও ঢাকার সৌন্দর্যময় চিত্র পাওয়া যায়। এগুলোতে লিপিবদ্ধ তথ্যের বাইরেও অনেক ঐতিহ্যবাহী ভবন রয়ে গেছে।
 
২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর প্রণীত ৯৩টি ভবন ও ৪টি এলাকার সংরক্ষিত তালিকার সাথে অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ভবন-অবকাঠামো এবং এলাকাগুলোকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন করতে সরকারকে বলে হাইকোর্ট। ২০১২ সালের ৮ অক্টোবর দেওয়া সেই আদেশ এখনও পালিত হয়নি। বরং ২০১৭ সালের প্রণীত তালিকায় ৪টি অঞ্চল এবং ১৮টি ভবন বাদ পড়েছে। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যবিদরা বলছেন, ঐতিহাসিক ভবন-স্থাপনা রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা গেলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যেত। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নে রাজউকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনীহা রয়েছে।
 
এ প্রসঙ্গে রাজউকের নগর উন্নয়ন কমিটির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকা প্রণয়ন কমিটির প্রাক্তন সদস্য এবং আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তৈমুর ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশনার প্রায় ২ বছর পরে তালিকা প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। আমরা একটি খসড়া তালিকা করেছিলাম। তাতে ১ হাজার ৬০০টি ভবন-স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ দিকে ওই কমিটিই বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে হালনাগাদ তালিকা প্রণয়নের কাজটিও সাফল্য পায়নি। এরই মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তালিকাটি আরো ছোট করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের পথে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
 
তবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুর রহমান বলেন, আমরা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করেই নতুন তালিকা করেছি। যেগুলো ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা যুক্তিসঙ্গত নয় সেগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী রাস্তাগুলো (অঞ্চল) সম্প্রসারণের দরকার ছিল। তাই সেগুলোকে হেরিটেল অঞ্চল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
 
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সদিচ্ছা নেই। এটির গুরুত্বও অনুভব করে না তারা। ফলে অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। অনেকগুলো বিকৃত হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে শুধু ঐতিহ্যই হারাচ্ছে না আমাদের সভ্যতার গৌরবও হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হলে এগুলো ধ্বংস বা নষ্ট করা সহজ নয়। তাই এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় পরিপূর্ণ তালিকা প্রণয়নের পথে বাধা তৈরি করছেন অনেক স্থাপনার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মালিকরা।
 
হারিয়ে গেছে অন্তত ২৬টি বাড়ি
সরকারি কিংবা বেসরকারি যে মালিকানায়ই থাকুক না কেন ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো ভাঙার প্রবণতা প্রবল হয়েছে। সম্প্রতি আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও খামারবাড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী ল্যাবরেটরি ভবন ভাঙা হয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভাঙার কাজ শুরু হয়ে মাঝপথে আটকে আছে ঋষিকেশ দাস রোডের ৪১, ৪১/১, ৪১/২, ৪২/১, ৪২/২ এবং ৪৩ হোল্ডিং নম্বরের বাড়িটি। ৩নং নবদ্বীপ বসাক লেনের বাড়িটি আগামী ১৬ এপ্রিল ভাঙা শুরু হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে বাসার দখল নিয়েছে ভাঙার দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার। আরবান স্টাডি গ্রুপের দেওয়া তথ্য মতে, গত দেড় দশকে রাজধানী থেকে অন্তত ২৬টি ঐতিহ্যবাহী ভবন হারিয়ে গেছে, যেগুলো যেকোনো বিবেচনায় সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। হারিয়ে যাওয়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকেশ্বরী রোডের ৩ নম্বর বাড়ি, কালি চরণ সাহা স্ট্রিটের ১২ ও ২০ নম্বর বাড়ি, ফরাশগঞ্জের বি কে দাস রোডের ২৬নং, শাঁখারি বাজারের ১৩৫ ও ১৩৬নং, হেমেন্দ্র দাস স্ট্রিটের ৭ নং বাড়ি, হিঙ্গা বিবি মসজিদ, টিকাটুলির হাটখোলা রোডের ৩৬-৩৭ নং বাড়ি, লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ২০৭নং বাড়ি, টিপু সুলতান রোডের ৩৮ নং বাড়ি (শঙ্খনিধি হাউজ)।
 
সমাধান যে পথে
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের পথে প্রধান বাধা তিনটি। এক. দীর্ঘদিনের পুরনো বাড়ি জীর্ণ হয়ে অনিরাপদ হয়ে যাওয়া। দুই. পুরনো বাড়িকে আরো সম্প্রসারণ করা। তিন. আর্থিক প্রয়োজনে মালিকানা বিক্রি বা হস্তান্তর। এই তিন সমস্যা মেটানো বা বাধা দূর করা সম্পর্কে স্থাপত্যবিদ তৈমুর ইসলাম বলেন, বাড়ি যত পুরনোই হোক না কেন তা ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে জীর্ণ ও অনিরাপদ হয় না। যেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ও সংস্কারে সারবে না সেগুলো রেট্রোফিটিং এবং ক্লিপিংয়ের মাধ্যমে ঠিক রাখা যাবে। বাড়ির ধরন অনুযায়ী তা সম্প্রসারণেও বাধা নেই। এক্ষেত্রে বাড়ির সম্মুখভাগ ও উপরিভাগে জায়গা রাখলেই হয়। আর ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা গেলে শুধু পুরান ঢাকাকে ঘিরেই বড় পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা যায়। সেক্ষেত্রে সরকার বাড়ির মালিকদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিয়ে তা সংরক্ষণে প্রণোদনা দিতে পারে।
 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ বলেন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের পথে বড় বাধা এগুলোর প্রতি সরকার এবং দখলে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব। অনেকেই মনে করেন পুরনো ভবন মানেই জীর্ণতার প্রতীক। এটি সঠিক নয়। ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে পুরনো ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাহলে এগুলো ঘিরে নতুন পর্যটন বিকাশ করাও সম্ভব।

 

 

কিউএনবি/রেশমা/১৪ই এপ্রিল, ২০১৮ ইং/সকাল ১১:২৯