২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:৫৮

তারেক রহমান না এশা, কাকে নিয়ে লিখব?

 

গণমাধ্যমঃ কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ নেত্রী এশার সঙ্গে হল ছাত্রলীগের একাংশ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে অমানবিক আচরণ করেছে এর নিন্দা জানিয়ে লেখা শুরু করছি। হতে পারে এশা অন্য মেয়েদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করত, ক্ষমতার দাপট দেখাত, হতে পারে সে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যেতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধা দিয়েছে, কিন্তু এশার সঙ্গে যা হয়েছে তার বর্বরতা ও অমানবিকতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এশার বিচার নিজেরাই করে ফেলেছে শিক্ষার্থীরা, এতে মদদ ছিল ছাত্রলীগের হল শাখার একাংশের। এশার বিচার করতে গিয়ে তার সঙ্গে অবিচার বেশি হয়ে গেছে, ফলে এখন সময় এষার সঙ্গে ন্যায়বিচার করার।

একটা মিথ্যাকে সত্য মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমান্ড নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এশাকে বলি দিয়েছে। তাই সমস্ত বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এশাকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এশার সামাজিক সম্মান হয়ত ফিরিয়ে আনতে একটু সময় লাগবে, কিন্তু হলে থাকা, ছাত্রলীগ করা, পড়াশুনা করা ইত্যাদির অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

তবে এশা বা অন্যান্য ক্ষমতাশালী ছাত্রনেতা/নেত্রীদেরও মানুষকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে। বিনয়, স্বচ্ছতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে রাজনীতি করতে হবে। কিন্তু রাজনীতির দুষ্টচক্র এমনই কলুষিত যে, এখানে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা প্রকৃত অর্থেই কঠিন। ভদ্র, বিনয়ী, প্রতিবাদী,  লোকজনের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু সব কিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যেতে দিলে হবে না।

গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, এশা আরেকজনের রগ কেটে ফেলেছে। কিন্তু রগ কাটার পক্ষে কেউ কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। বরং রগ কাটেনি এমন প্রমাণ আছে। যার পা কেটেছে সে নিজেই বিবৃতি দিয়েছে, রগ কাটা হয়নি। রগ কাটা হলে এতক্ষণে সাংবাদিক আর পুলিশ মিলে এর প্রমাণ হাজির করে ফেলত। তবে এশা যে হলের ছাত্রীদের হুমকি-ধামকি করত, অন্যায়ভাবে ক্ষমতা চর্চা করত এর পক্ষে জোরালো প্রমাণ আছে।

আর প্রমাণের কী আছে? ক্ষমতাসীন ছাত্র নেতারা হলের সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে সেটা আমরা জানি। আগে ছাত্র হলগুলোতেই এগুলো হত, ইদানিং ছাত্রী হলগুলোতেও এমন আধিপত্যবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছে, যা দুঃখজনক। এ নিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভেতরে ক্ষোভের শেষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ হলে প্রশাসন বলতে কিছু নেই। বিশেষ করে ছেলেদের হলগুলোতে হলে নতুন ছাত্র তোলা, গণরুম ব্যবস্থাপনা, পরবর্তীতে কেকোনো সিটে উঠবে এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পরিচালনা করেন। বিশেষ করে গণরুমগুলো নিয়ন্ত্রণ করে পলিটিকাল ছেলে-মেয়েরা। গণরুম ছাত্রনেতাদের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হলেও সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অভিশাপ। গণরুমের বাসিন্দাদের দিয়ে মিছিল, মিটিং করানো, সিটের লোভ দেখিয়ে অন্যায় কিছু করিয়ে নেয়া, মারামারিতে লোকবল বাড়ানো, ইত্যাদি কয়েকটি কারণে ছাত্রনেতারা চায় না গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ হোক। দলের স্পষ্ট মানবতাবাদী আদর্শ থাকলেও  নিজেরা এর ধারেকাছেও যায় না ছাত্রনেতারা। ঘুরেফিরে প্রচলিত জনপ্রিয় ছাত্র রাজনীতির উদ্দেশ্য যেন শুধু নিজের পকেট ভারী করা, নিজের ক্ষমতা বাড়ানো এবং নিরীহ মানুষের উপর ক্ষমতার প্রয়োগ করা। এতে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষদের উপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের শেষ নেই। সেই ক্ষোভেরই শিকার হয়েছেন এষা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে এমন বলাটা বাড়াবাড়ি নয়।

এরপরেও আমরা মনে করি, এশার বিচার করার ক্ষমতা আছে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর সরকারের। ছাত্রলীগের কোন্দল আর উত্তপ্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এশাকে যেভাবে অপমান করা হয়েছে সেটিও মেনে নেয়া যায় না। এই পরিস্থিতি পরিষ্কার নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্য থেকে রাষ্ট্রকে শিক্ষা নিতে হবে, সরকারি কর্মকর্তাদের ও রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নিতে হবে। সংকট ব্যবস্থাপনা কীভাবে করতে হয় সেটি শিখতে হবে। হাজার খানেক ক্রুদ্ধ মেয়ের মাঝে দুইজন পুরুষ সহকারী প্রক্টর পাঠিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বোকামি করেছে। মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে প্রচুর প্রমীলা শিক্ষকের সেখানে মোতায়েন করা উচিত ছিল। খুব সাহসী, শক্ত, সামর্থ্য প্রমীলা শিক্ষক, যারা দরকার হলে গায়ের জোর প্রয়োগ করে এশাকে ভয়ঙ্করভাবে অপমানিত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারতেন। পুরুষ শিক্ষক দিয়ে ক্ষুব্ধ ছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, এটা সম্ভব না। নারী খুব সেনসিটিভ এক বিষয়।

এবার আসি তারেক রহমান সাহেবের কথায়। কোটা সংস্কারের পক্ষে আমি নিজে কমপক্ষে মাস দুয়েক আগে থেকে লেখালেখি শুরু করি। এর অনেক আগে থেকে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ফেসবুকে, রাজপথে শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল নানা উপায়ে কোটা সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষক সমিতিসমূহ কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও আমরা অনেকে সব কোটার সংস্কার চেয়েছি। ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়াশুনার শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অথচ ছাত্র-ছাত্রীরা নিজের চাকরির ব্যবস্থা এমনি এমনি চায়নি। চেয়েছে মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা নিজেরাই করতে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় প্রতিবছর বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করে, ১২৩ গুণ বেতন বাড়িয়ে সরকারি চাকরির প্রতি একটা উন্মাদনা তৈরি করেছে সমাজে। আগে তো আমরা সরকারি চাকরির জন্য এতটা পাগল ছিলাম না। একটা যৌক্তিক, সাবলীল আন্দোলনের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েরা একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে চেয়েছে।

দেশের সব যেহেতু প্রধানমন্ত্রীকে করতে হয়, ওরাও চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথা ছাড়া এরা ঘরে ফিরে যাবে না। এর আগে প্রধানমন্ত্রী একবার ঘোষণা দিয়েও ছিলেন যে, কোটার শূন্য পদ মেধা থেকে এনে পূরণ করা হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা ঘরে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক উল্টো সার্কুলার জারি করে পুরো পরিস্থিতি আবার গরম করে ফেলা হয়। আমলারা কীভাবে পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারে, সেটি সার্কুলারটি পড়লে বোঝা যায়। কী আশ্চর্য, এই উল্টো সার্কুলার নিয়ে সরকারের কোনো মন্ত্রী, বা আওয়ামী লীগের কোনো বড় নেতাকে কিছু বলতে আমরা দেখিনি। অথচ এই একটি সার্কুলার কত বড় নাশকতা হিসেবে কাজ করেছে সেটি ভাবলে আতঙ্কিত হতে হয়। ওবায়দুল কাদেরের মত বড় নেতা ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মিটিং করেছে, ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু পরে মতিয়া চৌধুরী আর আবুল মাল আব্দুল মুহিত অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করে মহাতুফানের জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত বহুল আকাঙ্ক্ষিত এক ভাষণে পুরো দেশে শান্তি নিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা ও আস্থার বিষয়টি হাইলাইট না করে, আওয়ামী লীগের বড় কয়েকজন নেতা পর্যন্ত এই আন্দোলনের পেছনে তারেক রহমানের হাত আছে বলে গলা ফাটাচ্ছেন। কী বুদ্ধি নিয়ে, কী অনুধাবন নিয়ে এই নেতারা এত বড় ‘নেতা’ হয়ে গেলেন, আমরা বুঝিনা। কিছু ছাত্রনেতা এবং কিছু কোটাধারী দেশের এতগুলো ছেলেমেয়েকে অবিরাম শিবির বলে আখ্যায়িত করেছে। তারেক রহমান এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ফোন দিয়েছিলেন। তারেক রহমান নিজে কী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন সেটা আমরা জানি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফোনের এ প্রান্ত থেকে কাঁচুমাচু হয়ে যে টোনে কথা বলেছেন, তাতে লজ্জায় আমাদের মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন নির্লজ্জ, ব্যক্তিত্বহীন শিক্ষক আর দুর্নীতিগ্রস্ত এক নেতার ফোনে দেশের তরুণ সমাজ এত বড় আন্দোলন করে ফেলবে, এটা আওয়ামী লীগের এই অপরিণামদর্শী নেতারা ভাবলেন কেমন করে?

তারেক রহমান তার মায়ের জন্য কী করতে পারছেন? খালেদা জিয়া জেলে আছেন। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে থাকতে বলেছেন আদালত। তারেক রহমান লন্ডনে বসে উল্টাপাল্টা বিবৃতি দেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে বেয়াদবি করেন। ইতিহাস বিকৃতি করেন। দেশের মানুষ তারেক রহমানকে জানে একজন ‘লাইনচ্যুত প্রিন্স’ হিসেবে। এমন একজন অগ্রহণযোগ্য নেতাকে দেশের মানুষের সামনে অযথা হিরো বানিয়ে উপস্থাপন করছে আওয়ামীলীগেরই কিছু নেতা, ভাবতে অবাক লাগে। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতির বাড়াবাড়ির ফলে মানুষ আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় এনেছিল। সে আস্থা এখনো অব্যাহত আছে। বিএনপি-জামাত হরতাল ডাকলে হরতাল হয় না। এতকিছু দেখেও নিজেদের দলের এবং নেত্রীর শক্তি সম্পর্কে এসব নেতার বোধোদয় হয় না, আশ্চর্যজনক এবং ভয়ের বিষয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/১৩.৪.১৮/ বিকেল ৬.০৫