২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:০২

বৈশাখের ইলিশ ও কিছু কথা

 

ডেস্ক নিউজ : চৈত্র মাস শেষের দিকে। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী এ মাসে কাঠফাটা রোদ থাকার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। সারাদেশে ঝড়, শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। আর কয়েক দিন পরই বাংলা বছরের প্রথম দিন। বৈশাখের শুরু। বসন্ত বিদায়ের পর গ্রীষ্ম বরণ করে নেওয়ার পালা। বৈশাখ নিয়ে বাঙালির মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা চিরাচরিত। এ যেন আমাদের রক্তেই মিশে আছে। এটি কেবল পালন করা নয় বরং অন্তর দিয়ে লালন করা হয়। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষের বিশেষ উৎসব হিসেবে পালন করা হয়ে। এটি বাঙালির ঐতিহ্য। সব বাঙালি বাংলা বছরের প্রথম দিনকে বরণ করে নিতে আনন্দে মেতে ওঠে।

উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। সে সময় অবশ্য এখনকার মতো নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য নববর্ষ পালন করা হয়, তেমন ছিল না। তখন বরং কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় ফসল ওঠার সঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ছিল। সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই মূলত পহেলা বৈশাখ পালন করা শুরু হয়। মূলত খাজনা আদায় ও শুল্ক পরিশোধে চৈত্র মাসের শেষদিনে প্রজাদেরও বাধ্যবাধকতা থাকত। বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টিমুখ করাত। এ দিনে বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান সময়ে এসে উপনীত হয়েছে। আজ পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির জীবনে এক উৎসবের দিন। সেই জমিদার নেই, সেই খাজনা আদায়ও নেই। আছে কেবল উৎসব। আর থেকে গেছে প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ার প্রথা। বৈশাখী উৎসবের প্রাণ হলো ঢাকার রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। বহু বছর ধরেই মঙ্গল শোভাযাত্রা চলে আসছে। এ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজ উদ্যেগে মঙ্গল শোভাযাত্রার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সারা বাংলা মঙ্গল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক।

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে ইলিশ মাছের ঠিক কী সম্পর্ক বা কবে থেকে বৈশাখের প্রথম দিনে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশের প্রচলন হয়েছে, এর কোনো ইতিহাস নেই। তবে বিষযটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এ সংস্কাররূপী অসংলগ্ন প্রথার আমাদের ভেতর থেকে দূর করা সম্ভব হয়নি। বৈশাখের আগেই তা ঘাড়ে চেপে বসে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ এক ইলিশ জোগাড় করতে না পারার জন্য মাটি হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে আমাদের ভাবখানা এমন যে, এদিন ইলিশ খেতে না পারলে সারা বছর ইলিশ খাওয়া যাবে না। তা যাই হোক না কেন, একটা ইলিশ জোগাড় করা চা-ই চাই। তা সে যত দামই হোক। পত্রিকাগুলোয় কয়েক দিন আগে থেকেই ইলিশের দামের মুখরোচক সব খবর আসতে শুরু করেছে। লাখ টাকা মণ ইলিশও বিক্রি হতে দেখা যায়। বাজারের বড় ইলিশ মাছটা যে কেনে পরদিন দৈনিক পত্রিকায় তার নাম মাছের সঙ্গে ছবিসহ পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়। কি সৌভাগ্যবান সে ভদ্রলোক!

এই হলো অবস্থা। হুজুগে বাঙালি! এমন একটা ভাব ধরে বসে থাকে যেন ইলিশ দিয়ে পান্তা না খেলে সারা বছর আর ইলিশ কপালে জুটবে না। এদিকে এই বাসনা পূরণ করতে গিয়ে যে ইলিশের কারবারিদের পকেট মোটা করছি সে খোঁজ কেউ রাখছি না। অনেকে দীর্ঘদিন ইলিশ মাছ সংরক্ষণ করে এ সময় বিক্রি করার জন্য। সরকারি উচ্চমহল থেকেই অবশ্য এদিন ইলিশ না খাওয়ার ঘোষণা এসেছে। অনেক জায়গায় নববর্ষে ইলিশ বর্জন হবে বলে জানতে পেরেছি। আসলে মূল বিষয়টা আমাদের বুঝতে হবে। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য পালন করতে গিয়ে কোনো কুসংস্কারের আশ্রয়ে যাওয়া চলবে না। ইলিশ খাওয়ার সঙ্গে যদি সংস্কৃতির সম্পর্ক না থাকে, তাহলে অযথাই ইলিশ খাওয়ার বাধ্যবাধকতা টেনে পহেলা বৈশাখের আনন্দ মাটি করার দরকার নেই।

পহেলা বৈশাখ আসলে বাঙালির জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত ইংরেজি বছরের নিউইয়ারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে বাঙালিরা। নিজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এটাই তো সুযোগ। বিদেশি সিরিয়াল, বিদেশি ফ্যাশন করতে করতে আমরা যখন নিজেদের হারাতে বসেছি, তখন এই নববর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের ভাষা। এই সংস্কৃতি আমাদের আপন সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি হলফ করে বলতে পারি বছর যত এগোচ্ছে নতুন বছরকে বরণ করতে আমাদের সক্রিয়তা তত বাড়ছে। আমাদের উচ্ছ্বাস বাড়ছে। আমরা নিজ সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরতে চাইছি। বিদেশি সংস্কৃতির আধিপত্যে যা জৌলুসহীন হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। আমরা আমাদের দায়িত্ববোধ ও বাঙালিত্ব দিয়ে নববর্ষের আনন্দ-উদযাপন করি। উৎসব আরো আছে কিন্তু পহেলা বৈশাখের মতো এমন সার্বজনীন উৎসব আর কয়টি আছে। যেখানে বাঙালির প্রাণই মূল কথা। জাতিভেদ, বর্ণভেদ যেখানে মাথা তুলে দাঁড়ায় না। বাংলা নববর্ষ তাই আমাদের উদার হতে শেখায়। নতুন বছর আমাদের ভালো কাটবে এ আশা নিয়েই আনন্দ নিয়ে বের হই। চারদিকে নতুন করে তাকিয়ে দেখি। জীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে রেখে, তারুণ্যকে বরণ করে নেই। সামনের দিনগুলো কেমন হবে এটা কেউ বলতে পারি না কিন্তু পহেলা বৈশাখ পালনের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটাই।

এমনিতেই দেশে এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে। বৈশাখের আগেই সারাদেশেই কালবৈশাখী, টর্নেডো বয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নববর্ষ পালন শুরুই হয়েছিল কৃষকদের জন্য। তাই নতুন বছরের আমাদের প্রত্যাশা দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পরিবেশের ভারসাম্য তৈরি করা। প্রকৃতির যে বিরূপ আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তাতে অচিরেই ঋতুর পালাবদল কেবল গণনানির্ভর হবে। কারণ বৈশাখ মাস কাল বৈশাখী ঝড়ের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র খরতাপে মাটি ফেটে চৌচির হওয়ার আশঙ্কা। এত কিছুর ভেতর স্বস্তির অবকাশ নেওয়ার সময় খুব কম। তাই সতর্কতাই ভরসা।

পহেলা বৈশাখ আমাদের। পহেলা বৈশাখ বাঙালির। পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দেশে ভিনদেশি সংস্কৃতিচর্চা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ইংরেজি নববর্ষ হ্যাপি নিউইয়ার, ভ্যালেন্টাইন ডে-কে ভালোবাসা দিবস নামে আমরাই আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপন করি। সে তুলনায় গ্রামেগঞ্জে পহেলা বৈশাখেই উৎসাহ-উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যায়। মনে রাখতে হবে ভিনদেশি সংস্কৃতিচর্চা কেবল নিজেদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। আর কিছু নয়। নিজ ঐতিহ্য পালনের ভেতর যে শান্তি লুকিয়ে আছে, তা কেবল সেই পালনকারীই জানে। ধার করে বেশি দিন গর্ব করা যায় না। গর্ব তো কেবল নিজেরটুকু বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে।

কিউএনবি/রেশমা/১১ই এপ্রিল, ২০১৮ ইং/ দুপুর ১:১০