১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:২০

বিদায় হে বসন্ত

 

ডেস্ক নিউজ : চলে যাচ্ছে ঋতুরাজ বসন্ত। বাগানে ফুলসম্ভার, আম্র শাখায় গুটি আম আর ডালে ডালে কোকিলের গান রেখে বিদায় নেবে সে। আসবে নতুন দিন, নতুন বছর, বঙ্গাব্দ-১৪২৫। ঋতু পরিক্রমায় বাংলায় ফাল্গুন-চৈত্র এ দুই মাস বসন্ত হিসেবে পরিচিত, যা ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ‘ঋতু শ্রেষ্ঠ’ বা ‘ঋতুরাজ’ নামে খ্যাত। মাঘের শেষদিকে শীতের জড়োসড়ো জড়ানো চাদর সরিয়ে আমরা সাগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি কবে আসবে সেই পাতা জাগার দিন, নাতিষীতোষ্ণ সময়। একটুখানি উষ্ণতার পরশ পেতে, মিঠে কড়া রোদের ছোয়া পেতে মন হয়ে ওঠে উদগ্রীব। শেষমেশ শীতের জরাজীর্ণতা ঝেড়ে বনে, মনে অপূর্ব রং ছড়িয়ে বসন্ত আসে। ন্যাড়া গাছে আবার পাতা গজায়, ফুলের বাহারি মেলায় ভরে ওঠে বিতান। নানা রকম ফুলের ম-ম ঘ্রাণে আকৃষ্ট হয়ে উড়ে বেড়ায় মৌমাছি-প্রজাপতি। গুন গুন রবে গেয়ে ওঠে ভ্রমর। গাছে গাছে পাল্লা দিয়ে কুহু কুহু রবে ডাকে কোকিল।

বসন্তের আগমনে প্রকৃতি ফিরে পায় নতুন রূপ, নতুন প্রাণ, নতুন চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা। ঘুচে যায় শীতের রুক্ষতা-শুষ্কতা। ফুরফুরে আমেজে ভরে ওঠে চারদিক। উতলা হয় নারী ও পুরুষের বিরহী মন। সুদূর প্রিয় বা প্রিয়ার আকর্ষণে উন্মনা মন যেন বলে ওঠে ‘আমি বসে আছি তোমার নিঃশ্বাসের মুখোমুখি, আদি কাব্যের পিতা-প্রপিতাসহ, তুমুল শব্দ প্রাস আর বসন্তের স্ট্রবেরি লনে… দ্যাখ ঝরা পাতারা আবার গজাবে এখন।’ এমনি করে রং ও সুরে, ভ্রমরের নৃত্যগীতে, পাতার জাগরণে এগিয়ে চলে বসন্তের দিন।

প্রথম মাস ফাল্গুন যায়, চৈত্র আসে। চৈত্র, বসন্তের শেষ মাস, বিশেষ করে ১৫ চৈত্রের পর বেজে ওঠে বসন্তের বিদায়ী সুর। নানা রকম ঘটনা আর উৎসবের সাক্ষী হয়ে বিদায় নেয় বসন্ত। বাঙালির জীবনে বসন্ত দ্রোহ ও বিপ্লবের চেতনায় সমুজ্জ্বল। এ ঋতুতেই সংঘটিত হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য মহান ভাষা আন্দোলন ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। আবার পরাধীনতার নাগপাশ ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি মহান মুক্তি সংগ্রামে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। বাঙালির জীবনে তাই বসন্ত উজ্জ্বল ও স্মরণীয় এক সময়। চেতনায় উদ্দীপ্ত হওয়ার সময়। এ ছাড়া বসন্ত বাঙালির পর্ব বা উৎসবের সময়ও বটে। খ্রিস্টান পর্ব স্টার সানডে, বৌদ্ধ পর্ব চৈত্রসংক্রান্তি, হিন্দু পর্ব দোল বা হোলি, শিবরাত্রী, বাসন্তী পূজা, চড়ক পূজা ইত্যাদি বসন্তেই অনুষ্ঠিত হয়। এসব উৎসব ও জাতীয় দিবস শেষে বাঙালিকে আনন্দ, হাসি, কান্নার দোলায় দুলিয়ে বিদায় নেয় বসন্ত। আমরা বসন্তকে বিদায় জানাই। রবীন্দ্রনাথ বসন্তের শেষ সময় নিয়ে তার ‘বসন্তের জরাজীর্ণ শেষ রাত্রি’ কবিতায় লিখেছেন, ‘পুরোনো বছরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি, ওই কেটে গেল, ওরে যাত্রী। এসেছে নিষ্ঠুর, হোকরে দ্বারের বন্ধ দূর, হোকরে মদের পাত্র চুর। নাই বুঝি, নাই চিনি, নাই তারে জানি, ধরো তার পানি; ধ্বনিয়া উঠুক তব হৃদকম্পনে তার দীপ্ত বাণী। ওরে যাত্রী গেছে কেটে, যাক কেটে পুরোনো রাত্রি।’

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও জরা-ক্লান্তি ভুলে চৈত্র শেষে বসন্তকে বিদায় জানাতে পারি। বসন্তকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন সম্ভাবনাময় বছরকে নবরূপে আমরা কামনা করি। নতুনের স্বপ্নে আবার জ্বলে উঠতে চাই। বলে উঠতে চাই এই জরাজীর্ণতা, এই রিক্ততা আর নয়। চাই পূর্ণতা, নতুন সজীবতা, নতুন সুরের স্পর্শ, নব আলোকে উজ্জীবিত জীবন। আর তার জন্য বসন্তকে আমাদের বিদায় দিতেই হয়। কারণ, ঋতু বসন্তের বিদায় পর্বের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় নতুন বছরের নতুন পথচলা। হয় তার শুভ সূচনা। আমরা বসন্তকে বিদায় দিই; কিন্তু তাতে যেন ব্যথিত নই। কারণ,  তখন আমরা ব্যস্ত থাকি বৈশাখকে নিয়ে, নতুন বছরকে নিয়ে। পুরোনো দিনকে নিয়ে অনুশোচনা করে লাভ কী? বরং নতুন বছর আমাদের জন্য কতখানি সাফল্য বয়ে আনতে পারবে, আমাদের কল্যাণ ও সুন্দরের পথ দেখাতে পারবে সেই প্রত্যাশাই থাকে। আমরা নতুনের আহ্বানে মাতি। ভুলে যাই একটি বছরে কী আমাদের প্রাপ্তি, কতটুকুই বা সাফল্য আর কতটুকুই বা তার ব্যর্থতা। বাংলায় বৈশাখ এলেই বসন্তের প্রস্থান। তাকে বিদায় জানাতে নেই তেমন কোনো আলাদা আনুষ্ঠানিকতা। ইংরেজরা অবশ্য বছরকে বিদায় জানাতে উদযাপন করেন থার্টিফার্স্ট নাইট। বসন্তের বেলায় অবশ্য সে রকমটি নয়। অনুষ্ঠান হয় মূলত ১ বৈশাখেই। অর্থাৎ বাংলায় বর্ষবরণের মধ্য দিয়েই যেন উচ্চারিত হয় ‘বিদায় হে বসন্ত।’

চলতি বছরও আমরা যেন সেই মহেন্দ্রক্ষণে এসে পড়েছি। আর মাত্র কদিন পর বিদায় নেবে বসন্ত, আসবে নতুন বঙ্গাব্দ ১৪২৫। বসন্ত বছরের শেষ ঋতু তাই পুরোনো সব জরাজীর্ণতা, দুঃখ, বেদনা, ক্লেশ বসন্তের সঙ্গে ধুয়েমুছে যাবে, নতুন সম্ভাবনা, সুখ, সমৃদ্ধি, স্বপ্ন নিয়ে আসবে নতুন বছর এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। পুরোনো দিনের সব ভুল, ভ্রান্তি, সংকীর্ণতা, ক্ষুদ্র মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যোমে, নব চেতনায় যেন সম্মুখে এগিয়ে যেতে পারি, বসন্তের বিদায় ক্ষণে আসুন আমরা সেই অপেক্ষায় থাকি।

কিউএনবি/রেশমা/৯ই এপ্রিল,২০১৮ ইং/সকাল ১১:৪৯