ব্রেকিং নিউজ
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:১৫

দখল-দূষনে ধুঁকছে শীতলক্ষ্যা-ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদী : বাড়ছে রোগ-বালাই

 

শেখ মোহাম্মদ রতন,স্টাফ রিপোর্টার : ইটিপি নেই অধিকাংশ শিল্পকারখানায়, বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে দেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার ঢাকার বুড়িগঙ্গা। সম্প্রতি এ নদীকে বাঁচাতে এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশে রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প। তবে ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ দিয়ে বয়ে চলা দুটি নদী শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীও প্রায় একই রকম দূষণের শিকার হলেও এগুলো রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেই কর্তৃপক্ষের।

জেলা দুটির অসংখ্য শিল্পকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীগুলোয়। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানিও।ইটিপি স্থাপনে শিল্পমালিকদের যেমন অনীহা রয়েছে, তেমনি অনেকে এটি স্থাপন করলেও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করছেন না। বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতাও খুবই সীমিত। পরিবেশবাদীরা বলছেন, নদী দুটি রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

শিল্পবর্জ্যে মৃতপ্রায় শীতলক্ষ্যা বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত।নারায়ণগঞ্জে অধিকাংশ শিল্পকারখানায় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) না থাকায় পরিবেশের পাশাপাশি শীতলক্ষ্যার পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। শিল্পকারখানার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের প্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।

পানিতে জীববৈচিত্রের জন্য ন্যূনতম ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকার কথা থাকলেও শীতলক্ষ্যায় রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। নারায়ণগঞ্জে ৩৪৪টি তরল বর্জ্য নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সরাসরি ও কয়েকটি ড্রেনের মাধ্যমে বর্জ্য নির্গমন করে, যা নদীতে এসে পড়ছে।

একই অবস্থা মুন্সীগঞ্জ দিয়ে বয়ে চলা ধলেশ্বরীরও। শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর ও চরমুক্তারপুরে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এবং ডাইং ও প্রিন্টিংসহ অংসখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ছাই এবং টেক্সটাইল মিলের বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।

এ নদীর সঙ্গে জোয়ার-ভাটায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার বিষাক্ত পানি যুক্ত হচ্ছে। ফলে ধলেশ্বরীর পানি দূষিত হয়ে নিকষ কালো রঙ ধারণ করেছে। তার ওপর শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগ সরকারি খাল দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের পাঁচ উপজেলার শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই। দেড় শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হলেও সেগুলো ঠিকমতো চলছে না।

গত দুই বছরে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায় পাঁচ-ছয় কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করলেও থেমে নেই দূষণ। প্রায় সময় ইটিপি পরিদর্শন করতে গিয়ে বাধার মুখেও পড়তে হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের।

অনেক প্রতিষ্ঠানকে বারবার জরিমানা করা হলেও ইটিপি স্থাপনে তারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। ইটিপি স্থাপন না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ছোট আকারের ডাইং ফ্যাক্টরি বলে জানা গেছে।

ফতুল্লার কাশিপুরে হাটখোলা-গোগনগর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা-ধলেশ্বরী নদীর সংযোগ খালের নয় হাজার বর্গফুট ভরাট করে সেখানে ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে বিকেএমইএর প্রভাবশালী এক নেতার শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তা উচ্ছেদে নোটিশ পাঠানোয় বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসনীম জেবিন বিনতে শেখ জানান, যেসব এলাকায় খাল দখল করে স্থাপনা করা হয়েছে, তালিকা তৈরি করে তা দখলমুক্ত করা হবে।

মুন্সীগঞ্জ শহরঘেষাঁ ধলেশ্বরী ছিল স্বচ্ছ টলটলে পানির জন্য বিখ্যাত। এখন তার পাড়ে দাঁড়ানোই দায়।মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম নদীবন্দর ঘাট থেকে শুরু করে শহরের কাছে চরকিশোরগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ দুই কিলোমিটার এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর পানি পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করে তুলেছে। শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর এলাকায় ধলেশ্বরীর দু’পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা টেক্সটাইল ও ডাইং মিল থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এগুলোর বেশির ভাগেরই ইটিপি নেই বলে জানা গেছে।

নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে সিমেন্ট তৈরির বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি, যার ক্লিঙ্কার ও ছাই উড়ে এসে পড়ছে ধলেশ্বরীর পানি ও আশপাশ এলাকায়। সিমেন্টের ছাই উড়ে ধলেশ্বরীর তীরবর্তী হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, নয়াগাঁও, মীরেশ্বরাই, মুক্তারপুর, চরমুক্তারপুরসহ আশপাশ এলাকার পরিবেশ দূষিত করে চলছে।

সামান্য বাতাস বইলেই সিমেন্ট ফ্যাক্টরির আশপাশের এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করেছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। শিল্পকারখানাগুলো নদীতীরও দখল করে নিচ্ছে। ফলে নদীটি অনেক স্থানেই সরু হয়ে পড়েছে।

শহরের উপকণ্ঠ নয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা শামিম হোসেন জানান, তাদের এলাকার অনেক নারী-পুরুষ ও শিশুরা ব্রঙ্কাইটিস, নিমোনিয়াসহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা ও ফসলাদিও।

তিনি আরও জানান, ধলেশ্বরীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নদীতে আগের মতো আর মাছও মেলে না।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর মুন্সীগঞ্জের সিনিয়র কেমিস্ট মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য নদীতে ফেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিল্পমালিকদের আইন না মানার প্রবণতা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের গা-ছাড়া ভাবের কারণে ধলেশ্বরীর অবস্থা দিন দিন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।এর প্রতিকারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন মহল।

 

 

 

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৬ই এপ্রিল, ২০১৮ ইং/সন্ধ্যা ৬:৩৪