১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:৩০

পাথরের বাহার

 

ডেস্ক নিউজ : দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর রকস মিউজিয়াম পঞ্চগড়ে অবস্থিত। এখানে রয়েছে পাথরের নানা দুর্লভ সংগ্রহ।

পঞ্চগড়ের ভূভাগে রয়েছে প্রচুর নুড়ি পাথর। ভূগর্ভের নুড়ি পাথরের কালানুক্রমিক নমুনা দিয়ে থরে থরে সাজানো মিউজিয়াম। তাই প্রতিদিন এ জাদুঘর দেখতে ভিড় জমায় দর্শনার্থীরা।

জেলা শহর থেকে আধাকিলোমিটার পূর্বে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে এ জাদুঘর। ভূখণ্ডের বয়স নির্ণয়, ভূমির বৈশিষ্ট্য, প্রাগৈতিহাসিক নমুনা সংগ্রহ, নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ ও গবেষণার জন্য এটি গড়ে ওঠে। কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. নাজমুল হক ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে এটি গড়ে তোলেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রকস মিউজিয়ামে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতির রং ও বৈশিষ্ট্যের আগ্নেয়শিলা, পাললিক শিলা, নুড়ি পাথর, সিলিকা, নুড়ি ও সিলিকা বালু, হলুদ ও গাঢ় হলুদ রঙের বালু, খনিজ বালু, সাদা মাটি, কুমার মাটি এবং কঠিন শিলা, সামুদ্রিক ঝিনুক, শঙ্খ, মৃত্পাত্র, প্রাচীন কালে মাটির কূপের জন্য ব্যবহৃত রিং, ব্রিটিশ আমলে ব্যবহৃত মাইলস্টোন। এখানে একটি জাতিতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাও স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র।

৩০০ থেকে দুই হাজার বছরের পুরনো ইমারতের ইট-পাথরের মূর্তি এবং পোড়ামাটির নকশা। এ ছাড়া রয়েছে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যবহৃত কাচিয়া, কাত্তি, ফুতি, খড়ম, টপুনি, তাড়ি, ঘোট, কিয়া ও সিঁদুরদানি। রয়েছে কালনাগ, মনসার পিতলের মূর্তি, বিষহরির মূর্তি, বিষ্ণু-গণেশের মূর্তি, ধাতব পাত্র, প্রদীপ, পঞ্চপ্রদীপ, কুঠি (কাশ দিয়ে তৈরি), টার শিকিয়া, অশ্মীভূত পিঁপড়ার বাসা, হুলির গানে ব্যবহৃত ঢোল, হিন্দু আদিবাসীদের ব্যবহৃত বিয়ের ডালা, প্রবাল পাথর, একতারা, পাথরের সেতুতে ব্যবহৃত আয়ুধ, সাকামচুকি (সাঁওতালদের ব্যবহৃত বিড়ি), তীর-ধনুক, মোঘল সৈনিকদের ব্যবহৃত তরবারি, পাথরের বাটি, জীবজন্তু ও ফুলের নকশা উত্কীর্ণ বাঁশের বেড়া। যা ১৯২২ সালে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। রাজমহল পাহাড়ের কালো পাথর, বিভিন্ন প্রাচীন মুদ্রাসহ দুর্লভ সব সংগ্রহ। এখানে ‘বায়ান্ন থেকে বাহাত্তর’ শিরোনামে একটি ফটো গ্যালারিও রয়েছে। মিউজিয়ামের মূল ভবনের ভেতর রয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন দুটি নৌকা।

একটি শালগাছ কেটে মাঝখানে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। নৌকা দুটির দৈর্ঘ্য ২২ ফুট ছয় ইঞ্চি। এ ধরনের নৌকা প্রাচীন কালে আদিবাসীরা প্রশান্ত মহাসাগরের দীপপুঞ্জে ব্যবহার করত।এ ছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির বেলে পাথর, গ্রানাইট পাথর, কোয়ার্জাইট ব্যাসল্ট, শেল-মার্বেল বিভিন্ন নাম ও বর্ণের শিলা, সিলিকায়িত কাঠ বা গাছ থেকে পাথর। এসব পাথর প্রথমবার দেখলে যে কেউ বিস্মিত হতে পারে। শত শত বছর মাটির নিচে থাকার পর এসব গাছের গুঁড়ি পাথরে রূপান্তর হয়ে গেছে। এ ছাড়া রয়েছে নকশা করা অলংকৃত খিলান, বিভিন্ন রেখা ও চিত্রাঙ্কিত শিলা, লোহা মিশ্রিত মাটি, লোহাকাচি। প্রাচীন কালে রাজা-মন্ত্রীরা বসতেন এমন পাথর, চাইনিজ বর্ণ অঙ্কিত পাথর, এক হাজার ৪০০ বছর আগে এ অঞ্চলের পৃথু রাজা এক ধরনের স্লাব তৈরি করতেন ভবনে ব্যবহারের জন্য। সেই পাথরও রয়েছে এখানে। এসব পাথর খোদাই করে ভবন নির্মাণ করা হতো।

গাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি হওয়া পাথর, কোয়ার্জাইট শ্রেণির পাথর, যা ঠাকুর হিসেবে পূজা করা হতো; কোয়ার্জাইট মার্বেল শ্রেণির পাথর, যা সমাধিতে স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হতো।এ ছাড়া প্রাচীন কালে নদী বা পুকুরঘাটে কাপড় কাচায় ব্যবহৃত পাথর ও নীলচে গ্রানাইট বেলে পাথর রয়েছে।এখানে রয়েছে পাথরে খোদিত তীর, ধনুক ও দেবীর চোখের চিত্র অঙ্কিত পাথর।

এ মিউজিয়ামের বেশির ভাগ পাথর জেলার ভিতরগড় দুর্গ ও পাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিতরগড় ছিল তৎকালীন পৃথু রাজার রাজধানী।পাথরগুলো বিশ্লেষণ করে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির সঙ্গে এ অঞ্চলের নিবিড় সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আফসানা রানু বলেন, ‘আমি যতটা শুনেছি, তার চেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। এখানে সত্যিই অসাধারণ সব সংগ্রহ রয়েছে। আমি এর আগে পাথরের এত সংগ্রহ কোথাও দেখিনি।’

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এর আগেও একবার এসেছিলাম। এবার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আসলে না দেখলে বোঝা যাবে না, এখানে কত দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে।’

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হাসনুর রশিদ বাবু বলেন, ‘পঞ্চগড়ের লোকজ ইতিহাস ও ঐহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হক এই মিউজিয়াম গড়ে তোলেন। তবে আরেকটু নজর দেওয়া গেলে এই মিউজিয়াম আমাদের প্রাচীন ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।’

ইতিহাস গবেষক আলী ছায়েদ বলেন, ‘রকস মিউজিয়ামে গবেষণার পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই মিউজিয়াম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।’

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কানাই লাল কুণ্ডু বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে এই মিউজিয়াম দেখতে আসে। আমরা চেষ্টা করছি কালানুক্রমিক সংগ্রহগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে তুলে ধরার। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কিউরেটর না থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়।’

 

 

 

কিউএনবি/রেশমা/১লা এপ্রিল, ২০১৮ ইং/সকাল ৯:৩০