২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৮:০১

অপারেশনে চোখ খোয়া: কার্যক্রম বন্ধ, চিকিৎসকের সনদ তলব

 

ডেস্ক নিউজ : চুয়াডাঙ্গা ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল হাসপাতালে ছানি অপারেশনের পর ২০ রোগীর চোখ হারানোর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বৃহস্পতিবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলম হাসপাতালটির চক্ষুবিষয়ক সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের একাডেমিক সব সনদ তলব করা হয়েছে।

ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. শফিউল কবির জিপু পরিবর্তন ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকেলে সিভিল সার্জন স্বাক্ষরিত (সিএস/চুয়া/শা-৩/২-১৮/৭০৫ নং স্বারক) পত্রটি আমরা হাতে পেয়েছি। এরপর থেকেই আমরা হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দিয়েছি।’

হাসপাতাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আজ হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ একেবারেই কম। চক্ষু সেবার ইনডোর, আউটডোর, চেম্বারসহ অপারেশন থিয়েটারে তালা দেয়া।

ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. শফিউল কবির জিপু বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা চরম বিব্রত। বিগত দুই যুগ ধরে খুলনা বিভাগে আমরা চিকিৎসাসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল। এখন সব শেষ হয়ে গেল।’

তবে ডা. শফিউল কবির জিপু দাবি করেন, ‘অপারেশন করার পর যে ২০ জনের চোখে ইনফেকশন ধরা পড়েছে, সেখানে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কোনো ত্রুটি নেই।’

তিনি বলেন, ‘অপারেশনে ‘ওরাবুলু’ নামের ব্যবহৃত কিডসে গার্ম নেগেটিভ সেসিলি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর এ থেকেই রোগীদের চোখে ইনফেকশন হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

অপারেশনে ব্যবহার করা কিডসে গার্ম ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালটির এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিটি ভারতীয়। এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে ম্যানেজমেন্ট দফায় দফায় বৈঠক করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতায় স্বাস্থ্য বিভাগ বিব্রত। ইতোমধ্যে আমিসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। পাশাপাশি অপারেশনে ব্যবহার করা ওষুধপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত হাসপাতালটির চক্ষু সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও জানান ডা. খায়রুল আলম।

গত ৫ মার্চ চুয়াডাঙ্গা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোমিরয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে ছানিপড়া ২৪ রোগীর একটি করে চোখ অপারেশন করা হয়।

অপারেশনের একদিন পরই ছাড়পত্র দিয়ে রোগীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাড়ি ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০ রোগীর চোখে যন্ত্রণা শুরু হয়।

পরে তারা একে একে পুনরায় ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিক পরীক্ষায় ২০ রোগীরই চোখে ধরা পড়ে ইনফেকশন। অবস্থা বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপনে তাদের ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও ভিশন আই হাসপাতালে ভর্তি করান।

সেখানে ২০ জনের প্রত্যেকের পুনরায় অপারেশন করে ইনফেকশনে নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখটি তুলে ফেলে দেয়া হয়।

বিষয়টি নিয়ে বুধবার অনলাইন এবং বৃহস্পতিবার জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী সমালোচনার সৃষ্টি হয়। একসঙ্গে ২০ জন দরিদ্র মানুষের চোখ হারানোর ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়।

অনেকে এ ঘটনায় অস্ত্রোপচারকারী ডা. মোহাম্মদ শাহীনের চিকিৎসা সনদ বাতিলের দাবি তোলেন। কেউ আবার তাকে আইনের আওতায় আনার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তবে ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন অস্ত্রোপচারকারী ডা. মোহাম্মদ শাহীন।

এদিকে, বুধবার দুপুরেই চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলমের নির্দেশে সদর হাসপাতালের চক্ষু কনসালটেন্ট ডা. শফিউজ্জামান সুমনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটির প্রধান চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চক্ষু কনসালটেন্ট ডা. শফিউজ্জামান সুমন পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ২৪ রোগীর অস্ত্রোপচারকারী ডা. মোহাম্মদ শাহীনের চিকিৎসার সব সনদ স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জনের কাছে পেশ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শনিবার তদন্ত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাজ শুরু করবে।

এদিকে, চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল হাসপাতালে চোখের অপারেশন করিয়ে চোখ হারিয়ে অনিশ্চয়তার প্রহর গুণছেন চুয়াডাঙ্গা গাইদঘাটের গোলজার হোসেন, আলুকদিয়ার ওলি মোহাম্মদ, আলমডাঙ্গার বাড়াদী এনায়েতপুরের খন্দকার ইয়াকুব আলী, খাসকররার লাল মোহাম্মদ, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার সোনাপট্টির আবনী দত্ত, আলমডাঙ্গা মোড়ভাঙ্গার আহমেদ আলী, হারদীর হাওয়াতন, দামুড়হুদা লক্ষ্মীপুরের তৈয়ব আলী, মদনার মধু হালদার, আলমডাঙ্গা নতিডাঙ্গার ফাতেমা খাতুন, খাস-বাগুন্দার খবিরন নেছা, জীবননগর সিংনগরের আজিজুল হক, দামুড়হুদা চিৎলার নবীছদ্দিন, মজলিশপুরের সাফিকুল ইসলাম, আলমডাঙ্গা রংপুরের ইকলাস, দামুড়হুদা কার্পাসডাঙ্গার গোলজান, সদাবরীর হানিফা, আলমডাঙ্গা স্টেশনপাড়ার কুতলি খাতুন, কুটি পাইকপাড়ার উষা রাণী ও দামুড়হুদার বড় বলদিয়ার আয়েশা খাতুন।

চোখ হারানো চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার সোনাপট্টির আবনী দত্ত আক্ষেপ করে বলেন, ‘বয়সের ভারে এমনিতেই ঠিকমত চলাফেরা করতে পারি না। প্যাকেট বানিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতাম। একটি চোখ উঠানোর পর অন্য চোখটিতেও ঠিকমত দেখতে পাচ্ছি না। এখন কি করে সংসার চালাব- এ ভেবেই রাতে ঘুমাতে পারছি না।’

প্রায় অভিন্ন কথা বলেন আলমডাঙ্গার বাড়াদী এনায়েতপুরের খন্দকার ইয়াকুব আলী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে মানুষ যায় সুস্থ হতে। আর আমরা গিয়ে অন্ধ হলাম। এখন বৃদ্ধ বয়সে কি করব, কে আমাদের দায়ভার নেবে?’

চুয়াডাঙ্গা গাইদঘাটের গোলজার হোসেন ছিলেন এমনিতেই প্রতিবন্ধী। দর্জির কাজ করে সংসার চালাতেন। চোখ হারিয়ে এখন ঘোর অন্ধকার দেখছেন তিনি।

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/২৯শে মার্চ, ২০১৮ ইং/রাত ৮:১৪