১৬ই জুন, ২০১৯ ইং | ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৪৮

ভুলে যাওয়া সেই গণহত্যা

 

চৈত্রের দুপুরে বাংলা একাডেমির পুকুরপাড়ে বসে বেলি রানী শোনালেন ৪৭ বছর আগে তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া এক মর্মন্তুদ কাহিনি। দুঃসহ সেই রাতে স্বামী সরযু দাশসহ পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয় তাঁর চোখের সামনে। দুধের শিশুটিকে বুকে নিয়ে সারা রাত পালিয়ে থেকে ভোরবেলা দেয়াল টপকে বেরিয়ে যান নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। পেছনে পড়ে থাকে ধ্বংসস্তূপ আর আপনজনের লাশের দেহাবশেষ ও ছাইভস্ম।

বাংলা একাডেমির পুকুরপাড় ঘটনাস্থল বেশি দূরে নয়-রাস্তার উল্টো দিকে এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম। ওই রাতে সেখানে পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা ঢুকে পড়ে ভয়াবহ এক গণযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। ৮৫ থেকে ১০০ জনকে হত্যা করা হয় সেখানে। তখন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।

ওই রাতে শংকর লাল ঘোষ হারিয়েছেন ঠাকুরদা ধীরেন ঘোষকে। ছোট দুটি বোন মিতা ও গীতা আর বাবা গণেশ মুচিকে হারিয়েছেন দিলীপ দাশ। বড় ভাই ত্রিদিব কুমার রায় ও নানা বাদল চন্দ্র রায়কে হারিয়েছেন বিপুল রায়।

এ রকম আরও কত হারানোর গল্প। ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার ধারাবাহিকতায় এক রাত পরেই রাজধানীর বুকে ঘটে যাওয়া এই গণহত্যার ঘটনা প্রায় চাপা পড়ে গেছে। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও ওই রাতের নিহত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘রমনা কালীমন্দির ও আশ্রমে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁরা “গণশহীদ”। তাঁদের পরিবার স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করলে আমরা বিষয়টি প্রক্রিয়ার মধ্যে নেব।’

কারণ অনুসন্ধানের জন্য কমিশন

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য ২০০০ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি কে এম সোবহানকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের ‘রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ গণতদন্ত কমিশন’ গঠিত হয়। পরবর্তী পাঁচ মাস ধরে কমিশন নিহত পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তিবর্গসহ শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করে।

গণতদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালি জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ২৬ মার্চ বেলা ১১টার দিকে প্রথম প্রবেশ করে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন মন্দির রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের অঙ্গনে। তারা মন্দিরের লোকজন ও আশ্রমবাসীকে না বেরোনোর জন্য বলে যায়। ২৬ মার্চ দিবাগত রাত দুইটার দিকে মন্দির ও আশ্রম ঘেরাও করে পাকিস্তানিরা। সার্চলাইটের আলোয় গোটা এলাকা আলোকিত হয়ে যায়। শুরু হয় গোলাবর্ষণ।

কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আচমকা হামলায় প্রাণভয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। মেয়েরা শাঁখা খুলে ফেলেন, সিঁদুর মুছে ফেলেন। মন্দির ও আশ্রমের বিভিন্ন স্থানে অনেকে লুকিয়ে পড়েন। সেনারা বন্দুকের মুখে সবাইকে খুঁজে বের করে মন্দিরের সামনে এনে দাঁড় করায়। এরপর গুলি চালিয়ে ৮৫ থেকে ১০০ জনকে হত্যা করে। ভোর চারটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী রমনা ত্যাগের সময় বেশ কয়েকজন তরুণীকে ধরে নিয়ে যায়, যাদের আর ফিরে পাওয়া যায়নি।

এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি


এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া একজন শংকর লাল ঘোষ। তখন তাঁর বয়স ১৬ কি ১৭। এখন তিনি থাকেন যাত্রাবাড়ীর কলাপট্টি লেনে। ১৮ মার্চ প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে শংকর লাল ফিরে গেলেন সেই রাতে। তখন আশ্রমে ৭৫ টির মতো পরিবার বসবাস করত। কাঠের বেড়া আর টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট ঘর। একেক জনের একেক পেশা। তাদের ছিল দুধের কারবার। কারফিউয়ের কারণে সেখান থেকে অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল। আবার অনেকে সাহস করে থেকে যায়।

শংকর বলছিলেন, রমনা কালীমন্দিরের পুরোহিত পরমানন্দ গিরিকে পাকিস্তানিরা জিজ্ঞেস করে, তিনি হিন্দু না মুসলমান। পরমানন্দ হিন্দু এবং এই মন্দিরের পুরোহিত বলে নিজের পরিচয় দিলে তাঁকে জোর করে কালেমা পড়ানো হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে পেট চিরে ফেলে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই রাতেই পাকিস্তানিদের গুলিতে নিহত হন শংকরের দাদা ধীরেন ঘোষ। পরে সকালবেলা হাইকোর্টের দিকে পালিয়ে যান শংকর।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী দিলীপ দাশ। বয়স তখন তাঁর ১৪। দিলীপ এখন কামরাঙ্গীরচরে জুতোর কাজ করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা ঢুকে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। আগুন নিক্ষেপ করে। চোখের সামনে পুড়তে থাকে মন্দির আর আশ্রম। পুরুষদের এক লাইনে দাঁড়িয়ে ব্রাশফায়ার করে তারা। সেদিন রাতে মা তাঁকে নিয়ে এক ফাঁকে বের হতে পারেন।

বেলি রানী এখন বাংলা একাডেমিতে চাকরি করেন। ১৮ মার্চ একাডেমির পুকুরপাড়ে বসে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। তখন ১৭ বছর বয়সী বেলি এক সন্তানের মা। ২৬ মার্চ দিবাগত রাত দুইটায় পেছনের দিকে শৌচাগারে লুকিয়ে থেকে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ভোরবেলা কাপড় ছেড়ে শরীরে কাঁথা পেঁচিয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে যান কলাকোপা।

মন্দির ও আশ্রমে নিহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, নিহতের সংখ্যা শতাধিক। কারও মতে, সংখ্যাটি ৮৫ থেকে ১০০। গণতদন্ত কমিশন বিভিন্ন জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ৫০টি নাম পেয়েছে। আবার মন্দিরের সামনে নির্মিত স্মৃতিফলকে আছে ৬১ জনের নাম।

কেটে গেছে বহুদিন, মেলেনি স্বীকৃতি


মন্দির ও আশ্রমে নিহতদের ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে পরিবারগুলো। বিভিন্ন সময় তাঁরা সরকারের কাছে স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তার আবেদনও জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে একবার এককালীন অনুদান দেওয়া হয়েছিল। কোনো নিয়মিত ভাতা পাননি তাঁরা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি কমিটি প্রতিবছর মন্দির ও আশ্রমে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এখন ৬১টি পরিবারের খোঁজ এই কমিটির কাছে আছে। কমিটির উদ্যোগে ২০০১ সালে মন্দিরের সামনে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়।

এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল রায় বাংলা একাডেমির চুক্তিভিত্তিক একজন কর্মী। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ খুব একটা দেখা যায় না। এখানে নিহতদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি আমাদের প্রধান দাবি।’

সাংবাদিক, লেখক ও গণতদন্ত কমিশনের সদস্য শাহরিয়ার কবির বলেন, তারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কি না বা সংজ্ঞায় পড়বে কি না, তা জানি না। তবে শহীদের স্বীকৃতি তাদের পেতেই হবে। যথাযথ ক্ষতিপূরণও তাদের প্রাপ্য।

তাঁর কথা, এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের জায়গা দিলে, আমরা সেখানে স্মৃতিফলক নির্মাণ করে দিতে পারি।’

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/২৫.৩.১৮/১১.২৬

Please follow and like us:
0
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial