২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:১৩

লালমনিরহাটে হারিয়ে যাওয়া পাতকুয়ার সেকাল একাল

 

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না,লালমনিরহাট প্রতিনিধি : আমি কি বালতিতে করে জল তুলিনি’ জীবনানন্দ দাসের কবিতায় ‘বালতিতে করে জল তোলা’র এই অনুষঙ্গটি বিশেষ এক ভাবের দ্যোতনা প্রকাশ করে। কিন্তু বাস্তবে ‘বালতিতে জল তোলা’র প্রসঙ্গ আসলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার বৎসরের আবহমান বাঙালির পানীয় জলের উৎস পাতকুয়ার ছবি। বাঁশের কোঠায় ঝুলানো লম্বা রশির মাথায় বাঁধা বালতিতে রশি টেনে জল তোলা কারো কারো মূর্ত রূপ।

মাটির উপরি স্তর থেকে স্বচ্ছ জলের স্তর পর্যন্ত গভীরে খোড়া গোলাকার কুপ,-এই কুপ থেকেই কুয়া। বাংলায় ‘পাত’ শব্দটি ‘ছোট’ অর্থে ব্যবহার হয়। এই পাত-এর সাথে কুয়া শব্দটি যোগ হয়ে পাতকুয়া শব্দটি এসেছে। ‘পাতকুয়া’র সমর্থক শব্দ ইদারা। এর অপভ্রংশ রূপ ‘ইন্দিরা’। সাধারনত পানীয় জলের অগভীর কুপ-ই পাতকুয়া।

এই অগভীরে খোড়া গোলাকার গর্তের ভেতরে বালি-পাথর ও সিমেন্টের তৈরী কিংবা পোড়া মাটির তৈরী গোলাকার পাট, কখনো বাঁশের তৈরী খাঁচা বেষ্টনী হিসেবে ব্যবহার হত। তাই পাতকুয়া কোথাও কোথাও পাটকুয়া, মজার ব্যাপার হলো খুব কম সংখ্যক মানুষের মুখে কুয়া শব্দটি শোনা যেত। এই কুয়া, কুয়া নয়, ‘চুয়া’হয়েই উচ্চারিত হত সর্ব সাধারনের মুখে মুখে।

ভৌগোলিক দিক থেকে বাঙালির সংসার ছিল জলময়। একটা সময় ছিল নদী বিধৌত বাংলা যেন ছিল একটা জলাধর। এই উম্মুক্ত জলাধর ছেড়ে ভারত উপমহাদেশের বাঙালি অধ্যুসিত বাংলার মানুষ কবে থেকে পানযোগ্য পানির জন্য পাতকুয়ার ব্যবহার শুরু করে তার ইতিহাস এখনো প্রচ্ছন্ন। তবে প্রজা হিতৈষী স¤্রাট অশোকের সময়ে প্রজাদের পানীয় জলের সুবিধার্থে পাতকুয়া খননের ইতিহাস জানা যায়।

এই পাতকুয়ার ভিতরে পোড়ামাটি কিংবা পাথর বালুর তৈরী পাটের বেষ্টনী দিয়ে তৈরী কুয়া ছিল দুর্লভ। এটা কেবল রাজা-বাদশা কিংবা ধনীক শ্রেণির মানুষের বাড়িতে দেখা যেত। পরবর্তীতে মোঘল আমলে মোঘল বাদশাহ্দের পৃষ্টপোষকতায় এবং বাংলার নবাব শেরশাহের আমলে মুফাসির ও পথিকদের জন্য মহাসড়কের পাশে এবং বসত এলাকার পাড়ায় পাড়ায় অধিক সংখ্যক মানুষের জন্য একটি করে পোড়া মাটির বেষ্টনী সমৃদ্ধ কুয়া নির্মিত হওয়ার ইতিহাস পাওয়া যায়।

এর পর প্রাচীন কাল থেকে নিয়ে বিংশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত ব্যবহারের দিক থেকে পাতকুয়ার ইতিহাস, সমৃদ্ধ ইতিহাস। পাটের বেষ্টনী সমৃদ্ধ এ সময়ের পাতকুয়া আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হত। নি¤œ শেণির মানুষ সুপেয় পানির জন্য ধনীক শ্রেণির মানুষের পাটে বেষ্টনী পাতকুয়ার ধারে ভীর জমাতো। আশির দশকে ডিস্ট্রীক বোর্ডের অধীনে জেলার জনবহুল অঞ্চলে এবং জেলা সদরে পাটের বেষ্টনীর পাতকুয়া বসানো হয়। নব্বই দশকের প্রথম থেকেই নলকুপের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে পাতকুয়ার ব্যবহার কমে আসে, চাপা পড়ে পাতকুয়ার কৌলিন্য।

পাতকুয়া সম্পর্কে ডেইলী বাংলাদেশকে স্মৃতিচারণ করলেন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছাত্তার-‘আমার নিজের বাড়িতে পাটের বেষ্টনীতে পাতকুয়া ছিল। একবার প্রচন্ড বৃষ্টিতে কুয়াটি ভেতর দিক থেকে ঢলে পড়লে দীর্ঘদিন খোলা জায়গার পানি ব্যবহার করতে হয়েছে। এরপর এটি আর সংস্কার করি নি। নলকুপ ব্যবহার করে আসছি তখন থেকে। সাধারনত তিন ধরনের বেষ্টনী ব্যবহার হত পাতকুয়ায়।

স্বচ্ছল অভিজাত পরিবারের মানুষেরা ভারতের রানিগঞ্জে তৈরী বীমপাট নামে এক ধরনের মূল্যবান মসৃন পাট ব্যবহার করতো। এই পাটে শ্যাওলা জমতো না। পানি দূষিত হওয়ার সুযোগ ছিল কম। মধ্যম শ্রেণির মানুষেরা কুয়ায় পাথর-বালি ও সিমেন্টের তৈরী পাট ব্যবহার করত। গরীব অসচ্ছল পরিবারের লোকেরা বাঁশের তৈরী খাঁচা বেষ্টনী হিসেবে ব্যবহার করতো। বাঁশ পঁচে গন্ধ উঠত, এতে পানি দূষিত হলেও এই পাতকুয়ার পানিই ব্যবহার করত মানুষ। অন্য কোন উপায় ছিল না।’

আজকের তৃতীয় প্রজন্মের কাছে বালতি দিয়ে জলতোলার দৃশ্য ¯্রফে কল্পনা, বাংলায় পাতকুয়ার ব্যবহার এখন নেই। পাটগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অভিজাত কিছু পরিবারে পোড়া মাটির পাটের বেষ্টনীতে কিছু পাতকুয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর পানি অনেকেই গরুকে দেয়া খাবারের পানি হিসেবে ব্যবহার এবং সখের বশে বৎসরে এক-আধদিন গোসলের কাজে ব্যবহার করলেও নিজেদের খাবারের পানি হিসেবে ব্যবহার করেন না।

তবে কুয়ার পানিতে আর্সেনিক নামক সেঁকো বিষ সহনীয় মাত্রায় থাকায় পাটে বেষ্টীত পাতকূপের পানিকে নিরাপদ বলছেন পানি বিশেষজ্ঞরা।লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলীর বাড়িতে কয়েক দিন আগে কোঠায় ঝোলানো রশিতে বাঁধা বালতিতে করে জল তোলার দৃশ্য চোখে পড়ে গেল।

সেই সময় ডেইলী বাংলাদেশের সাথে কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলীর সাথে। তিনি জানালেন,‘ত্রিশ বৎসর আগে কুয়াটি নির্মাণ করেছি। তবে গত প্রায় বিশ বৎসর ধরে কুয়ার পানি পান করছি না, রান্নায়ও ব্যবহার করছি না। বাড়ির বাহিরের এ কুয়ার পানি গরু-বাছুরের গা ধোয়নো ও খাওয়ানোর কাজে ব্যবহার করছি।’

 

 

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/২৫শে মার্চ, ২০১৮ ইং/বিকাল ৪:৪৪