১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:২৪

দেশের আইনশৃক্সক্ষলা পরিস্থিতির অবনতি!

আমিনুল ইসলাম জমাদ্দার: একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে দেশে। খুনের মিছিলে প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে কারো না কারো নাম। ক্রমাগত এসব ঘটনায় বর্তমানে দেশের আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আইনশৃক্সক্ষলা পরিস্থিতির অবনতিতে স্বাভাবিক কারণেই মানুষ শঙ্কিত হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন ভয়ের সংস্কৃতিতে বসবাস করছে।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যাকান্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড ঘটে গেল। পত্রিকার খবর থেকে জানা গেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম জঙ্গিবাদীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠেছে। তরুণ প্রজন্ম রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।

এ ঘটনায় প্রতিবাদ মুখর হয়েছে সচেতন জনতা। দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ড নিয়ে রংপুরে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘দেশে এখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশে একের পর খুনের ঘটনা ঘটছে। খুনিরা জানে, খুন করলে বিচার হবে না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে খুনের ঘটনা। এই তিন মাসে ১৫শ’ মানুষ খুন হয়েছে। একটারও বিচার দেখিনি। যারা এ কাজ করছে তারা মানুষের কাছে প্রমাণ করতে চাইছে এদেশের আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ’। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে দেশের আইনশৃক্সক্ষলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরলেও তিনি সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের উদ্দেশ্যে কোন কিছুই বলেন নি বা কোন পরামর্শ দেয় নি। সরকারকে পরামর্শ দিলে অবশ্যই ভালো হতো। যাই হোক সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেশের আইনশৃক্ষলা পরিস্থিতি সামলাতে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও নীতিগত দায়িত্ব। এদিকে রাজধানীর উত্তর কলাবাগানে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাসসহ ২জন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ কিন্তু এখনও এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। কলাবাগানের ওই বাড়িতে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে ৫ থেকে ৭ জন দুর্বৃত্ত প্রবেশ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক ঐ কর্মকর্তাসহ দুইজনকে কুপিয়ে হত্যা করে। ভবনের নিরাপত্তার¶ীকেও তারা কুপিয়ে আহত করে।

নিহত জুলহাস সমকামী ও হিজড়াদের অধিকার সম্পর্কিত “রূপবান” নামক একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা যায়। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ¶োভ জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে হত্যাকান্ডের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের শাস্তির আওতায় আনতেও সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যাকান্ডের পর সেই রাজশাহীতেই আবার আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী চেম্বারের সাবেক প্রশাসক জিয়াউল হক টুকু নিহত হন। তার আগে ২২ এপ্রিল টুঙ্গিপাড়ায় পরমানন্দ রায় নামে এক সাধুকে হত্যা করা হয়। এদিকে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজার এলাকা থেকে হুমায়রা জাহান সুখী নামে এক বিমানবালার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারপর গাজীপুরের কাশিমপুরে দুর্বৃত্তেদের গুলিতে নিহত হয়েছেন কারারক্ষী রস্তম আলী। ওদিকে চট্টগ্রামের রাংগুনিয়ায় কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দু’জনকে। গাজীপুর ও মাগুরায় নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দু’জন। ফেনীতে আওয়ামী লীগের দু’গ্রæপের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন এক ছাত্রলীগ কর্মী। প্রতিনিয়ত এ রকম অসংখ্য খুনের ঘটনা ঘটছে দেশে। উল্লেখিত চিত্রের আলোকে আমরা বলতে পারি বর্তমানে দেশে যেন খুনের হিড়িক পড়েছে। গত ৬ এপ্রিল পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নাজিমুদ্দিন সামাদকে। একই সময় ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলে দুই বিদেশি হত্যা এবং কয়েকজন হিন্দু-খ্রিস্টান যাজককে হত্যা ও হত্যারচেষ্টা করা হয়। হত্যা করা হয় কয়েকজন ভিন্নমতাদর্শীকেও। এসব ঘটনায় জঙ্গিবাদ ইস্যু সামনে এলেও বেশির ভাগ ঘটনার হোতারা এখনও ধরা পড়েনি। খুনের ঘটনার জন্যে বিভিন্ন প¶ থেকে দেশে আল-কায়েদা ও আইএস সক্রিয় আছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে সরকার এ ধরনের অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে দেশ প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জননিরাপত্তা ইস্যুতে বিব্রত করতে মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে বিরোধীরা এ কাজ করছে।

 

এ প্রসঙ্গে ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করে বলেছেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারাই দেশে গুপ্ত হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতির বিষয় নয়। দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তাই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের হত্যাকান্ড চালানো হচ্ছে। যারা এ ধরনের হত্যাকান্ডে সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে’। দেশের সকল শান্তি প্রিয় মানুষও চায় খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে সরকার অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করবে। তা না করার প্রবণতা দেখা গেলে মানুষ হয়তো এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল বলেই ধরে নেবে। প্রতিটি হত্যাকান্ডেরই সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু বিচার হতে হবে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করতে হবে। উপরন্তু সাধারণ মানুষেকেও সাহস নিয়ে হত্যাকারী তথা অপরাধীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবে এ ব্যাপারে সরকারের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মূল দায়িত্ব পালনে করতে হবে। অপরাধীদের খুঁজে বের করে ধরতে না পারলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। সরকার যদি তা না পারে তাহলে অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা দেখা দিবে। এ কথা সত্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধপ্রবণতা বাড়ায়। তাই জন্যে কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেই চলবে না, তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমও গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা ও সুশীল সমাজের সচেতনতা ও সোচ্চার ভূমিকা আমাদের সংকট থেকে উত্তরণের পথে নিয়ে যাবে।

একের পর এক ও একই কায়দায় ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলোর কোনো রহস্যভেদ, খুনি চক্র শনাক্ত ও বিচার না হওয়ার কারণেই যে এসব ঘটনা ঘটে চলেছে; সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের হত্যাকান্ডের ঘটনার পর আইএস বা আলকায়েদা ও তাদের বাংলাদেশি সহযোগীদের পক্ষ থেকে যে দায় স্বীকার করা হয় বা হচ্ছে তা এড়িয়ে না গিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত প্রশাসনের। এই সব ঘটনায় মিডিয়াতে কিছুদিন তোলপাড় হয়। তারপর সব কিছু সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায়। আবার নতুন কোন ইস্যু নিয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার হয়। ফলে পুরানো ঘটনাগুলো ফাইল বন্দী হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনায় জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্যসহ দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করেছে এবং করছে। খুন, হত্যাকান্ড এ সকল অনৈতিক ও মানবাধিকার বিবর্জিত অন্যায় কর্ম কমাতে তাঁরা পরামর্শও দিয়েছে। কিন্তু সরকার এ নিয়ে তেমন কোন কর্ণপাত করছে না। প্রতিদিনই দেশের কোথায়ও না কোথায়ও খুনের বা হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এটা যেন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগে তনু হত্যা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হলেও এখনো ঘটনার রহস্য বের করে আনতে পারেনি আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী। তবুও আমরা আশাবাদী হতে চাই সরকার সকল খুন-হত্যাকন্ডের কূল-কিনারা বের করে আনতে পারবে। রাষ্ট্র যদি নিজের ব্যর্থতা আড়াল করার জন্যে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে সকল হত্যাকান্ড এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে তাহলে দেশে অপরাধমূলক কর্মকান্ড বাড়বে বই কমবে না। তাই যদি হয় তাহলে জনগণের মাঝে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ নিরন্তর লেগেই থাকবে।

 

কুইকনিউজবিডি.কম/এটি/২৫.০৬.২০১৬/০৫: ৫৫