২২শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৫:০৮

চিকিৎসক-সংকটে ধুঁকছে খাগড়াছড়ির স্বাস্থ্যসেবা

 

ডেস্ক নিউজ : লক্ষিছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বৃহস্পতিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বোটকা দুর্গন্ধে হঠাৎ অসুস্থ বোধ হলো। বারান্দার মেঝে স্যাঁতসেঁতে। সেখানে অপেক্ষা করছেন সেবা নিতে আসা মানুষজন। চারপাশে খসে পড়া পলেস্তারার স্তূপ। দেয়ালগুলোর খুব উঁচুতে জ্বলছে বৈদ্যুতিক বাতি, সেসবের আলো যেন ময়লা মেঝে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। তাই ভালো করে দেখা যাচ্ছে না সেবা নিতে আসা মানুষগুলোর মুখ। বারান্দায় ফ্যান নেই। ফ্যান নেই এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনেক কক্ষেও।

শুধু লক্ষিছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-ই নয়; এমন বেহাল অবস্থা খাগড়াছড়ির প্রায় প্রত্যেক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের। এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা পর্যাপ্ত জনবলের। বিশেষ করে, চিকিৎসক ও সেবিকা-সংকটের কারণে এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, শহরে ১০০ শয্যার একটি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল আছে। ৯ উপজেলায় একটি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও আছে। এছাড়া আছে ৩৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ১২৮ জন চিকিৎসকসহ একহাজার লোকবল থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন ৬৯ জন চিকিৎসক ও প্রায় তিন শ’ কর্মচারী। সূত্র আরও জানায়, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত ছুটিতে থাকায় প্রায় দিনই চিকিৎসকদের উপস্থিতি ৩০-৩৫ জনে নেমে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৯ উপজেলায় প্রায় ৬ লাখ মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে সদর হাসপাতালসহ উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গড়ে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ৫০ হাজার নারী-পুরুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাদের অনেকে চিকিৎসকের দেখা পান না। অনেকে বাধ্য হয়ে ফেনী বা চট্টগ্রাম গিয়ে চিকিৎসা করান।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, অবকাঠামোর দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে লক্ষিছড়ি, মহালছড়ি, দিঘীনালা ও মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

দিঘীনালা উপজেলার রশিকনগর গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দিঘীনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত স্টাফও নেই। আর যারা আছেন, তারাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। দুপুর ১২টার পরে চিকিৎসকদের খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।’

খাগড়াছড়ি সদরের ভুয়াছড়ি এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কেন্দ্রের চিকিৎসকেরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। তারা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।’

লক্ষিছড়ি উপজেলার দুর্গম বর্মাছড়ি এলাকার কালাধন চাকমা বলেন, ‘লক্ষিছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক পাওয়া মুশকিল। দুর্গম হওয়ায়, বাসস্থানের সমস্যা থাকায় ও নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় চিকিৎসকরা এখানে থাকতে চান না।’

খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘এটা সত্য, জেলার প্রত্যেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসক, স্টাফ সংকট আছে। এ বিষয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির প্রতিটি সভায় তুলে ধরেন সিভিল সার্জন। এছাড়া যারা কর্তব্যরত আছেন, সেসব চিকিৎসকদের অনেকের বিরুদ্ধেই কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ পেয়েছি। অনেকেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করান।’

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সুদর্শন দত্ত বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ আছে। সম্প্রতি এ অভিযোগে ৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটি তদন্তাধীন আছে। আরও কিছু অভিযোগ নিয়েও কাজ করছে দুদক। এটা সত্য যে, জেলার বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। কারণ, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্টাফ নেই। এছাড়া পর্যাপ্ত ঔষধও পাওয়া যায় না। হাসপাতালগুলোর বেহাল অবস্থা, পরিবেশ খুবই খারাপ। অনেক ভবনের সংস্কার হয় না দীর্ঘদিন। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব খারাপ। সবদিকে শুধু দুর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ। হাসপাতালগুলোই এখন অসুস্থ।’

জেলা সিভিল সার্জন মো. শওকত হোসেন বলেন, ‘সমস্যা ছাড়া কোনও সংস্থা নেই। সমস্যা সমাধানে আমি প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার, তাই এ নিয়ে অভিযোগ বেশি, সমাধানেও সময় লাগে।’

জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘চিকিৎসকদের অনেক পদ শূন্য। চিকিৎসকদের অবহেলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় কথা হয়, এটাও সত্য। তবে অল্প সংখ্যক চিকিৎসক সাধ্যমতো সেবা দিচ্ছে। তারপরও যে সব সমস্যা প্রকট, তার সমাধান হয়ে যাবে অচিরেই।’

 

 

কিউএনবি/রেশমা/১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং/ সকাল ৮:১০