২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৪৩

দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী মহাশোল মাছ বিলুপ্তির পথে

 

তোবারক হোসেন খোকন,দুর্গাপুর(নেত্রকোনা)প্রতিনিধি : নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কংস নদ ও সোমেশ্বরী নদীতেই দুঃপ্রাপ্য মহাশোল মাছের আবাসভুমি। মহাশোল মাছটিকে অনেকেই মহাশের, মাশোল, টর, চন্দনা প্রভৃতি নামে ডেকে থাকে।

মহাশোলের দুটি প্রজাতি। একটির বৈজ্ঞানিক নাম ঞড়ৎঃড়ৎ, অন্যটি ঞড়ৎঢ়ঁঃরঃড়ৎধ. আমাদের দেশে দুই প্রজাতির মহাশোলই পাওয়া যায়। নদীর পাথর-নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে ‘পেরিফাইটন’ নামের এক রকমের শ্যাওলা জন্মে। এগুলোই মহাশোলের প্রধান খাদ্য। মহাশোল সাধারণত ৫২ সেন্টিমিটার লম্বা ও নয় কেজি পর্যন্ত ওজন হয়ে থাকে। এর দেহ লম্বা, মুখ অধোমুখী, মাথা অপেক্ষাকৃত ছোট।

দেহের বর্ণ উপরের দিকটা বাদামী সবুজ, পেটের দিকটা রূপালী এবং পিঠের পাখনা লালচে বর্ণের হয়ে থাকে। মহাশোল দেখতে খুব সুন্দর, অনেকটা মৃগেল মাছের মতো। আমাদের মিঠাপানির মাছের মধ্যে মহাশোল স্বাদেও সেরা।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যাক্তিরা বলেন, সুসঙ্গ দুর্গাপুরে ঐতিহ্যবাহী নানিদ ও মহাশোল মাছ ছাড়া নতুন জামাইকে বরন করা হতো না। শহরের কোন গুরুত্বপুর্ন মেহমানকেও মহাশোল মাছ ছাড়া আপ্যায়ন করা যেন ঐতিহ্যগত ভাবেই মানা হতো না।

এ বিষয় নিয়ে সোমবার মাছ চাষী ইন্দ্র মোহন জানান, দুর্গাপুরে সোমেশ^রী নদীর মহাশোল মাছের উৎসমুখ গুলো প্রায় রয়েছে। শুকনো মৌসুমে কংশ ও সোমেশ্বরী নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বসবাস ও বংশবৃদ্ধির জায়গা নষ্ট হওয়ার ফলে মহাশোল মাছ প্রাপ্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বর্তমানে কোন কোন সময় পাওয়া গেলেও তাহা তিন থেকে চার হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। সোমেশ্বরী ও কংস নদী ছাড়াও আশপাশের হাওর, বিল-ঝিল বা অন্য কোনো মিঠা পানির নদ-নদীতেও হঠাৎ দেখা পাওয়া যায় মাছের রানী মহাশোল এর।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে জীবজগতের স্বাভাবিক আচরণগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন আসায় মাছের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। দুর্গাপুর উপজেলা মৎস কর্মকর্তা জনাব দৌতল উল্লাহ মুরাদ বলেন, মহাশোলের বংশ রক্ষার জন্য ময়মনসিংহে মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র কাজ করছে প্রতিনিয়ত।

চকলেঙ্গুরা গ্রামের মাছ ব্যাবসায়ী মোহাম্মদ আলী জানান, পুকুরে মহাশোলের চাষ সফল না হওয়ার মুল কারন হচ্ছে, পুকুরে মাছটির বৃদ্ধি খুবই ধীর গতিতে। গতবছর আমরা পোনা ছেড়ে দেখেছি, দুই থেকে দেড় বছরে মাত্র দেড় কেজি ওজন হয়েছে। যে কারণে স্থানীয় জেলেরা বাণিজ্যিকভাবে পুকুরে মহাশোল চাষে আগ্রহ দেখায়না। তবে সবকিছু কেবল বাণিজ্যিক ভাবে দেখবো তা নয়, আমাদের দুর্গাপুরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেও মাছটি চাষ করে এ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

এই মাছের বংশ বিস্তারে সরকারী ভাবে যদি কোন উদ্দ্যোগ না নিলে, বিলুপ্তই হয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী মহাশোল মাছ। সরেজমিনে গিয়ে জানাগেছে, সোমেশ্বরী নদীতে অপরিকল্পিত ভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের কারনে নদীর জলজ উদ্ভিদ, বাংলাড্রেজারের প্রপেলারের আঘাত ও সেলো মেশিন গুলো থেকে নির্গত পোড়া মবিল পানিতে সংমিশ্রনের কারনে নদীগুলো থেকে মূল্যবান নানিদ, মহাশূল ও লাচু মাছ গুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মুল কারন বলে মনে করছেন এলাবাসী। নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু ও পাথর উত্তোলন তথা পরিবেশ এর হাত থেকে নদী রক্ষার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয় সুশিল সমাজ।

 

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং/বিকাল ৪:০৫