২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৫:১১

হুমকির মুখে ৩৫০ কোটি টাকার বাঁধ

 

ডেস্ক নিউজ : পাবনার বেড়া উপজেলায় যমুনা নদীর ভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধ এখন হুমকির মুখে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে এর তিন কিলোমিটার এলাকার সিসি ব্লক ধস ও চুরির ফলে বাঁধটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে যমুনা নদী তীরবর্তী পাঁচটি গ্রামে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বাঁধটির এই দুরবস্থা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে অতি দ্রুত বাঁধটির বিভিন্ন পয়েন্টে সংস্কার করা না হলে দেখা দিতে পারে মারাত্মক ভাঙন।

এ ব্যাপারে বেড়ার কৈটলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসহান হাবিব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরিপ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আগামী অর্থবছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সংস্কার কাজ করা হবে। এলাকার মানুষের মাধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া ব্লক-জিও ব্যাগ চুরি ও প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিসাধন ঠেকানো সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

প্রতিরক্ষা বাঁধটির টপ কয়েক জায়গায় তিন থেকে চার ফুট করে দেবে গেছে। বাঁধটির কোল ঘেষে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন, সিসি ব্লক চুরি ও ধসে যাওয়ায় বাঁধের মাটি বের হয়ে গেছে বলেও জানা যায়। বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীর মূল ধারাটি সরাসরি মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় আঘাত করে। ফলে আগামী বর্ষা মৌসুমে প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মান স্রোতের টানে ও ঢেউয়ের আঘাতে এসব স্থানে মারাত্মক ভাঙন দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে নদীপাড়ের বাসিন্দারা।

বেড়া পাউবো সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ এলাকায় তিনটি পয়েন্টে প্রতিরক্ষা বাঁধের আট ফুট দৈর্ঘের টপ দুই থেকে তিন ফুট করে ডেবে গেছে। সিসি ব্লক আলগা হয়ে পড়েছে। মোহনগঞ্জের ভাটিতে মালদাহপাড়ায় দুটি পয়েন্টে ১০ ফুট দৈর্ঘের পাঁচ থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত বাঁধের টপ ডেবে গেছে।

এ ছাড়া সামান্য দূরে বাঁধের টপ থেকে স্লোপের নিচ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ফুট এলাকাজুড়ে ব্লক চুরি হয়ে যাওয়ায় মাটি বেড়িয়ে পড়েছে। অনেক জায়গা থেকে চুরি হয়ে গেছে প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচে নদীতে ফেলা সাপোর্টিং ব্লক। মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় প্রতিরক্ষা বাঁধের সাথে লাগানো দুটি ইটভাটায় মালবোঝাই ট্রাক চলাচল করছে। ট্রাকের ঝাঁকুনিতে প্রতিরক্ষা বাঁধের সিসি ব্লক ধসে পড়ছে। নাকালিয়া বাজার পয়েন্টে সিসি ব্লক ধসে গেছে। এ ছাড়া মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাঁধের কোলঘেষে বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি বোমা মেশিনের (দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রেজার) সাহায্যে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

পাউবোর ২০০০ সালের এক জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাবনার বেড়ায় গত ৪০ বছরের অব্যাহত নদী ভাঙনে যমুনা ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে আসে। এ সময়ে যমুনার ভাঙনে ৭২টি গ্রাম, ১০ হাজার একর ফসলি জমি, ১২টি হাট-বাজার, ৩৫টি স্কুল-মাদ্রাসা, ১৫টি মসজিদ মন্দির, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অন্য এলাকায় বাড়ি করেছে, সহায়-সম্বল হারিয়ে ১৫ হাজার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়। নদী ভাঙনে ভূমিহীন হয়ে পাঁচ হাজার মানুষ বস্তিবাসী হয়েছে শহরে। ওই প্রতিবেদনে যমুনা নদী স্থায়ী ভাঙন রোধের সুপারিশ করা হয়।

এই সুপারিশের আলোকে তৎকালীন সরকার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়ার মোহনগঞ্জ থেকে কৈটলা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্প হাতে নেয়।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা-মেঘনা রিভার ইরোশন মিটিগেশন প্রকল্পের আওতায় যমুনা নদীর সবচেয়ে বেশি ভাঙন প্রবণ পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে রাকশা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ ২০০৪ সালে শুরু হয়ে ২০০৮ সালে শেষ হয়। প্রায় ১৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে (ডানতীর) প্রতিরক্ষা বাঁধটি তৈরি করা হয়।

প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে মোহনগঞ্জ থেকে রাকশা পর্যন্ত যমুনা নদীর ভাঙন বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পশ্চিম পাড়ে চর জেগে উঠতে থাকে। এই কাজে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে গ্লোবাল পজিশনিং (জিপিএস) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

সফলভাবে জিপিএস পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্থায়ী ভাঙনরোধ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় গত ১০ বছর বেড়াবাসী যমুনা নদী ভাঙনের তাণ্ডবলীলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। এর ফলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, কৈটলা পাম্পিং স্টেশনসহ ৩০টি গ্রাম ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। এতে যমুনা নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছিল।

তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আবারো ভাঙনের মুখে পড়তে পারে নদীপাড়ের বাসিন্দারা।

 

 

কিউএনবি/রেশমা/২৩শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং/সকাল ৯:১৬