২০শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:৩৯

ভোটের জটিল অঙ্ক রংপুরে

 

ডেস্ক নিউজ : রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণা চলছে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা। তাদের পক্ষে মাঠে রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই জয় পরাজয়ের হিসাব কষছেন ভোটাররা। স্থানীয়রা বলছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু, বিএনপি’র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা দলীয় ভোটের বাইরে সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য দলের ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়দের ধারণা দলীয় ভোটের বাইরে সাধারণ ভোটার ও অন্য দলগুলোর ভোটের হিসাব ফলে প্রভাব ফেলবে। তারা বলছেন, এ তিন প্রার্থীর যে দলীয় ভোটের বাইরে সাধারণ ভোটারদের টানতে পারবেন তার জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। ভোটের হিসাব যতই জটিল হোক জয় নিজেদের ঘরে নিতে তিন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন ভোটের মাঠে। আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর প্রচারণায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ ১৩ সদস্যের একটি টিম ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে গতকাল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে।

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের নেতৃত্বে স্টেশন এলাকা থেকে এ টিম নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে। অপরদিকে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলার পক্ষে মাঠ গোছাতে ঢাকা থেকে এসেছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক দলের ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন টুকু, সদস্য সচিব দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলুর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতা সামসুজ্জামান, জাহাঙ্গীর আলম, যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল খালেক, ছাত্রদল, মহিলা দল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ ১০ সদস্যের হাইপ্রোফাইল একটি টিম। বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব হাবীব-উন-নবী খান সোহেলের নেতৃত্বে গতকাল প্রার্থী বাবলাসহ রংপুর কাচারি বাজার থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। দু’দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পেয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। মেয়র প্রার্থীরাও রয়েছেন খোশ মেজাজে। নির্বাচনী উৎসবে এখন অলি-গলিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা নগরী। সকলে যেন ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র হাই প্রোফাইল টিম রংপুরে বুধবার এসেই তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। ওদিকে আজ শুক্রবার জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গা রংপুরে আসছেন। দলের নেতা আবদুর রাজ্জাক জানান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারসহ অন্যান্য নেতারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য রংপুরে আসছেন। এদিকে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও বাড়ছে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে সেদিকে পুরো নজরদারি রেখেছে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

একটি কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক ইভিএম: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) সাহায্যে ভোটগ্রহণ করা হবে। গতকাল রংপুরে পরীক্ষামূলক ইভিএম ব্যবহার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। এ উপলক্ষে আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নিউ শালবন ও শালবন এলাকার ২০৫৯ ভোটার ইভিএমে ভোট দেবেন। গতকাল থেকে পাঁচ দিনব্যাপী ১৪১ নম্বর কেন্দ্রে ইভিএম ভোটের মহড়া চলবে। এজন্য নিজেদের তৈরি ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

২১শে ডিসেম্বর নিউ শালবন ও শালবন এলাকার ২০৫৯ ভোটারের জন্য এ সিটির ১৪১ নম্বর কেন্দ্রটিতে ইভিএম ব্যবহার হবে। ভোটের এক সপ্তাহ আগেই এ সিদ্ধান্ত নিলো নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি। মক ভোটিংয়ের বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, একটি কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার থেকে ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত মক ভোটিং চলবে। আমরা এজন্য এলাকায় প্রচারণাও করছি। মক ভোটিং মাধ্যমে ভোটারদের কাছে এ মেশিনের পরিচিতি ঘটবে। ইসির আইসিটি অপারেশন্স অধিশাখার সিনিয়র মেনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানান, রংপুর সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪১ নম্বর কেন্দ্রের (সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ) ছয়টি ভোটকক্ষে নতুন ইভিএমের মাধ্যমে ভোট নেয়া হবে।

নতুন ইভিএমে ভোট দেয়ার বিষয়ে ভোটার সচেতনতা, প্রচারের ভিডিও চিত্র প্রস্তুতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও বলা হয়েছে। এ কাজে প্রায় আড়াই লাখ টাকাও ব্যয় করছে ইসি। ইসি কর্মকর্তারা জানান, গেল বছর ইসি নিজেদের উদ্যোগে ইভিএম বানানোয় হাত দেয়। কে এম নূরুল হুদা কমিশন আসার পর গত মে মাসে তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। রংপুর সিটিতে ইসির তৈরি যন্ত্রটির প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবহার হচ্ছে। তবে এই ক্ষেত্রে ফিঙ্গার ছাপ নেয়ার বিষয়ে শিথিলতা থাকতে পারে। মাঠ পর্যায়ের সুবিধা-অসুবিধাগুলোই এবার শনাক্ত করা হবে। ২৫ নম্বর ওয়ার্ড-১৪১নং কেন্দ্র- ভোটকক্ষ ৬টি; ভোটার এলাকা নাম- নিউ শালবন ১৬১৫ ভোটার, শালবন ৪৪৪ ভোটার; পুরুষ-মহিলা নিয়ে মোট ভোটার ২০৫৯। ২১শে ডিসেম্বরের আগে কেন্দ্রটিতে ৫ দিন ভোটের মহড়া চলবে।

২০১০ সালে এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ইভিএমের যাত্রা শুরুর পর স্থানীয় সিটি ও পৌরসভায় তা ব্যবহার হয়ে আসছে। চট্টগ্রামে একটি ওয়ার্ডে ব্যবহারের সফলতায় পরে নায়ায়ণগঞ্জের কিছু ওয়ার্ডে, নরসিংদী পৌরসভা ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পুরো নির্বাচন ইভিএমে করা হয়। ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশনের সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে পরবর্তীতে থমকে যায় এ প্রযুক্তি। এ সময় রাজশাহী ও রংপুরে ছোট পরিসরে ইভিএম ব্যবহারেই ত্রুটি ধরা পড়ে। এ ধারাবাহিকতায় বুয়েট-ইসি দ্বন্দ্বে কমিশনের আইসিটি শাখা নতুন ইভিএম তৈরির উদ্যোগ নেয়।

ভোট নিতে নতুন ইভিএমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির সহায়তা নেয়া হবে। এ পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে ভোটার পরিচিতি নিশ্চিত করা হবে। ২১শে ডিসেম্বরে রংপুর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কথা জানিয়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, আমরা চেষ্টা করবো ইভিএম ব্যবহারের। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করবো। নতুন মেশিন ব্যবহার হবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের প্রস্তুতি ইসির নেই বলে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন সিইসি কে এম নূরুল হুদা।

২০৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ৩৩ ওয়ার্ডের রংপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আগামী ২১শে ডিসেম্বর। এ নির্বাচনে ৭ মেয়র, ২১১ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ৬৫ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন ভোটার রয়েছেন এ নগরীতে।

কিউএনবি/সাজু/১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং/সকাল ১০:৫৩